× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুলিশের পোশাক পরিবর্তন

বদল আনতে হবে অভ্যন্তরীণ কাঠামোয়

ড. মো. নুরুল ইসলাম

প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:১১ এএম

ড. মো. নুরুল ইসলাম

ড. মো. নুরুল ইসলাম

দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অর্থাৎ পুলিশের পোশাক পাল্টাচ্ছে। সেই ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে পুলিশি ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয় ব্রিটিশ পুলিশের আদলে। তখন তাদের পোশাক ছিল খাকি। এরপর পুলিশের পোশাক কয়েকবার বদলেছে। মহানগর ও জেলা পর্যায়ে আমরা পুলিশের পরনে দুই রঙের পোশাক দেখেছি। ব্যাটালিয়ন ও ইউনিট হিসেবে পোশাকের ভিন্নতা রয়েছে। এমনটি সচরাচর পুলিশের বিভিন্ন ভাগের বিভক্তিকরণ। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি একটি মাত্র পোশাকেই সীমাবদ্ধ ছিল। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আমরা তা দেখেছি। ২০০৪, ২০১৬ ও ২০২১ সালে পুলিশের কয়েকটি ইউনিটের পোশাকের রঙ পরিবর্তন করা হয়েছিল। সর্বশেষ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছে। 

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবার পাল্টে যাচ্ছে পুলিশের পোশাক। গুলিতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী এই রাষ্ট্রীয় বাহিনী। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশের ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশের মহাপরিদর্শক তথা আইজিপি থেকে শুরু করে কনস্টেবলÑ সব সদস্যের রদবদল হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে পুলিশের পোশাক, মনোগ্রাম ও ক্যাপ থেকে নৌকার ছাপ পরিবর্তন করার দাবি উঠেছে। সংস্কার কমিশনও এ দাবির প্রতি একাত্মতা পোষণ করে পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের প্রাথমিক সুপারিশ করেছে। পুলিশ কর্তৃপক্ষও চাচ্ছে পোশাক পরিবর্তন করতে। এজন্য একটি কমিটি গঠন করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সরকারের শীর্ষপর্যায় সম্মতি দিলে এ বছরের মাঝামাঝি নতুন পোশাক ব্যবহার করবে পুলিশ। প্রশ্ন হচ্ছেÑ পুলিশ বাহিনীর পোশাকে পরিবর্তন আনলেই কি তা আমাদের সমস্যার সমাধান করবে? আদৌ এমনটি ভাবা ঠিক হবে না। বরং ভাবতে হবেÑ পুলিশের পোশাক বদলের বিষয়টি একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের আভাস। সংস্কৃতির এ পরতে পরতে রাজনীতির দৃঢ় সংযুক্তি রয়েছে এবং আমরা এ পরিবর্তনের মাধ্যমে মূলত সে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সূচিত করতে পেরেছি। তাই বিষয়টিকে এভাবে ভাবলে হবে না। পুলিশের আইনপ্রয়োগের ক্ষমতায় যেমন পরিবর্তন জরুরি, তেমনি মানুষের মধ্যে আইন মানার প্রবণতাও আরও দৃঢ় করতে হবে। যদি তা না করা যায়, তাহলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কিংবা সংস্কার করা সম্ভব হবে না।  শুধু তাই নয়, পুলিশের পোশাকের সঙ্গে কাঠামোগত পরিবর্তনও আনতে হবে। তাদের দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ সম্পর্কিত যে অভিযোগগুলো আছে, যেমনÑ তারা যদি কোনো অপরাধে জড়িত হয়, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আলাদা কোনো পদক্ষেপ থাকতে হবে। স্বাধীন পুলিশ কমিশন যদি তৈরি করা যায়, যেখানে পুলিশ তাদের অভিযোগগুলো জানাতে পারে, যেন তাদের দোষ-ত্রুটিগুলো তদন্তের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হয়Ñ এগুলো হবে ইতিবাচক পরিবর্তন। এ ছাড়া বদলি, পদোন্নতি এসব বিষয়েও সংস্কার প্রয়োজন। তাই বুঝতে হবে, পোশাক পাল্টালেই প্রকৃতিগত অবস্থা বদলায় না। 

আমরা দেখছি, বিগত কয়েক মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এ সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যস্ত সময় পার করতে হয়েছে। আবার এও সত্য, নানা কারণে বিভিন্ন শ্রেণি তাদের দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তারপরও সামাজিক পর্যায়ে যে ধরনের বিচ্যুতি দেখা গেছে, তা নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। মনে রাখতে হবে, বিগত সরকারের সময় রাজনৈতিক সুবিধা এবং অবকাঠামোর কারণে পুলিশ প্রশাসন একধরনের স্বেচ্ছাচারিতায় ভুগছে। ওই কাঠামোয় যারা অবস্থান করেছে তারা রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে পেরেছেÑ এমন অভিযোগ বহু পুরোনো। আর এ কারণেই পুলিশ নামটিই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক হয়ে গেছে। গত ১৭ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ ভ্যারিফিকেশন অনেকের জন্য আতঙ্ক হয়েছিল। কারণ অনেকেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পায়নি। 

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর পুলিশের অভ্যন্তরীণ মানসিকতা আমাদের বুঝতে হবে। অনেক পুলিশই নানা কারণে কর্মস্থলে ফেরার আগ্রহ পায়নি। তাদের প্রজ্ঞাপন দিয়ে ফেরানো হয়েছে। অর্থাৎ পুরোনো কাঠামো ঠিকই রয়ে গেছে। পোশাক পাল্টে আমরা মানুষের মনের আতঙ্ক সরাতে পারলেও ভেতরের কাঠামোগত সংকট দূর করতে পারব না। তাই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু বদল আনতেই হবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দফায় বেশ কয়েকটি খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রথম দফায় যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, তার মধ্যে পুলিশও আছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পুলিশ সংস্কার কমিশন প্রধান তার সুপারিশ প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। 

আসলে পুলিশের মধ্যে কী পরিবর্তন মানুষ আশা করেছিল? সংস্কার কমিশন গঠনের পর তারা সাধারণ মানুষের মনোভাব বুঝতে একটা জরিপ করে। প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সে জরিপে তাদের মতামত দিয়েছে। এই মতামতদানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ৮৯ দশমিক ৫ বলেছেÑ তারা এমন পুলিশ বাহিনী চায়, যারা হবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ, আইনের প্রতি অনুগত ও দুর্নীতিমুক্ত। ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেÑ গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে অপরাধী পুলিশের জবাবদিহি ও শাস্তি যেন নিশ্চিত হয়। ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেÑ পুলিশ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে। 

পুলিশ সংস্কারের যে সকল প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে কি মানুষের আইন প্রয়োগবিষয়ক প্রত্যাশাগুলো পূরণ হবে? যদি রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলি, সংস্কার প্রস্তাবে সেটা নিরসনের সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা আছে বলে আমার মনে হয়নি। সংস্কার প্রস্তাবে অবশ্য ‘প্রভাবমুক্ত’ পুলিশ কমিশন গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে। তবে সেই পুলিশ কমিশন কার প্রভাবমুক্ত হবেÑ সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলা হয়নি। খসড়া প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ‘স্বাধীন’ পুলিশ কমিশনে জাতীয় সংসদের সরকারি দল ও বিরোধী দলের দুজন করে সদস্য থাকবেন। এমন প্রস্তাব কি পুলিশকে রাজনীতির বাইরে নিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে? 

বিগত সরকারের আমলে নানা ধরনের গুম-খুনের সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। এমন কি রাত-বিরাতে মানুষের বাসায় গিয়ে মানুষকে ধরে আনা হতো নানা ঠুনকো অজুহাতে। তারপর থেকেই শুরু হতো নানা ধরনের হুমকি-ধামকি, অর্থ আদায়ের প্রচেষ্টা। দাবি অনুযায়ী অর্থ না পেলে ক্রসফায়ারের নামে চলত বিচারবহির্ভূত হত্যা। কখনও কখনও গুম করে ফেলা হতো। বলা হয়েছেÑ আদালতের আদেশ ছাড়া এফআইআর-বহির্ভূত আসামিকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। সংস্কার কমিশনের রিপোর্টে এ বিষয়টি উঠে এসেছে। একটি সুপারিশে বলা হয়েছেÑ বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমের সামনে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। 

যে কেউ বলবেন, সুন্দর সুন্দর প্রস্তাব দেওয়া হয়তো খুব একটা কঠিন নয়, বরং কঠিনতম বিষয় হচ্ছে সমাজের প্রতিকূল ব্যবস্থার মধ্যে সেই সুন্দর প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা। রাজনীতি যদি ঠিক করা না যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন না হয়, তাহলে পুলিশকে রাজনীতি থেকে বাইরে রাখা অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার। যতটা নৈতিক দৃঢ়তা থাকলে পুলিশের একজন নিম্নতম সদস্যও মন্ত্রী-এমপিদের অন্যায় অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে, সেটা কি আমাদের এই সামাজিক বাস্তবতায় সম্ভব? তেমন একজন দৃঢ়চেতা পুলিশকে কি তার প্রশাসন যথাযথ প্রটেকশন দিতে পারবে? না পারলে ভালো ভালো সংস্কার প্রস্তাব হয়তো কেবল খাতা-কলমেই থেকে যাবে। অথবা পোশাক পরিবর্তনের মতো কিছু এলোমেলো কাজের মধ্যেই সাফল্য খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করতে হবে।

প্রাসঙ্গিকভাবে পোশাক পরিবর্তনের বিষয়টি যখন এসেই গেল, সেটা নিয়ে কিছু কথা বলি। এসব সংস্কার প্রস্তাব যখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করা হচ্ছিল, তার পাশাপাশি সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটা উদ্ভট সিদ্ধান্ত নিল পুলিশের চরিত্র পরিবর্তনের জন্য। তারা পুলিশ, র‌্যাব আর আনসারের পোশাক পরিবর্তনের একটা ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। পোশাক বলতে কেবল কাপড়ের রঙ পরিবর্তনের বিষয়টিই আমরা দেখতে পেলাম। পুলিশের পোশাক সরকার সরবরাহ করে থাকে। ফলে প্রায় দুই লাখ পুলিশ, বিপুলসংখ্যক আনসার ও র‌্যাবের জন্য এবার নতুন করে পোশাক পরিবর্তন করতে হবে। এই খাতে ব্যয় কত হবে? তিন উপদেষ্টা বসে যে বিফ্রিংয়ে নতুন পোশাকের কথা জানালেন, সেখানে কিন্তু ব্যয়ের কথা কিছু বলা হলো না। আসলে পোশাক পাল্টে গেলেই  চরিত্র পাল্টে যায় না। সবার আগে দরকার পুলিশের  মনমানসিকতার পরিবর্তন। পুলিশকে হতে হবে জনগণের কার্যকর বন্ধু। সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে সংস্কারের বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায় জনগণ।

  • অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা