× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুলিশকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে

ড. শাহজাহান মণ্ডল

প্রকাশ : ২৭ মার্চ ২০২৫ ১১:১৪ এএম

ড. শাহজাহান মণ্ডল

ড. শাহজাহান মণ্ডল

বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইনের ২৫ ধারা মোতাবেক পুলিশ অফিসার অতিমাত্রায় অচ্ছুত। তবে ইংল্যান্ডে নয়। ২৫ ধারা বলছে, পুলিশ অফিসারের কাছে কোনো আসামি তার অপরাধকর্ম স্বীকার করলে উক্ত কনফেশনের ( দোষ স্বীকারোক্তি) ভিত্তিতে তার শাস্তি হবে না। তবে সে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে, এমনকি কোনো সাধারণ মানুষের কাছেও নিজের দোষ স্বীকার করলে আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারে। এতে কোনো বাধার সুযোগ নেই। পুলিশ আসামিকে নির্যাতনপূর্বক কথা আদায় করে এমন প্রচলিত কথা থেকে পুলিশের ওপর জনঅবিশ্বাস ২৫ ধারার বিধানের কারণ। এখানে ‘পুলিশ অফিসার’ বলতে পুলিশ বাহিনীর যেকোনো সদস্য অন্তর্ভুক্ত। আইজিপি থেকে কনস্টেবল পর্যন্ত সবাই, এমনকি গ্রাম্য চৌকিদার-আনসার-দফাদার-গ্রামপুলিশও এর আওতায় পড়ে। এদের কাছে বা সামনে প্রদত্ত কনফেশন আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। আসামি একজন সাধারণ লোকের কাছে কনফেশন দেওয়ার সময় যদি এরা কেউ উপস্থিত থাকে তা হলেও তা ২৫ ধারায় বারিত হয়। সাক্ষ্য আইনের ২৬ ধারা বলছে, আসামি পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় ম্যাজিস্ট্রেট হাজির হলে, আসামির দৃষ্টিসীমানার মধ্যে পুলিশ থাকলেও একই কথা। আসামি নিজে যদি ভিকটিমকে খুন করেছে মর্মে দোষ স্বীকারোক্তি লিখে থানায় এজাহার (এফআইআর) জমা দেয় তাহলে তার ভিত্তিতেও আসামির সাজা হয় না। সাক্ষ্য আইন মোতাবেক এতই অবিশ্বাসযোগ্য, এতই অগুরুত্বপূর্ণ, এতই অচ্ছুত আমাদের বাংলাদেশের পুলিশ। পক্ষান্তরে বিশ্বাসযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ইংল্যান্ডের পুলিশ। কারণ, ইংল্যান্ডে পুলিশ অফিসারের কাছে আসামি নির্যাতনবিহীন কনফেশন দিলে তার ভিত্তিতে তার সাজা হতে বাধা নেই। ইংল্যান্ডের রাজারা যখন ১৮৭২ সালে ভারতবর্ষের জন্য এ আইন তৈরি করেন তখন এ হীনকারী বিধান ২৫ ধারায় যুক্ত করেন। তৎকালীন ভারতীয়রা বা বাঙালিরা নিশ্চয় তখন বিষয়টি বোঝেনি।

ইংল্যান্ডে কনফেশনবিষয়ক বর্তমান আইনের নাম পলিশ এন্ড ক্রিমিন্যাল এভিডেন্স (পিএসিই) এক্ট ১৯৮৪- এই সেদিনের আইন। এর ৭৬ ধারায় বলা আছে, নির্যাতনের মাধ্যমে কনফেশন আদায় করা হলে, কিংবা কনফেশনটি অনির্ভরযোগ্য হলে তার ভিত্তিতে কনফেশরের শাস্তি হবে না। ইংল্যান্ডের এ বিধানের মতো আমাদের সাক্ষ্য আইনের ২৪ ধারায় বলা হয়েছে, প্ররোচনা, ভীতি ও মামলায় সুবিধাদায়ী বা অসুবিধানাশী প্রতিশ্রুতির (প্ররোচনা, হুমকি বা প্রতিশ্রুতি) মাধ্যমে কনফেশন আদায় করা হলে তার ভিত্তিতে কনফেসরের শাস্তি হবে না। আসামি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে কনফেশন দিলে তা বিচারিক কনফেশন হিসেবে গণ্য হয়। এর ভিত্তিতে তার শাস্তি হতে বাধা নেই। মজার কথা হলো, সাধারণ লোকের কাছে আসামি যদি দোষ স্বীকারোক্তি দেয় এবং ওই লোক যদি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে তা বলে দেয় তাহলে তার ভিত্তিতেও আসামির সাজা হতে পারে। এটি বিচারবহির্ভূত কনফেশন (এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কনফেশন)। দেখা যাচ্ছে, পুলিশ অফিসারকে বিশেষ অচ্ছুত ব্যক্তি গণ্য করেই আমাদের সাক্ষ্য আইনের এ বিধান। ওই সাধারণ লোক হলো এমন লোক যে কি না পুলিশ নয়, হোক সে চোর-ডাকাত-ছ্যাঁচড়-কিলার-হাইজ্যাকার কিংবা ঘুষখোর-দুর্নীতিবাজ-মাদকসেবী-কালোবাজারি-জালিয়াত। তার কাছে আসামি দোষ স্বীকারোক্তি দিলে তারও দাম আছে, তার ভিত্তিতে আসামির সাজা হতে পারে, কিন্তু পুলিশের কাছে দিলে তার দাম নেই, আসামির সাজা হয় না। এ ক্ষেত্রে একজন আইজিপির দামও চোর-ডাকাত-দুর্নীতিবাজের নিচে। দেড়শ বছর হলো পুলিশ এভাবে আইনের মাধ্যমে জনগণের কাছে হেয়, অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে আছে। তারা নাকি শুধু নির্যাতন করেই কনফেশন আদায় করে। সাইকোলজিক্যাল স্কিল, ডিজিটাল যন্ত্র-পদ্ধতি-ইন্টেলিজেন্স, বোঝানোর দক্ষতা, অনুপ্রাণিতকরণ ক্ষমতা, দয়ামায়া-ভালোবাসা প্রভৃতির মাধ্যমে কনফেশন আদায় করার ক্ষমতা কিছুই নাকি তাদের নেই!

ঔপনিবেশিক আমলে সেই ১৮৭২ সালে যে উদ্দেশ্যে, পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য পুলিশ নিয়োগ-মোতায়েন করা হতো, এখন তো পুরোপুরি সেই একই উদ্দেশ্যে নিয়োগ-মোতায়েন হয় না। সে সময় যে অশিক্ষিত লোকেদের ধরে এনে পুলিশ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো, এখন তো শুধু তাদেরই পুলিশ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় না। এখন তো উচ্চশিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের পুলিশ হতে দেখি। বিসিএসের ভাইভাতে দেখা যায়, অনেক এমবিবিএস ডিগ্রিধারী ডাক্তার হতে চায় না, এলএলবি ডিগ্রিধারী জজ-ম্যাজিস্ট্রেট হতে চায় না, পুলিশের এএসপি হতে তারা ভীষণ আগ্রহী। পুলিশ এখন খাকি পোশাক ছেড়ে নীল রঙের পোশাক পরছে। তারা এখন স্লোগান দেয় ‘পুলিশ জনগণের বন্ধু’, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। তাহলে কেন তাদের কাছে প্রদত্ত দোষ স্বীকারোক্তির সাক্ষ্যগত মূল্য থাকবে না? বস্তুত, অনেকের কাছে জিজ্ঞেস করে উত্তর পেয়েছি, পুলিশকে যথাযথ মূল্য দিলে তারা আরও বেশি জনদরদি হয়ে উঠবে। আরও বিশ্বাসযোগ্য, মর্যাদাপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ মানুষে পরিণত হবে, যেমন হয়েছে ইংল্যান্ডে।

ইংল্যান্ডে পুলিশের কাছে দেওয়া আসামির দোষ স্বীকারোক্তির সাক্ষ্যগত মূল্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লি সু-লিং বনাম আর (২৭ জুলাই ১৯৮৮) মামলার রায়ে প্রিভি কাউন্সিল তা প্রতিষ্ঠিত ও প্রচার করেছে। মামলাটি হংকংয়ের। ১ জুলাই ১৯৯৭-এর আগে প্রিভি কাউন্সিলের রায় হংকংয়ের সব আদালতে অবশ্যমান্য ছিল। মামলার ঘটনা হলো, আসামি ১ জুলাই, ১৯৮৫  কাউলুন-এর অ্যাপার্টমেন্টে চৌ শুক-কিং নামক মহিলাকে হাত ও স্কিপিং দড়ির পটি দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। তিনি পুলিশের কাছে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করেন। তিনি বলেন, তিনি ওই ফ্ল্যাটে শুক-কিং-এর কাছে টাকা ধার চাইতে গেলে তিনি গালাগাল করেন, তখন তাদের মধ্যে ঝগড়া হয় এবং তখন তিনি তাকে আঘাত করেন। তাকে হেফাজতে নেওয়ার পর পুলিশ অফিসার এ রকম বলেন, যে বাসায় আপনি মহিলাকে হত্যা করেন সেখানে গিয়ে কি এটি অভিনয় করে দেখাতে পারবেন? অবশ্য এতে আপনি বাধ্য নন। ইচ্ছে করলে না-ও দেখাতে পারেন। কিন্তু তিনি নিজে থেকেই (ভলান্টারলি) তাতে রাজি হন, এবং ওই অ্যাপার্টমেন্টে যান। তার অভিনয়টি ভিডিওতে ধারণ করা হয়। অভিনয়ে ভিকটিমের অভিনয় করেন একজন মহিলা ডিটেকটিভ অফিসার। ভিডিও রেকর্ডিংয়ের সঙ্গে আসামি তার গতিবিধি ব্যাখ্যা করে ধারাভাষ্যও জুড়ে দেন। আদালত এ কনফেশন ও অডিওযুক্ত ভিডিওটি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং এর ভিত্তিতে আসামির শাস্তি হয়।

পুলিশ নির্যাতন করবে না ভাবতে কষ্ট হয়। কিন্তু আবারও বলি, ম্যাজিস্ট্রেটকে এত বিশ্বাস, তো ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ১৬৭ ধারার অধীনে ম্যাজিস্ট্রেট যখন আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ডে) দেন তখন তিনি তো এটা জেনেশুনেই দেন যে, পুলিশ তাকে জামাই আদর করবে না, প্রথমত বুঝিয়ে-শুনিয়ে কথা আদায় করবে, নয়তো নির্যাতন করেই কথা আদায় করবে এবং তাকে পরদিন এমনভাবে ‘বানিয়ে’ কোর্টে হাজির করবে যে, সে আপসাফ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দোষ স্বীকার করবে। এমন আসামিকেও আদালত অঙ্গনে অনেকে দেখে থাকেন যার ফোলা হাত-পায়ে রক্তের দাগ থাকে, হাত-পা জামাকাপড় দিয়ে ঢাকা থাকে, রস চোয়ায়, অথচ ম্যাজিস্ট্রেট যখন বলেন, দোষ স্বীকারোক্তি দিতে কেউ আপনাকে মারধর করেছে কি না, ভয়ভীতি বা প্রলোভন-প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কি না। তখন অকপটে তিনি ‘না’ বলে ফেলেন। শুনে উপস্থিত অনেকেই মুচকি হাসেন বইকি। এ অবস্থায়ও তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যখন দোষ স্বীকার করেন তখন তার শাস্তি হতে বাধা থাকে না। এসব জেনেশুনে ম্যাজিস্ট্রেট যখন আসামিকে পুলিশ রিমান্ডে দেন তখন ওই ম্যাজিস্ট্রেটও কি ঘটনার অংশীদার হয়ে পড়েন না? এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে এবং এজন্য সাক্ষ্য আইনের ২৫, ২৬ ও ২৭ ধারার বিধান, তৎসংশ্লিষ্ট ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি)-এর ১৬৪(১) ধারার পরিবর্তন করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ‘নির্যাতন’ (অপজিশন)-এর মাধ্যমে কনফেশন বন্ধ হওয়াটা প্রয়োজন, সে নির্যাতন যার দ্বারাই ঘটুক না কেন। অপজিশন বলতে বোঝানো উচিত ‘অত্যাচার এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা হেনস্থাকারী আচরণ’ (নির্যাতন এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ) যেমনটি সংজ্ঞায়িত হয়েছে ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার (ইউডিএইচআর) অনুচ্ছেদ ৫-এ, এবং ১৯৬৬ সালের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) অনুচ্ছেদ ৭-এ। পুলিশের কাছে কৃত কনফেশনকে সাক্ষ্যগত মূল্য দেওয়া হলে সে স্বেচ্ছায় নির্যাতন বন্ধ করার কথা অনেক বেশি ভাববে। অন্যদিকে পুলিশকে আরও মানবিক হতে হবে, জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। বাবা-মা, বড় ভাই-বোন বা অভিভাবকরা কষ্ট করে পড়াশোনা করান। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, অনেক সময় রক্ত বিক্রি করে তারা ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ জোগান দেন এবং বিষয়টা তাদের কোনো দিন জানতেও দেন না। তারা যখন পাশ করে পুলিশ হন, এসআই হন, ইন্সপেক্টর হন, ওসি হন, এএসপি হন, আইজিপি হন, তখন ওই ঘাম-রক্ত বিক্রি করা বাপ-মা-ভাই-বোন-অভিভাবক আনন্দে বুক ভাসান। এরপর যদি তারা জানতে পারেন, তাদের ঘাম-রক্তের বিনিময়ে ‘মানুষ’ হওয়া ওই ছেলেমেয়েরা তথা পুলিশ অফিসারদের দ্বারা মানুষের ক্ষতিকর ছায়া পড়েছে; তখন তাদের সমস্ত আনন্দ আর আনন্দ থাকে কি?

  • সাবেক ডিন, আইন অনুষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা