× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

২৬ মার্চ ১৯৭১

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবন

শহিদুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৫ ১৩:১১ পিএম

শহিদুল ইসলাম

শহিদুল ইসলাম

১৯৭১ সাল। ২৬ মার্চ ভোর। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরী ভবন। নিজ রুমে আমি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। তড়িঘড়ি করে উঠে দরজা খুলতেই দেখি তিনজন পাকিস্তানি সেনা রাইফেল উঁচু করে দাঁড়িয়ে। একজন আমার পাশ দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। বাইরের দুজন চিৎকার করে উঠল, ‘নিকালো শালা!’ পেছন থেকে এক লাথি। ছিটকে বারান্দায় হুমড়ি খেয়ে পড়ি। একজন সেপাই আমাকে দাঁড় করিয়ে ধরে থাকল। দেখি তাদের সঙ্গে গণিতের মুজিবুর রহমান এবং অজিত। অজিত কুমার ঘোষ অর্থনীতির সদ্যনিয়োগপ্রাপ্ত প্রভাষক। আমার পাশের ঘরে থাকে। আমরা তিনজনই জুবেরী ভবনে ছিলাম। তিনটি রাইফেলের নলের প্রহরায় আমাদের প্যারিস রোড ধরে উপাচার্য প্রফেসর সাজ্জাদ হোসাইনের বাড়ি নিয়ে গেল। উপাচার্যের বাসভবনের দিকে মোড় নিতেই মুজিবুর রহমান চোস্ত উর্দু ভাষায় বলে উঠলেন, ‘মুহাম্মদ নামে একজন ভালোমানুষের জন্ম হয়েছিল। তারপর মুহাম্মদ নামের সবাই চোরবদমাশ।’ এই শুনে সেপাইরা তাকে লাথি দিয়ে ফেলে রাইফেল দিয়ে মারতে লাগল। আমরা দুজন ভয়ে গুটিশুটি হয়ে চেয়ে দেখি। 

মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন করাচি ছিলেন। সে সুবাদে তিনি চমৎকার উর্দু বলতে পারতেন। আমাদের সবার পরনে লুঙ্গি ও গেঞ্জি। সাজ্জাদ হোসাইন উপাচার্য ভবনের বিরাট বাগানে সকালের বসন্তের স্নিগ্ধ হাওয়া খাচ্ছিলেন। তার সামনে আমাদের হাজির করে সেপাইরা। তিনি আমাদের পরিচয় দিলেন। ‘এঁরা সবাই টিচার।’ কিছু কথার আদানপ্রদানের পর ফের উল্টোযাত্রা। প্রত্যেককে জুবেরী ভবনের নিজ নিজ কক্ষে ঢুকিয়ে দিয়ে সাবধান করে দিল সবাইকেই, ‘ঘর থেকে বের হলেই গুলি!’

ফেরার সময় ভালোভাবে দেখি সমস্ত চত্বরের বিভিন্ন স্থানে পাকসেনারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বসে আছে। সমস্ত ক্যাম্পাস তাদের দখলে। বেলা বাড়ার সঙ্গে আমাদের সকালের প্রয়োজনীয় কাজের চাপ বাড়তে থাকে। পেছনের কাঁঠালতলায় এক প্লাটুন সেনা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে। সব ভয় জয় করে পেছনের দরজা খুলে তাদের ডাকি। দুজন এগিয়ে এলে ভাঙা ভাঙা উর্দু-বাংলার সঙ্গে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাদের বোঝাতে সক্ষম হই যে আমাদের ওয়াশরুম ও খাওয়াদাওয়ার প্রয়োজন। দুজন তখন ঘুরে এসে আমার ঘরে ঢুকে চারধার দেখতে লাগল।

সকালের সব কাজ শেষ করে লুঙ্গি-গামছা তারের ওপর নেড়ে দিয়ে তাদের বলি যে আমার হয়ে গেছে। দুজন আবার ঘুরে এসে রাইফেলের সামনে আমাকে বের করল। পাশের ঘর থেকে অজিতকে সঙ্গে নিয়ে বারান্দা দিয়ে খাবারঘরের দিকে এগোতে থাকি। মুজিবুর রহমানকে ডেকে বের করলাম। তিনজন একত্রে খাবারঘরের দরজা ধাক্কা দিলাম। কারও সাড়া পেলাম না। তখন আমি জয়নালের নাম ধরে ডাকলে সে দরজা খুলল। একজন সেপাই তাকে এক চড় কষিয়ে দিল। বলল এর আগে সে দরজা খোলেনি কেন? তারা আমাদের জন্য নাশতা বানাতে বলল। আমরা তিনজন শুকনো মুখে টেবিলে বসলাম। পরোটা ও ডিম ভাজবে। পাশের দেয়াল ঘেঁষে ওরা দাঁড়াল। মাঝেমধ্যে কথার মাঝে একজন প্রশ্ন করল, ‘তোমরা কি সবাই মুসলমান?’ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল ‘হ্যাঁ’। অজিতের চেহারার কথা আজও চোখের সামনে ভাসছে। তারপর বলল, ‘এক মাস আগে আমাদের পূর্ব পাকিস্তানে এনেছে হিন্দুদের মারার জন্য। আমরা তো হিন্দুদের খুঁজে পাই না। সবাই মুসলমান। হিন্দু কোথায়।’ তাদের মনের দুঃখটা স্পষ্ট বোঝা গেল।

নাশতার পর রাইফেলের সামনে আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিল এবং সাবধান করে দিল যে বাইরে বেরোলেই গুলি করা হবে। এক ফাঁকে আমি অজিতকে বলি, ওরা যদি তোমার নাম জিজ্ঞেস করে বলবে ‘ওয়াজেদ গাউস’। বেলুচিস্তানের জনৈক নেতার নামের পেছনে গাউস শব্দটি ছিল। ওরা অবশ্য কারও নাম জিজ্ঞেস করেনি। এভাবেই সারাটা দিন কেটে গেল। নিস্তব্ধ চারদিক। সেপাইরাও তাদের গাড়িতে চলে গেল। পরে জেনেছিলাম ওদের শিফ্ট পরিবর্তন। নতুন আর একদল আসবে।

এটাই আমাদের একটি বড় সুযোগ মনে হলো। আমি ব্যাগে কাপড় ও প্রয়োজনীয় কিছু নিয়ে অজিতকে বের করি। সামনের উইংসে মুজিবুর রহমানের ঘরে যাই তাকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য। কিন্তু মুজিবুর রহমান কিছুতেই আমাদের সঙ্গে এলেন না। আমি আমার বন্ধু আফতাবুর রহিমের বাড়িতে উঠি। আর অজিত গিয়ে ওঠে তার স্যার প্রফেসর মোশাররফ হোসেনের বাসায়।

ওদিকে রাজশাহীর পশ্চিমে পুলিশ লাইনসের দিক থেকে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ২৬ তারিখ সন্ধ্যায় সেপাইরা চলে যাওয়ার পর রাতে আর নতুন প্লাটুন আসেনি, ২৭ মার্চ সকালে তেমনটি শোনা গেল। বাড়ি থেকে শিক্ষকরা বেরিয়ে খোঁজখবর নিতে থাকেন। শহরেও প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এমন করে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ক্যাম্পাস ছিল মুক্ত। আমরা বিভাগেও গেছি। বিভিন্ন বিভাগে স্যারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছি। শহরেও সেপাইদের দেখা নেই। তারা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যেই আছে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বন্ধু খালেদ হাসান ও বজলুল মোবিন চৌধুরীর সঙ্গে আমি ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুর রকিব স্যারের কাছে যাই। রেডিও থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করা যায় কি না জানতে। তিনি একটি ছোট্ট পার্টসের নাম বললেন যেটা না হলে কোনো সম্প্রচার সম্ভব নয়। তবু আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাসটি নিয়ে রেডিওতে গেলাম। রেডিওর লোকজন একই কথা বললেন এবং জানালেন যে পাকিস্তান আর্মি সেটা নিয়ে গেছে। ব্যর্থ হয়ে আমরা ফিরে আসি।

খুব ভোরে আফতাবুর রহিমের দরজায় ধাক্কা। আমরা ভীত হয়ে পড়ি। ফজলুল হালিম চৌধুরীর বাসার ছেলেটার গলা শুনে দরজা খুলতেই সে বলল, ‘স্যার আপনাদের ডাকছে।’ আমরা কালবিলম্ব না করে স্যারের বাসায় যাই। দেখি মোশাররফ হোসেন স্যার ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী স্যার বসে আছেন।

চৌধুরী স্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু শুনেছো?’ আমরা একসঙ্গে বলে উঠলাম, ‘না, স্যার।’ স্যার বললেন, আজ ভোরে পাকিস্তান আর্মি শহরের কজন হিন্দু ভদ্রলোককে হত্যা করেছে।’

শহরের আইনজীবী সালাম সাহেবসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছেন অ্যাডভোকেট বীরেন সরকার ও সুরেশ পাঁড়েকে হত্যা করা হয়েছে।

সকাল হয়ে গেছে। স্যারেরা আমাদের বললেন যে করেই হোক আজ দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত হিন্দু শিক্ষক ও তাদের পরিবারকে ভারতে পৌঁছে দিতে হবে।

আফতাবুর রহিম ও আমি বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক হলো সবাইকে পূর্বপাড়ার সুব্রত মজুমদারের বাসায় তুলতে হবে। বিনোদপুরে আমাদের ঘনিষ্ঠ কজন রিকশাওয়ালা আমাদের ভারতে পৌঁছে দেবে।

প্রথমেই আমি সুখরঞ্জন সমাদ্দারের বাড়ি যাই। তিনি কিছুতেই আমাদের সঙ্গে যাবেন না। তিনি বলেন, ‘আমাকে কেন মারবে? আমি তো কারও সাতেপাঁচে থাকি না।’ কথাটি শতভাগ সত্য। কিন্তু নির্মম সংবাদ হলো, ১৩ এপ্রিল পাকিস্তান আর্মি ক্যাম্পাসে ঢুকেই তাকে তুলে নিয়ে কাজলা পুকুরপারে হত্যা করে।

আমি একটি রিকশা ধরে শহরের দিকে রওনা দিলাম। দেখি দলে দলে মানুষ রিকশা, ঘোড়ার গাড়ি করে শহর থেকে গ্রামের দিকে পালাচ্ছে। পরিচিতজনের দেখা হলে তারা শহরে যেতে বারণ করেন। কিন্তু শহরের কয়েকজন শিক্ষককে আনতে হবে। অরুণ বসাক, ননীভূষণ ফৌজদারকে পেলাম না। তারা আগেই বেরিয়ে গেছেন। বড় মসজিদের পাশ দিয়ে পদ্মার দিকে কয়েকটি বাড়ির পরই সনৎকুমার সাহা থাকেন। গিয়ে দেখি মাসিমাসহ সবাই তৈরি হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দুটি রিকশায় তাদের নিয়ে পূর্বপাড়ার সুব্রতদার বাড়ি উঠি। খুব বেশি শিক্ষক পেলাম না। সবাই যে-যার মতো পালিয়েছেন। বন্ধু ননীভূষণ ফৌজদার নিজেই উপস্থিত হলেন। রিকশাওয়ালারা নিচে অপেক্ষা করছিল। মাজদার, মধু, আলী ও আরও দুজন।

বিনোদপুর বাজারের মধ্য দিয়ে রিকশা পদ্মার দিকে এগিয়ে চলল। মধু বারবার বলছিল ওদের বাড়িতে একটু বসতে। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য তাড়াতাড়ি পদ্মা পার হওয়া। আগে একবার এসে নৌকা ঠিক করে গিয়েছিলাম। সে পদ্মা আর নেই। পাড় থেকে নেমে অনেকটা হেঁটে নদীর তীরে নৌকায় উঠতে হবে। নেমে আমরা হেঁটে নৌকার দিকে যাচ্ছি, ঠিক তখনই ক্যাডেট কলেজের দিক থেকে দুটি যুদ্ধবিমান উড়ে আসছে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেল পশ্চিমে। মধুরা সব জানে। তাই সে আমাদের দ্রুত পেছনের দিকে নিয়ে এলো এবং তার বাড়িতে কিছুক্ষণ বসতে বলল। বিমান দুটি তিন-চারটি চক্কর দিয়ে স্ট্র্যাপিং করে বোমা মারতে থাকে। চরে তখন অনেকেই মারা পড়েছিল। এর মধ্যেই মধুর বউ রুটি ও মুরগির ঝোলের বাটি এগিয়ে দিল। যে যেটুকুন পারলাম খেয়ে নিলাম। তারপর আবার যাত্রা করলাম। এবার আমরা নৌকায় উঠে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওপারে গিয়ে নামলাম।

দূরে সীমান্তের সঙ্গে ভারতের তীর মিশে আছে। সামনে বিস্তীর্ণ চর। কিষাণরা কিছুদিন আগেই লাঙল দিয়ে মাটি আলগা করেছিল। এপ্রিলের রোদে সেগুলো শুকিয়ে পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। কোনো রাস্তা নেই। সেই পাথরের আঘাত এড়িয়ে আমরা ধীরগতিতে ভারতের তীরের দিকে এগোতে থাকি। সে আর এক অভিযান। এলিজার পক্ষে বেশি হাঁটা সম্ভব ছিল না। আমরাই তাকে ধরাধরি করে এগোতে থাকি। মাসিমা মোটাসোটা মানুষ। তিনিও ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিলেন। যাদের পায়ে স্যান্ডেল ছিল, তাদের পা ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়েছিল। মধুরা চোরডাকাতের ভয় করছিল। আমরা যখন ভারতের মাটিতে পা রাখি, তখন সূর্য অস্ত গেলেও রবির লাল আভায় প্রকৃতি অপরূপ সাজে সেজে ছিল। তীরে উঠে মহিলারা ঘাসের ওপর শুয়ে পড়লেন।

মধুর বোনের বাড়ি মাত্র ২০০ মিটার দূরে। ওদের ভাইবোনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তারা সবাই এগিয়ে এলেন। ধরাধরি করে সবাইকেই মধুর বোনের বাড়ি তোলা হলো। ঝকঝকে কাঁসার গ্লাসের পানি খেয়ে সবাই অনেকটাই সুস্থ বোধ করেন। সন্ধ্যার পরপরই পুঁটি ও মলা মাছের পানির মতো ঝোল ও মাষকালাইয়ের ডাল দিয়ে ভাত খেলাম। যেন অমৃত। মেয়েরা ঘরের মধ্যে আর আমরা ঘরের দাওয়ায় শুয়ে মুহূর্তেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম।

আমার জীবনের এ দিনটি স্মরণীয় দিনগুলোর মধ্যে প্রধান। বছর দুয়েক আগে অজিতের মৃত্যুসংবাদ পাই।

  • অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা