সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:২২ এএম
রেলওয়ের রানিং স্টাফরা দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বেসিকের হিসাবে বাড়তি অর্থ পেতেন। প্রতি ১০০ কিলোমিটার ট্রেন চালালে অতিরিক্ত যোগ হতো মূল বেতনের এক দিনের বেসিকের সমপরিমাণ টাকা। এ ছাড়া মূল বেতনের হিসাবে অবসরকালীন ভাতা যা হয়, তার সঙ্গে অতিরিক্ত আরও ৭৫ শতাংশ টাকা তাদের পেনশন দেওয়া হতো। কিন্তু ২০২২ সালের জানুয়ারিতে অর্থ মন্ত্রণালয় রানিং স্টাফদের এ সুবিধা বাতিল করে। এরপর থেকেই তাদের ধারাবাহিক আন্দোলন, যার চূড়ান্ত রূপ ৩০ ঘণ্টার ধর্মঘট। তাতে অচল হয়ে যায় রেল যোগাযোগ। অপরিসীম ভোগান্তির শিকার হতে হয় যাত্রীদের।
২৯ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশের অনলাইন সংস্করণ থেকে জানা যায়, রেলকর্মীরা আন্দোলন প্রত্যাহার করেছেন।
আশা করা যায়, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তাদের দাবির বিষয়ে সুসংবাদও মিলবে। কিন্তু সাধারণের জন্য কি কোনো সুসংবাদ আছে? যেকোনো দাবি আদায়ের জন্য ধর্মঘট, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার যে কু-দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে, তা থেকে কি আমরা বেরিয়ে আসতে পারব? মানুষের যে দুর্ভোগ, তাদের যে অসহনীয় কষ্ট, সে সীমায় কি লাগাম পরানো যাবে? যদি যায়, তবে তা সাধারণ মানুষের পক্ষেও সুসংবাদ। ৩০ ঘণ্টা পর রেলকর্মীদের ধর্মঘট প্রত্যাহারের স্বস্তি কত দিন স্থায়ী হবেÑ সে প্রশ্নও থাকছেই।
যে দাবিগুলো নিয়ে ধর্মঘট ডাকা হয়েছে, সেগুলোর কী হবে তা বলা মুশকিল— কিন্তু সাধারণ মানুষের যে দুর্ভোগের সীমা নেই তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। ট্রেন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব জনজীবনে পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। ৩০ ঘণ্টা রেল চলাচল বন্ধ থাকায় চাপ পড়েছে বাসের ওপর। আর সুযোগ বুঝে বাসের ভাড়াও দ্বিগুণ হয়েছে। ‘রেলকর্মীরা অনড়, সমাধান অজানা’ শিরোনামে গতকাল বুধবার প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনেও যাত্রীর চাপ বেশি হওয়ায় বাসগুলোতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের কথা উঠে এসেছে।
রেল বন্ধ থাকলে শুধু যাত্রী পরিবহনেই সমস্যা তা তো নয়, পণ্য সামগ্রীও যথাসময়ে বাজারে পৌঁছবে না, ফলে দাম বাড়বে। যেসব পণ্য পরিবহন রেলনির্ভর, রেল বন্ধ হলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে বাজারদরেও এবং কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই মওকাটিকে ব্যবহার করবে অন্যায্যভাবে মুনাফা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। যেভাবে একের পর এক বিভিন্ন ধর্মঘট এবং মানুষের দুর্ভোগ ডেকে আনা হচ্ছে, তাতে সরকারের এদিকে নজর দেওয়া উচিত।
দাবি আদায়ের জন্য ডাকা ধর্মঘটের রেওয়াজ আজকের নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ধর্মঘট কতটা যৌক্তিকÑ তা ভাবার সময় এসেছে। বাসভাড়া বাড়ানোর দাবিতে বাস ধর্মঘট, বেতন বাড়ানোর দাবিতে কল-কারখানায় ধর্মঘট হরহামেশাই ডাকা হচ্ছে। কিন্তু দাবি আদায়ের জন্য এই যে সকলের স্বাভাবিক জীবন অচল করে দেওয়ার চেষ্টা, যারা ভুক্তভোগী তারাই জানে এর দুর্ভোগ ও কষ্ট। অথচ যারা ধর্মঘট ডাকে, তারা কি ভাবে ধর্মঘটের কারণে তাদের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এমন কত মানুষের ওপর এর বিরূপ প্রভাব বয়ে গেল? কত লোক কাজ করতে পারল না, কত লোকের ভোগান্তি হলো? আমরা মনে করিÑ সকল নেতিবাচকতা ও অন্যের ক্ষতির হিসাবের ওপর ভর করেই ধর্মঘটের সাফল্য স্থির হওয়া প্রয়োজন। শ্রমজীবী মানুষ ধর্মঘট করে কতখানি দাবি-দাওয়া আদায় করতে পারেন, তা ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু নিজের কর্মক্ষেত্র বাদ দিয়ে অন্য মানুষের জীবন কেন এবং কোন অধিকারে আমরা বিপর্যস্ত করব?
ধর্মঘট তো কখনই প্রণোদিত নয়, বরং সব সময়ই তা আরোপিত। আর সে কারণেই আমরা মনে করি, সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সকল ধরনের ধর্মঘটই অন্যায্য। রেল কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে যে দাবির জন্য আন্দোলন করছেন, তাদের সে সমস্যার বিষয়ে শুরুতেই নজর দেওয়া যেত। তাদের দাবি যৌক্তিক কি অযৌক্তিকÑ সেটাও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেত।
এমনকি কোন প্রেক্ষাপটে এবং কেন তাদের মাইলেজ প্রথা বাতিল হয়েছে, সে বিষয়টিও যথাসময়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না করে কেন ঝুলিয়ে রাখা হলোÑ সেই প্রশ্নটিও উত্থাপন করা যায়। তবে তাতে সাধারণের যে দুর্ভোগ পোহাতে হলো, তার সমাধান হয় না। আমরা মানুষকে জিম্মি করে যেকোনো ধরনের ধর্মঘটের বিরুদ্ধে। সমস্যা থাকতেই পরে, আর সমস্যা থাকলে তার সমাধানও রয়েছে। সমাধানের প্রথম পথ আলোচনা। আমরা যেকোনো সমস্যার শুরুতেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য বলি। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে বলি। ভবিষ্যতে মানুষকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের পথ পরিহারের জন্য বলি। সেই সঙ্গে রেলকর্মীদের যৌক্তিক দাবির প্রতিও সমর্থন জানাই।