× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্বাধীনতার ৫৫ বছর

এই নির্মল ও মুক্ত আকাশ একান্তই আমাদের

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৫ ১৩:৫৩ পিএম

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৫ ১৩:৫৯ পিএম

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান

বাংলাদেশের বয়স এই ২৬ মার্চ ৫৫ বছরে পদার্পণ করবে। মানুষের জীবনের হিসাবে ধরলে প্রৌঢ়ত্ব এসে গেছে। যেহেতু এটি দেশের হিসাব, তাই প্রৌঢ় বলা যাবে না, নবীনই বলতে হবে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রের গতিপথ বারংবার পাল্টে যায় বলে সরলরেখায় চলে না। সে কারণে একে জন্ম থেকে অদ্যাবধি প্রকৃত বয়স নির্ধারণ করা কঠিন। রাষ্ট্র মাঝেমধ্যে স্থবির হয়ে পড়ে। সে অগ্রসর হয় না; বরং অনেক সময় পেছন দিকে ধাবিত হয়। ফলে তার বয়স বৃদ্ধির বিষয়টি হিসাবের মধ্যে ধরা বড় কঠিন মনে হয়। 

রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের পর অনেকে আবার রাষ্ট্রের জন্মান্তরবাদ নামে নতুন তত্ত্ব হাজির করেন। আসলে এই বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের জন্মের ইতিবৃত্ত আমরা যথাযথভাবে প্রজন্মান্তরে প্রবিষ্ট করতে পারিনি। এই বাংলাদেশ অর্জন করতে এ অঞ্চলের মানুষকে কত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অগ্রজরা তুলে ধরতে পারেনি। এমনকি অনেক মুক্তিযোদ্ধাও তাদের সন্তানদের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী বা কার ডাকে, কেন মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিল, তা সঠিকভাবে বর্ণনা করেননি। যুগে যুগে এ অ্ঞ্চলের মানুষ বাইরের শক্তির কাছে কীভাবে পদানত হয়েছে, কতভাবে নিগৃহীত-অপমানিত বা লাঞ্ছিত হয়েছে; সে খবর আমরা কজনইবা রাখি। 

আর্যরা যখন বাংলায় এসেছিল তারা বাঙালিদের অসভ্য বলে গালি দিয়ে বলেছিলÑ ‘ওরা মানুষের পেছনে কুকুর লেলিয়ে দেয়।’ মহাভারতে বাঙালিদের ‘ম্লেচ্ছ’ বলে গালি দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ বৌধায়ন তার ধর্মসূত্র নামক গ্রন্থে বাংলার বিভিন্ন জনপদের নাম উল্লেখ করে বলেছেন যে, তীর্থ ভ্রমণ ব্যতিরেকে এ অঞ্চলে কেউ গমন করলে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। অর্থাৎ এ অঞ্চল অপবিত্র। সুলতানি আমলে কিছু বাঙালি কবির কদর বাড়লেও মোগল আমলে বাঙালিরা আবার পিছিয়ে যায়। ব্রিটিশরাও বাঙালিদের পৃষ্ঠপোষণা দেয়নি। পাকিস্তানিদের চোখে বাঙালির ভাষা ছিল হিন্দুর ভাষা। বাঙালি মুসলমানদের তারা একদিকে খাঁটি মুসলমান মনে করেনি; অন্যদিকে তাদের ধর্ম পালনকে আবার বাড়াবাড়ি মনে করেছে। 

রাও ফরমান আলী লিখেছেন, ‘এখানকার [পূর্ব বাংলার] লোকেরা নামাজ-রোজায় অবশ্য খুব পটু। বেশ মনে আছে, গভর্নর হাউসে যখন কোনো সরকারি মিটিং হতো, বাঙালি অফিসাররা মিটিংয়ের মাঝখানেই নামাজ পড়ার জন্য উঠে চলে যেতেন। পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশেষ চিফ সেক্রেটারি শফিউল আযম নামাজের সময় হলে সব কাজ রেখে উঠে যেতেন। মোনেম খানও অনেকটা সে ধরনের ছিলেন। এ ধরনের ইসলামী পাবন্দ লোক পশ্চিম পাকিস্তানে কমই দেখা যায় (রাও ফরমান আলী, ভুট্টো শেখ মুজিব বাংলাদেশ, উর্দু ডাইজেস্ট থেকে মোস্তফা হারুন অনূদিত, ঢাকা : সৌখিন প্রকাশনী, ১৯৭৮, পৃ. ১০)।’ এর পরের বাক্যেই ফরমান বলেছেন, ‘তা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানিদের ইসলামী মূল্যবোধের পারাকাষ্ঠা ছিল। আধুনিক ইসলামি প্রজ্ঞায় তাদের বিচরণ ছিল অনেক গভীরে (ঐ)।’ এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানিরা এটাও মনে করত যে, বাংলা ভাষায় ইসলামের চর্চা যথাযথ হয় না। কারণ এই ভাষায় হিন্দি ও সংস্কৃতের আধিক্য রয়েছে (ঐ)। অথচ উর্দু ভাষায়ও যে হিন্দির প্রভাব আছে, সে বিষয়ে তিনি বেমালুম ভুলে গেছেন। এমনকি বাঙালিদের মুসলমানিত্ব নিয়েও যে তাদের সন্দেহ ছিল, তা ওপরের বক্তব্যে স্পষ্ট। তা ছাড়া রাও ফরমান আলীর আরও একটি মন্তব্য এখানে যুক্ত করা সমীচীন মনে করি। রাও ফরমান আলী ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির ৪-৫ তারিখে শেখ মুজিবের সঙ্গে তার একটি বৈঠকের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের কথাবার্তা চলছিল (শেখ মুজিবের সাথে) এমন সময় তাজউদ্দীন সাহেব ঢুকলেন। শোনা যায়, তার পূর্বপুরুষ হিন্দু ছিল (ঐ, পৃ.৬০)।’ এসব ঘটনা বা আলোচনার মাধ্যমে আমরা বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তানিদের মানসিকতা এতে অনুধাবন করতে পারি। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্কুলজীবন কেটেছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। তিনি তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন ‘একটি জাতির জন্ম’ নামক প্রবন্ধে (দৈনিক বাংলা, ২৬ মার্চ, ১৯৭২)। সেখানে তাকে কীভাবে পাকিস্তানিরা অবহেলা করেছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ তিনি তুলে ধরেছেন। বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে মদ্যপান করাকে সমাজ ভালোভাবে গ্রহণ করে না। ধর্মীয়ভাবেও এটি সিদ্ধ নয়। কিন্তু পাকিস্তান আর্মির কর্মকর্তা পর্যায়ে এই মদ্যপান সংস্কৃতি কত প্রকট, তা অনুধাবন করা যায় মেজর নাসির উদদীনের ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতায়’। তাহলে আমাদের সামনে এটি স্পষ্ট যে, তাদের জীবনাচরণ যাই হোক না কেন, তারা আমাদের থেকে নিজেদের শ্রেষ্ঠ দাবি করে। আর এর মধ্য দিয়েই শোষণ চলে বছরের পর বছর। 

মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য শুধু নির্মোহ ইতিহাস নির্মাণ নয়; সার্বিকভাবে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে সব সময়ই অন্যের ওপর দোষ চাপানো যেন আমাদের জাতিগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের পথে এটি অন্তরায়

চাকরি, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সবকিছুতে বৈষম্যের পাহাড় সৃষ্টি হয়। সমাজের বিভিন্ন অংশের এই হতাশার গ্রন্থিগুলোকে একত্রিত করার জন্য প্রয়োজন পড়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই সকল স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং সেই ঐক্যের ডাক এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে সাধারণ সৈনিকও রাজনৈতিক জনসভায় যোগ দেয়। খাদিম হোসেন রাজা লিখেছেন, ‘ইভেন দ্যা সোলজার্স ওপেনলি পারটিসিপেটড ইন হিজ (শেখ মুজিব) পলিটিক্যাল মিটিংস এন্ড ফেইল প্রেই টু হিজ প্রেপাগান্ডা, হুক লাইন এন্ড সিনকার.’ (এ স্টেনজার ইন মাই ওন কানট্রি ইস্ট পাকিস্তান ১৯৬৯-১৯৭১, ঢাকা : দি ইউনির্ভসিটি প্রেস লি. পৃ-১০).

খাদিম আরও লিখেছেন যে, ‘বাঙালি কর্মকর্তারাও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে এবং পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে খুব ক্ষীণ সম্পর্ক বজায় রাখে (ঐ, পৃ. ১১)।’ শুধু সামরিক নয়, বেসামরিক বিভিন্ন সেক্টরেও এই যোগাযোগ চলতে থাকে এবং ১৯৭১-এর মার্চে এসে বঞ্চিত, নিপীড়িত, শোষিত সরকারি চাকরিজীবীসহ শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, কুলি, মজুর, কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে সব এক মোহনায় মিলিত হয়। সবার কণ্ঠে একই আওয়াজ ধ্বনিত হয়Ñ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ ৭ মার্চে শেখ মুজিবের ঐতিহাসিক ঘোষণার পর গ্রামগঞ্জে প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর লোকেরা গ্রামের সর্বস্তরের মানুষকে তাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধ এভাবেই শুরু হয়ে যায়। ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের পর সামগ্রিক পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে এবং মানুষ তাদের আবাসস্থল ছাড়তে থাকে। শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, কূটনীতিক সবাই এক কাতারে মিশে যায়। ১০ এপ্রিল একটি সরকার গঠিত হয় এবং এই সরকারের নেতৃত্বেই মুক্তিযুদ্ধ চলে। ১৯৭১ সালের ১১-১৫ জুলাই কলকাতায় সামরিক কর্মকর্তাদের একটি সম্মেলন হয়। এতে যুদ্ধের সেক্টর ও সামরিক কমান্ড পুনর্বিন্যাস করা হয়। এরপর থেকেই সুশৃঙ্খলভাবে সেক্টর পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অবিরাম বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়। পেশাদার কূটনীতিক ছাড়াও রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জনমত সংগ্রহে প্রচেষ্টা চালাতে থাকে। 

সবার সম্মিলিত চেষ্টায় বিজয় অর্জিত হয়। অতএব সবাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন যার যার জায়গা থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করলে দেশ অগ্রসর হবে না। জাতিকে বিভাজিত করে ঐক্যেও ডাক দিলে তা কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা প্রশ্নবোধক। এজন্য জাতির সার্বিক মুক্তি কামনা করলে একাত্তরের মতো সবাইকে এক মোহনায় আনতে হবে। সেই কাজটি খুব সহজ নয়; আবার খুব কঠিনও নয়। যদি মনে করি, পেছনে একেকজন ভিন্ন ভিন্নভাবে ইতিহাস নির্মাণের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু আমরা নির্মোহ হব। তাহলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব। 

মানুষের সার্বিক মুক্তির জন্য শুধু নির্মোহ ইতিহাস নির্মাণ নয়; সার্বিকভাবে সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতাকে আড়াল করতে সব সময়ই অন্যের ওপর দোষ চাপানো যেন আমাদের জাতিগত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ সমাজ গঠনের পথে এটি অন্তরায়। তা ছাড়া একটা রাষ্ট্র বা সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ বা পেশার মানুষ যত বেশি বসবাস করে ততই ওই সমাজ বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা লক্ষ করি, রাজনৈতিক পালাবদলের পর একটা শ্রেণির মানুষ সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সনাতন ধর্মাবলম্বী, পাহাড়ি বা অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর মধ্যে নিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করতে না পারলে সমাজের মুক্তি সুদূরপরাহতই থেকে যাবে। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় যদি বলি, বাঙালির বাংলা থাকতে হবে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম আদর্শ বাঙালির বাংলা অর্জন করা। বাংলা ভাষার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক বিষয়াবলিকে পৃষ্ঠপোষণা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্বের পর্যায়ে পড়ে। আমাদের স্বেচ্ছাচারের জন্য ‘মায়ের বদনখানি মলিন’ না হয়, সে বিষয়টি নজরে রাখা দরকার। বাঙালি অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার আগে সিকান্দার আবু জাফর উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া’। আমাদের ক্ষুধা দারিদ্র্যের পেছনে দুর্নীতি যেমন দায়ী; তেমনি বাইরের ছায়াহীন এক মুক্ত আকাশ আমাদের জন্য জরুরি; যেখানে নির্ভয়ে, নিঃসংকোচে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। এই নির্মল ও মুক্ত আকাশ হবে একান্তই আমাদের, বাঙালির। তাহলে একটু একটু করে আমরা মুক্তির স্বাদ পেতে থাকব।

  • শিক্ষাবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা