× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নতুন মুদ্রানীতি

সংকোচনমূলক ও মূল্যস্ফীতি মোকাবিলাই চ্যালেঞ্জ

ড. মিহির কুমার রায়

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:৫৮ এএম

ড. মিহির কুমার রায়

ড. মিহির কুমার রায়

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য ১০ ফেব্রুয়ারি মুদ্রানীতি (এমপিএস) ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হওয়া ড. আহসান এইচ মনসুর প্রথমবারের মতো মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছেন। এবারের মুদ্রানীতি প্রণয়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের বিনিময় হার এবং রপ্তানি ও প্রবাসী আয়। ২০২৫ সালের মূল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসছে মূল্যস্ফীতি যা বিদায়ি ২০২৪ সালেও ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে বছরজুড়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে বাংলাদেশে মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এখনও দ্রব্যমূল্য কমাতে পারেনি। এখানে উল্লেখ্য, ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ ও নীতি সুদহার ১০ শতাংশ। প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ২ শতাংশ ধরা হলেও এ সময়ে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। আর দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে সাড়ে ১৭ শতাংশ। প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধে একই নীতি সুদহার ধরে রাখার পেছনে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের। প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধে একই রাখা হয়েছে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে বাজারে অর্থের জোগান কমাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, শুধু নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনাসহ অন্য যেসব বিষয় রয়েছে সব সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিনগুলোয় মূল্যস্ফীতি কমে আসবে বলে মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে প্রত্যাশা, বাস্তবতার নিরিখে তা কতটুকু বাস্তবসম্মত, এ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে : ক. মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং অনানুষ্ঠানিক খাত বেশি ভোগান্তির সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির বিরাট অংশ অনানুষ্ঠানিক। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বেসরকারি বিনিয়োগ। নানা পদক্ষেপ নিয়েও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো যাচ্ছে না। অর্থের প্রবাহ কমাতে গিয়ে বিনিয়োগের অর্থসংকট যেন তৈরি না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ, বিনিয়োগ হ্রাস পেলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটি কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। এ ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস বেসরকারি খাত। শিল্পের উৎপাদন, বিপণন কিংবা সেবা খাতের সিংহভাগই বেসরকারি খাতনির্ভর। সরকারি খাতের ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে খাতটি ঋণবঞ্চিত করা হচ্ছে। যদিও মূল্যস্ফীতি না কমে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আরও বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে ব্যবসাবাণিজ্যের পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। খেলাপি ঋণ বেড়ে ব্যবসায়ীরা আরও নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শীতকালীন সবজির দাম কমার প্রভাবে গত মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছিল। এ প্রভাব ক্ষণস্থায়ী, মৌসুম শেষ হয়ে গেলেই সবজির দাম আবার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য পণ্যের দাম তো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায়ই রয়েছে। খ. অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেগবান করার ক্ষেত্রে মুদ্রানীতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে, মুদ্রানীতির মাধ্যমে আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও তা অর্জনে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির ক্রিয়াকলাপের জন্য একক ক্ষমতার নীতি সুদহারের পাশাপাশি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বিশেষ রেপো বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা ও সুদহার করিডরের নিম্নসীমা রিভার্স রেপো বা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)। বর্তমানে এসএলএফ ও এসডিএফের সুদহার যথাক্রমে ১১ দশমিক ৫ ও ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। সাধারণত মুদ্রানীতির অন্যতম কাজ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা। ভোগ্যপণ্যের মূল্যস্তর, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতিকে গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রানীতি প্রণয়ন করা হয়। বলা যায়, মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করা হয়। একই উদ্দেশ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়েছে দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি। শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। এভাবে উচ্চ সুদহার বিদ্যমান থাকা অবস্থায় বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়ার সুযোগ নেই। তা ছাড়া বেসরকারি খাতে চাপ আরও বাড়বে। সুদহার বেশি থাকায় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমবে। বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমলে বিনিয়োগ কম হবে। কর্মসংস্থানও কম তৈরি হবে।

সার্বিক বিবেচনায় মুদ্রানীতির বাস্তবায়নে বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত ১. আগামী ছয় মাসের মধ্যে অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনতে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, সামাজিক সুরক্ষা নীতিÑ এ তিনটি একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে আমদানি শুল্ক কমাতে হবে যাতে পণ্য আমদানি ব্যয় কমে। ২. বাজারে মুদ্রা সরবরাহের গতি নিয়ন্ত্রণ করে মুদ্রাস্ফীতির ওঠানামাকরণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের যে সূত্র তা আর কাজে আসছে না। নীতি সুদহার ১০ শতাংশে তুলেও মূল্যস্ফীতিতে কোনো প্রভাব পড়েনি। তাই আপাতত এ ভোঁতা হাতিয়ার সাবধানে চালাতে চাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আসন্ন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার আর বাড়ছে না। তবে এখনই না কমিয়ে উৎপাদন খাতে কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর পদক্ষেপ আসতে পারে। ৩. দেশে মূল্যস্ফীতির পেছনে আরও বড় দুটি কারণ রয়েছে। যার একটি হচ্ছে ডলারসংকট, অন্যটি বাজার ব্যবস্থাপনা। ডলারসংকটের ফলে আমদানি, ভোগ্যপণ্যের জোগান ও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, এমন পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। খাদ্য মূল্যস্ফীতিই এখন বেশি তা শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে কমানো মোটেই যৌক্তিক নয়। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বাজার ব্যবস্থাপনার বড় ভূমিকা থাকে। তাই বাজার ব্যবস্থপনা যদি উন্নত করা না যায়, তাহলে শুধু খুচরা পর্যায়ে মূল্য বেঁধে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। খুচরা পর্যায়ে যারা আছে তারা তো বাজার কারসাজির এ খেলার মধ্যে নেই। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে ডলারসংকট কাটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, ব্যাংকিং সিস্টেমের মাধ্যমে ডলার না আসা। অর্থাৎ হুন্ডি বড় বাধা। প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলে ডলারের দরের পার্থক্য এত বেশি হয়ে গেছে যে, মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক চ্যানেলেই রেমিট্যান্স বেশি পাঠাতে চাইছে। এখানে পরিবর্তন দরকার হবে। ৪. অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নেতৃত্ব দিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগে বাস্তবতার নিরিখে লক্ষ্য নির্ধারণ ও বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া আর্থিক খাতের সংস্কারের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা দিয়ে রোডম্যাপ তুলে ধরা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ৫. নীতিসুদ বাড়ানোর পাশাপাশি ভ্যাট বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এতে নীতিসুদ বৃদ্ধির ফল পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের মাধ্যমে এগোতে হবে। তা না করে কেবল নীতিসুদ বাড়ানো হলে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে; এর জেরে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় প্রভাব পড়বে। ৬. সরকারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জÑ প্রথমত, বাণিজ্যসহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করা এবং তৃতীয়ত, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষত ব্যাংকগুলো শক্তিশালী করা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। এগুলোর সমাধানকল্পে সরকারের অবশ্য উৎসাহের কোনো ঘাটতি থাকার কথা নয়; যদি মুদ্রানীতির সফল বাস্তবায়ন দেখতে এবং দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চায়। কাজেই এসব সমস্যা সমাধানকল্পে আগামী মুদ্রানীতিতে আলেচিত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে হবে। তা হলেই দেশের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।

  • অধ্যাপক (অর্থনীতি), সাবেক ডিন ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা