সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৫ ১০:৫৬ এএম
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আটটি নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (ইএমআরডি)। প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে দেশি গ্যাস উৎপাদন বাড়িয়ে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মূল দায়িত্বে থাকবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্সে)। প্রকল্পের এ প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধু প্রকল্প অনুমোদন দিলেই হবে না, বরং প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাপেক্সের সক্ষমতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তারা। বিগত সময়ে গ্যাস উত্তোলনে সংস্থাটির সাফল্য-ব্যর্থতার নানা পরিসংখ্যানে এ প্রশ্নটি সামনে এসেছে। জানা গেছে, পরিকল্পনা অনুযায়ী এসব প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে পাঁচটি প্রকল্পের জন্য ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মূলত সিসমিক সার্ভে এবং অনুসন্ধানের মাধ্যমে গ্যাসের নতুন মজুদ খুঁজে বের করার জন্য ব্যয় করা হবে। তা ছাড়া বাপেক্স ও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি)-এর অনুসন্ধান সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আরও দুটি প্রকল্পে ৮৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
১৮ মার্চ প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘গ্যাস উত্তোলনে বাপেক্সের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। দেশের জ্বালানি খাতে সংকট এবং আশঙ্কার কথা অতীতে বারবার বলা হয়েছে। বাপেক্সের প্রতি এ আস্থাহীনতার পেছনে বহুবিধ কারণের অন্যতম হচ্ছে, এ খাতে বিগত সরকারের আত্মনির্ভরতার বদলে আমদানি ও পরনির্ভরতার প্রস্তাব ও সিদ্ধান্তের প্রতি ঝোঁক। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এ খাতের উন্নয়নে বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে দেশি কোম্পানি বাপেক্সকে শক্তিশালী করে তোলার কথা বলে আসছিলেন। তবে আশার কথা, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। আরও জানা গেছে, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে ২৩টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৫টি কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাপেক্সের জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত, যা এত বড় পরিসরের প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। নতুন প্রকল্পের আওতায় ২ হাজার হর্সপাওয়ারের দুটি নতুন রিগ কেনার পরিকল্পনা থাকলেও দক্ষ জনবল ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। তাই বাপেক্সের দক্ষ জনবলসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে দুটি অনুসন্ধান কূপ খনন ও দুটি ওয়ার্কওভার মিলে চারটি খননযন্ত্র বাপেক্সকে কিনে দেয় তৎকালীন সরকার। এর মধ্যে সর্বশেষ অনুসন্ধান খননযন্ত্রটি কেনা হয়েছে ২০১২ সালে। এখন কোম্পানির মোট খননযন্ত্র আছে ছয়টি। এর মধ্যে অনুসন্ধান কূপ খনন করার মতো যন্ত্র মোটে দুটি, যা দিয়ে বছরে সর্বোচ্চ তিনটি কূপ খনন করা যাবে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার দেশি গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন ইচ্ছাকৃতভাবে স্থগিত রেখেছিল এবং ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করেছিল। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশি গ্যাস উত্তোলন বাড়ানো ও নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।’ তিনি বাপেক্সকে কার্যকর করার কথাও উল্লেখ করেছেন। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেছেন, ‘গত এক দশকে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে বাপেক্সের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়েনি, বরং বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। বর্তমানে বাপেক্সের সীমিত প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো গ্যাস উৎপাদনের ৯০ শতাংশ নিয়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি মনে করেন, গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন ও বিতরণ কার্যক্রমের জন্য মূল্য নির্ধারণ এবং সরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলে ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। এ কথা সত্য, বিশ্বের বহু দেশ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। বাংলাদেশও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। তাই আমরা মনে করি, বাপেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাপেক্স একসময় শক্তিশালী সংস্থা হিসেবেই সুখ্যাত ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সময় স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে একের পর এক গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস উত্তোলনের দায়িত্ব বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ায় অনেক গচ্চা দিতে হয়েছে। বিদেশি কোম্পানি থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনে সরকারকে কম দামে ভোক্তাদের দিতে হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। অথচ উত্তোলনের কাজটি বাপেক্স করলে বিদেশি কোম্পানিকে আর কমিশন দিতে হতো না। আমরা মনে করি, বাপেক্সকে সঠিকভাবে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়া গেলে সরকারের উদ্যোগ সফল হবে। তাই প্রতিষ্ঠানটির কাজের পরিধি আরও বাড়ানো দরকার। জ্বালানি খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও সাফল্যের পরও এ খাতে চলমান দুর্দশা প্রত্যাশিত হতে পারে না। এ মুহূর্তে বাপেক্সকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি পেট্রোবাংলা, তিতাসসহ জ্বালানি খাতের সব কোম্পানি ও সংস্থার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। আর প্রশ্ন নয়, অপবাদ ঘুচিয়ে বাপেক্সকে সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠুক।