সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৬ মার্চ ২০২৫ ০৯:৪২ এএম
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্টসহ এ ধরনের সকল সেবা এক ছাতার নিচে আনতে পৃথক কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিভিল রেজিস্ট্রেশন কমিশন-২০২৫’। বর্তমানে এসব সেবা ভিন্ন ভিন্ন সংস্থার অধীনে থাকায় সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। জানা গেছে, এ-সংক্রান্ত আইনের খসড়াও প্রস্তুত। খসড়াটি পর্যালোচনার লক্ষ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রথম সভা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ৪ মার্চ বুধবার এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সেবা পেতে নাগরিকের দুর্ভোগ নিরসনে এ উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ‘আইনের খসড়া পরীক্ষানিরীক্ষা’সংক্রান্ত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির বৈঠকের মাধ্যমে এ তথ্য উঠে এসেছে। বৈঠকে স্থানীয় সরকার, সুরক্ষাসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগসহ বিভিন্ন সংস্থা ও ইসির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে এনআইডি কার্যক্রম ইসির অধীনে এবং জন্মনিবন্ধন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং দত্তকনিবন্ধন ও মৃত্যুনিবন্ধনও হবে প্রস্তাবিত এ সংস্থার অধীনে। নাগরিকের এ-সংক্রান্ত সকল সেবা সহজ ও হয়রানিমুক্ত করতেই এই উদ্যোগ।
তবে, সরকারের এ প্রচেষ্টায় আবারও বাদ সাধছে নির্বাচন কমিশন। সংস্থাটি বলছে, দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকের এনআইডি সংক্রান্ত সেবা তারাই দিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের দক্ষ জনবলও রয়েছে। কিন্তু সেসব বিবেচনায় না নিয়ে বিগত সরকার ইসি থেকে এনআইডি সেবা সরিয়ে নিতে আইন পাস করেও ব্যর্থ হয়। অন্তর্বর্তী সরকারও একই পথে হাঁটছে। তাই ইসি এ-সংক্রান্ত সেবা নিজেদের কাছে রাখতে সরকারকে আবারও চিঠি দেবে। খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনারও এনআইডির বিষয়টি হাতছাড়া করতে রাজি নন। তিনি সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র নির্বাচন কমিশন থেকে সরকার নিয়ে গেলে সমস্যা হবে। তার মতে এনআইডি ইসির অধীনেই থাকা উচিত। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ইস্যুটি সামনে আসায় প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। সিইসি বলেন, এখন ভোটার নিবন্ধন চলছে, সামনে জাতীয় নির্বাচন। এর মধ্যে সরকার এটা নেবে, এমন আলোচনায় ইসি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। তিনি মনে করেন, এনআইডি কার্যক্রম ইসিতেই থাকা উচিত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে আবারও রশি টানাটানির মতো অবস্থা। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও নিবন্ধন কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন না রেখে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করা উচিত। এতে জনদুর্ভোগ কমবে এবং প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংহত হবে।
জাতীয় পরিচয়পত্র হচ্ছে দেশের নাগরিকের জন্য একটি বাধ্যতামূলক নথি। যা বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া যেকোনো মানুষের পাওয়ার অধিকার। জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণের শুরুর দিকে শুধু ব্যক্তির নাম, পিতা ও মাতার নাম, জন্মতারিখ, আইডি নম্বর, ছবি ও স্বাক্ষর উল্লেখ ছিল। ২০১৬ সালে দেওয়া স্মার্ট কার্ডে একটি ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট কার্ড (আইসিসি) সংযুক্ত আছে, যা চিপ কার্ড নামেও পরিচিত। এ স্মার্ট কার্ডে নাগরিকের সব তথ্য সংরক্ষিত আছে। প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরি। পরে চাকরি, জমি রেজিস্ট্রেশন, পাসপোর্ট তৈরি, ব্যাংক হিসাব খোলা, মোবাইল সিম কার্ড কেনা, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সংযোগ, রাষ্ট্রীয় সুযোগসুবিধাসহ গুরুত্বপূর্ণ সব কাজেই এখন জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যবহার বাধ্যতামূলক। স্বাভাবিকভাবে আশা ছিল, পরিচয়পত্রটি নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত করতে পারবে ইসি। কিন্তু এনআইডি নিয়ে ইতঃপূর্বে নানা সমস্যা ও অসঙ্গতির প্রসঙ্গ গণমাধ্যমে উঠে আসে। আমাদের রাষ্ট্রীয় সেবার অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দায়সারা কাজ করেন, নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সাধারণ ভুলত্রুটি সংশোধনে নানা জটিলতা ও হয়রানির কথা বিস্মৃত নয়। সে অবস্থার পরিবর্তন যে হয়েছে তা-ও বলা যাবে না। তাই প্রশ্ন উঠছেÑ নির্বাচন কমিশনের পক্ষে বর্তমান লোকবল দিয়ে নির্ভুল পরিচয়পত্র দেওয়া সম্ভব কি না? বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভুলে গেলে চলবে না, কিছুদিন আগেও দায়িত্বটি অন্য কোনো সংস্থার কাছে ন্যস্ত করার কথা উঠেছিল।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত কার্যক্রম নির্বাচন কমিশনের আওতাধীন না রেখে সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করা সময়ের দাবি। লক্ষ্য যেহেতু অনাবশ্যক জটিলতা ও জনদুর্ভোগ লাঘব, সেহেতু আমরাও মনে করি সরকারের এ সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। একইভাবে প্রত্যেক নাগরিকের জন্মনিবন্ধন সনদ, জন্মনিবন্ধন সনদের ভিত্তিতে এনআইডি এবং এনআইডির ভিত্তিতে পাসপোর্ট প্রাপ্তির প্রক্রিয়ায় অনাবশ্যক জটিলতা ও জনদুর্ভোগ পরিহার করা জরুরি। তবে দেখার বিষয়, এক ছাতার নিচে আনতে গিয়ে অহেতুক সময়ক্ষেপণ, জনবলহীন নতুন সংস্থার কার্যক্রম বিলম্বিত হয় কি না? তাহলে জনদুর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন হতে পারে। দেখতে হবে নাগরিক সেবার লক্ষ্য যেন ব্যাহত না হয়।