× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ড. ইউনূস-মোদী বৈঠক

সম্পর্কের স্বাভাবিকতা রাখতে দুই দেশকেই এগুতে হবে

এম হুমায়ুন কবির

প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৫ ১৮:৩২ পিএম

এম হুমায়ুন কবির

এম হুমায়ুন কবির

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে গত শুক্রবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। অনিশ্চয়তা কাটিয়ে ব্যাংককে উভয় নেতা যে প্রথমবারের মতো দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসলেন, এটি উভয় দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ঘটনা। গত বছরের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আকস্মিকতায় থমকে যায় দুই দেশের সম্পর্কের গতি। তারপর থেকে উভয় দেশের মধ্যকার টানাপড়েন কূটনৈতিক পরিসর ছাপিয়ে রাজনৈতিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এমনকি অনেক সাধারণ মানুষের বয়ানেও ছড়িয়ে পড়ে। সেই প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠকটির জন্য অপেক্ষা ছিল। অল্প সময়ের জন্য হলেও বৈঠকটি হয়েছে, যার ফলে আশার সঞ্চার হয়েছে।

গত সরকার ভারতের সঙ্গে বাড়তি জোর দিয়ে সম্পর্ক করতে সচেষ্ট ছিল। তার প্রথম কারণ ছিল রাজনৈতিক। গত সরকার ক্ষমতায় আসার পর মনে করেছিল, ভারত যদি রাজনৈতিকভাবে তাদের সমর্থন করে, তাহলে তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকা সুবিধাজনক হবে। সে কারণে তারা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটা যেটা দুই দেশের মধ্যে স্বাভাবিক ছিল বা আছে, সেখানে একটা বাড়তি চাপ যোগ করে সম্পর্ক জটিলতায় নিয়ে গেছে। এখন যে জটিলতা অর্থাৎ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন, তার প্রধান কারণ কিন্তু ওটাই। সম্পর্ক যদি স্বাভাবিকভাবে চলতে পারত, তাহলে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক যা ছিল তা-ই থাকত। এর মধ্যে রাজনৈতিক উপাদান যোগ হওয়ায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটেছে। মানুষের অধিকার বঞ্চনার যে বিষয়গুলো ঘটেছে, নাগরিক অধিকার হরণ করে তার ওপর নিষ্পেষণের যে বিষয়গুলো ঘটেছে, সেগুলো একেবারে অন্যায় কাজ। এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যেতে পারলে সম্পর্কটা স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকত। জনগণ মনে করছে, ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। 

ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। তাদের সঙ্গে আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আছে। আমি মনে করি, সেই বাস্তবতার নিরিখেই প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই সঙ্গে বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক খারাপ হয় বা পরিবেশ নষ্ট হয়, এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বানও জানিয়েছেন। আবার তিনি নিজে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ড. ইউনূসের সঙ্গে তার বৈঠক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে একটি গঠনমূলক ও জনগণ কেন্দ্রিক সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তিনি এ-ও লিখেছেন, ‘আমি বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা, অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের প্রতি ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছি। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করা রোধের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি।’

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং নরেন্দ্র মোদির মাঝের বৈঠকটি ইতিবাচক। আমাদের দিক থেকে একটা বৈঠকের অনুরোধ আমরা করছিলাম। আমাদের চেষ্টা ছিল। আমার ধারণা, ভারতের দিক থেকেও তারা চাচ্ছিল। কারণ প্রাথমিকভাবে দুদিকেই পারস্পরিক বোঝাপড়ার যে ঘাটতিটা ছিল এখন একটা উপলব্ধি আমাদের দিক থেকেও আছে, ওই দিক থেকেও আছে। 

উভয় নেতার এই বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। তারা উভয়ে নিজ নিজ দেশের অবস্থানই তুলে ধরেছেন। উভয় দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা শুরুর এই বিষয়টি সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে বাস্তবতার নিরিখে দুই দেশকেই এগিয়ে আসতে হবে। তবে এক্ষেত্রে ভারতকে একটু বেশিই এগিয়ে আসতে হবে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে উভয় নেতা দুদিন বিমসটেক সম্মেলন উপলক্ষে পাশাপাশি বসেছেন, ডিনার করেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেছেন। ফলে এটা স্পষ্ট যে, তারা পরস্পরের অবস্থানটা উপলব্ধি করেছেন। যেহেতু ভারত আমাদের প্রতিবেশী, এই উপলব্ধিটুকু আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এই বৈঠকের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? ভবিষ্যতের বিষয়টা বলা মুশকিল। যেকোনো বাস্তবতায় আমরা পরস্পরের প্রতিবেশী। সেটা যেকোনো সরকার আসুক। যেকোনো অবস্থায় হোক। এর বাইরে তো আমরা যেতে পারব না। এটা ভারতের জন্য যেমন বাধ্যবাধকতা, তেমনি আমাদের জন্যও। সে কারণেই আমাদের পরস্পরের সঙ্গে কাজ করতে হবে। 

আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আছে। একটা দৃষ্টান্ত দিই। আমরা রাজনৈতিক পর্যায়ে শীতলতা দেখছি। কিন্তু ভারত থেকে ১৭ পার্সেন্টের বেশি আমদানিও করছি। এর অর্থ হলো অর্থনীতি তার গতিতে চলছে। রাজনীতিটা ভালোভাবে চলছিল না। কাজেই কিছু বাস্তবতা আছে যেগুলোকে অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকে না। কাজেই ভবিষ্যৎ কী হবে, অনেকগুলো বিষয় আছে দুপক্ষের মধ্যে। অনেক বিষয়ে সম্ভাবনা ভালো। আবার অনেক বিষয়ে সম্ভাবনা তত ভালো নয়। যেমন যদি ভারত ভিসা চালু করে, যদি সীমান্ত হত্যাকাণ্ড কমে, আমাদের পদ্মা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চুক্তি শেষ হয়ে যাবে আগামী বছর, সেটার আলোচনা যদি শুরু হয় তাহলে সেগুলো সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আবার কিছু জটিল বিষয় আছে যেমন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, তিস্তা ইস্যু, এগুলোর বিষয়ে বলা মুশকিল।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, দুই দেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক ও বহুমুখী। সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যা হলোÑ এখনও তারা সেটি মানতে পারছে না। ৫ আগস্টের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণ বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা তারা মানতে পারেনি। এজন্য নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আমি মনে করি, সমস্যা সমাধানে দুই পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সজাগ থাকতে হবে পরিস্থিতিটা যেন কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে না যায়। দুই দেশের মধ্যে যেসব সমস্যা আছে, কূটনৈতিকভাবেই সমাধান করতে হবে। বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তার আলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনপরিসরে উত্তেজনা তৈরি করে এমন মন্তব্য থেকে উভয় পক্ষকেই সরে আসতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে মোটামুটি যোগাযোগ আছে। কিন্তু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এক ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশ ও ভারত যেহেতু নিকটতম প্রতিবেশী, সেহেতু যোগাযোগ, আদান-প্রদান থাকবে এবং আমার মতে, সেটা থাকা উচিত। 

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দুই দেশের মধ্যে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের মানুষের যে প্রত্যাশা, এই বাস্তবতা ভারত যদি উপলব্ধি করে, তাহলে সম্মানজনক ও সমতার ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা যেতে পারে এবং তা সম্ভব। সেক্ষেত্রে ভারতের দিক থেকেই যদি উদ্যোগটা আসে, তাহলে সম্পর্কে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ কী চায়? কী তাদের প্রত্যাশা। সেটা মনে রেখে যদি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে সম্পর্কোন্নয়নে কোনো ঘাটতি থাকবে না। আমরা চাই, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতে। কাজেই এ ব্যাপারে উভয় দেশের মনোযোগী হওয়া উচিত। সরকার যাবে, সরকার আসবে। কিন্তু দুই দেশের মানুষ যদি সম্পর্কটাকে গ্রহণ করে এবং তারা যদি এটাকে মূল্যায়ন করে, তাহলেই সম্পর্ক টেকসই হওয়া সম্ভব। কাজেই বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তন হওয়া মানে ভারতের কিছু চলে গেল, স্বার্থ সম্পৃক্ত হচ্ছে নাÑ এমন মনে করা ঠিক না। কারণ আমরা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তাদেরও আমাদের প্রয়োজন, আমাদেরও তাদের প্রয়োজন। এমন কিছু বিষয় আছে, যা আমরা এককভাবে কেউই করতে পারব না। কাজেই সেই প্রেক্ষাপটে আমি মনে করি, গত ১৫-১৬ বছরে যে রাজনৈতিক বিবেচনা যোগ হয়েছিল, তা উভয় দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন হয়েছে। আমরা যদি সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে যেতে চাই, তাহলে প্রয়োজন দুই দেশের স্বার্থ কোথায় আছে, সেই জায়গাটা বের করা, সেই জায়গার ভিত্তিতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হওয়া, উদ্যোগী হওয়া এই মুহূর্তে জরুরি।

  • কূটনীতি-রাজনীতি বিশ্লেষক। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা