× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কৃষিপণ্য

ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হোক

মামুন রশীদ

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:০৩ এএম

ফসলের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হোক

শিম নেন ১০ টাকায়। নিলে নেন দশ টাকায়, বাইছা নেন দশ টাকায়, কেজি নেন দশ টাকা। অথবা ফুলকপির হালি বিশ; এইইই আলু নেন ২৫-এ, চার কেজি একশ, চার কেজি একশ; পেঁয়াজ নেন দুই কেজি নব্বই, এরকম হাঁকডাক চলতি পথের ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে। অথচ মৌসুমের শুরুতেই একটি ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ৭০ থেকে একশ টাকায়। শিমের কেজি কোনোভাবেই তিন অঙ্কের নিচে নামেনি। আর পেঁয়াজের কথা তো লেখাই বাহুল্য। পেঁয়াজের ঝাঁজ নিয়ে বাঙালিকে কম নাকাল হতে হয় না। সরকারকেও বেকায়দায় ফেলে দিতে পেঁয়াজের জুড়ি নেই। দেশে তো বটেই, বিদেশেও ছুটতে হয় পেঁয়াজের খোঁজে। অথচ এখন ভরা মৌসুমে মোটামুটি সব সবজিরই দাম হাতের নাগালে। চাল ও ভোজ্যতেল মানুষকে স্বস্তি না দিলেও সবজি মানুষকে স্বস্তি দিচ্ছে। যখন পণ্যের দাম কমে, তখন চলতি পথের বাজারের বিক্রেতা, ‍যিনি ভ্যানগাড়িতে পণ্য সাজিয়ে রাখেন, তিনি উচ্চস্বরে দাম হাঁকিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করেন।

ক্রেতা প্রয়োজন না থাকলেও তখন বাড়তি পণ্য নিতে বাধ্য। দাম কম, বিক্রেতা পরিমাণে কম বেচবে না। তারও তাড়া আছে, দ্রুত ভ্যান খালি করে ঘরে ফেরার। তাই ফুলকপির হালি ২০ হলেও ক্রেতার একটি নেওয়ার সুযোগ নেই। শিমের কেজি ১০, কিন্তু হাফ কেজি নেওয়ার উপায় নেই। ফলে অনেক সময়ে দাম কমলেও তার প্রকৃত সুবিধা ক্রেতার জোটে না। সে ক্ষেত্রে বাড়তি সবজি অপচয়ই বেশি হয়। তবে সবজির এই দাম পড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য খুশির হলেও, মাথায় হাত পড়েছে কৃষকের। কারণ? তাকে তো উৎপাদন খরচ তুলতে হবে। সেই খরচ তোলার সঙ্গে লাভেরও মুখ দেখতে হবে। না হলে তারই-বা সংসার চলবে কীভাবে?

সম্প্রতি ‘পানির দামে আলু, দিশাহারা কৃষক’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ। প্রতিবেদনটির পুরো অংশ যদি কোনো পাঠক নাও পাঠ করেন, তারপরও তার পক্ষে অবস্থা কল্পনা করা কঠিন না। মৌসুম শুরুর আগে বাজারে আলুর দামের কথা ক্রেতা ভুলে যাননি। খাবার জন্য ৮০ টাকা কেজি দরে আলু কিনতে হয়েছে কৃষককেও। তার হাতেও তখন আলু ছিল না। মৌসুমের শুরুতেই বাজারে চাহিদার অতিরিক্ত আলু হিমাগারে ‍ঢুকে যায়। কম দামে সংগ্রহ করা আলুই, কয়েক মাস হিমাগারে থেকে বেরিয়ে আসে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রির জন্য। মাঠ থেকে হিমাগার হয়ে ক্রেতার হাতে আসার আগেই মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে পড়ে আলুর দাম বাড়ে কয়েকগুণ। মাঝ থেকে কৃষকের ভাঁড়ার থাকে শূন্য, আর বাড়তি চাপে খালি হয় ভোক্তার পকেট। 

কৃষি ও কৃষক আমাদের গর্ব বলেও প্রচার চালাই। কিন্তু উদয়াস্ত পরিশ্রম করে কৃষক ফসল উৎপাদন করেন, অথচ তার দাম পান না। বাজারে দাম বাড়া-কমার সঙ্গে কৃষকের কোনো সম্পর্ক থাকে না। এর নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে, অন্য কোনোখানে

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে কৃষক ফসল ফলায়। কিন্তু সেই কৃষকই বারবার বঞ্চনার শিকার হয়। আমরা দেখেছি, অতীতে বিভিন্ন সময়ে কৃষক ফসলের নায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষোভে, বেদনায় উৎপাদিত ফসল নষ্ট করেছেন। ধানের দামে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব কৃষক ধানে আগুন দিয়েছেন। পাটের দাম না পেয়ে পাটে আগুন ধরিয়েছেন। মুলা, টমেটোসহ বিভিন্ন সবজি রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। এবারও খবর বেরিয়েছে, কৃষক ফসলের মাঠেই রেখে দিয়েছেন ফুলকপি, বাঁধাকপি। ট্রাক্টর দিয়ে ক্ষেত নষ্ট করারও ছবি সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কারণ, ফসল তুলে বাড়তি খরচের বোঝা কাঁধে না চাপিয়ে নষ্ট করে ফেলাই ভালো মনে করেছেন তারা। নিজের হাতে উৎপাদিত ফসল নষ্ট করায় কৃষকের যে মর্মবেদনা তা হয়তো আমাদের অন্তরে প্রবেশ করে না, আলোড়িত করে না। আর করে না বলেই আমরা কৃষকের বেদনা লাঘবের জন্য সভা-সমিতির আলোচনা এবং পত্রপত্রিকার লেখায় সমবেদনা প্রকাশ করি। কিন্তু তাদের দুর্দশা লাঘবে উদ্যোগ নেই না। তাদের উৎপাদিত পণ্যের নায্য পাওনা নিশ্চিত করি না। 

আমাদের কৃষক সহায়তা চান না, তারা চান উৎপাদিত পণ্যের নায্য দাম। উৎপাদিত ফসলের খরচ ওঠানোর নিশ্চয়তা চান। ভুলে গেলে চলবে না, যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে এই কৃষকই আমাদেরকে তলাবিহীন ঝুড়ির আখ্যা থেকে বের করে এনেছিলেন। তাদের পরিশ্রমেই আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। তারাই আমাদেরকে করোনা অতিমারির ধাক্কা বুঝতে দেননি। যখন পুরো বিশ্বই থমকে গিয়েছিল, তখনও সচল ছিল আমাদের কৃষি। কৃষক তার উৎপাদন থামাননি বলেই খাদ্যাভাব দেখা দেয়নি। অথচ আমরা কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তনে এখনও যথাযথ নজর দিতে পারিনি। 

যে বছর যে সবজির বাজার ভালো থাকে, কৃষক সাধারণত পরের বছর সে পণ্যটিই উৎপাদনে নজর দেন। কিন্তু বাজারের চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের তুলনামূলক তথ্য কৃষকের কাছে না থাকায় তাকে লোকসানের বোঝা বহন করতে হয়। করোনাকাল থেকেই আলুর কদর বাড়ছে। সঙ্গে তার ঊর্ধ্বমুখী দামও। এতে কৃষকও আগ্রহী হয়েছে বাড়তি আলু চাষে। কিন্তু বাজারের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের সমন্বয় না হওয়ায় কৃষক দাম পাচ্ছেন না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ঠাকুরগাঁও জেলাতেই গত মৌসুমে যেখানে ২৬ হাজার ১৬৮ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়, সেখানে এবার আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমিতে যারা আগাম আলু চাষ করেছেন, তারা কেজিপ্রতি দাম পেয়েছেন ৬০-৭০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে এখন খোলাবাজারেই আলুর কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকা। ফলে আলুর বাড়তি দামের যারা আশা করেছিলেন, তারা লোকসানের ঝুঁকিতে পড়েছেন। কিন্তু আলুর জন্য বীজ, সার, কীটনাশকসহ সবকিছুর খরচ কিন্তু একই। মাঝে থেকে প্রায় দ্বিগুণ খরচ করেও কৃষক উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না। এই যে তথ্যের ঘাটতি, এ দিকটিতে আমাদের নজর দেওয়া জরুরি। 

অতিমারি করোনাকালে জাপানের কৃষকদের নিয়ে একটি গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। গল্পটির মূল ব্ক্তব্য, জাপানি কৃষকদের উৎপাদিত চালের তুলনায় বাজারে আমদানি করা চালের দামও কম, খেতেও ভালো। তা দেখে একজন ভিনদেশি স্থানীয় একজনকে বলেন, তোমরা কেন বেশি দামে এই চাল কেনো? সরকারই বা কেন এই চাল উৎপাদনে ভর্তুকি দেয়? জবাবে স্থানীয় ব্যক্তিটি জানান, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে, ভারী শিল্প আমাদের আর্থিক সুবিধা দিলেও, খাবার দেবে না। মহাযুদ্ধ দেখিয়েছে, নিজেদের খাবার না থাকলে প্রয়োজনে টাকা থাকলেও বাইরে থেকে আনা খুবই কঠিন। তাই আমরা যদি কৃষককে প্রণোদনা না দেই, তারা যদি উৎপাদনের খরচ না তুলতে পারেন, তারা যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পেশা ছেড়ে দেন। তাহলে বিপদের সময়ে আমাদের খাবার জোগান দেবে কে? এজন্যই আমরা বেশি দামে দেশের চাল কিনি। 

গল্পটির মূলকথা আমরা উপলব্ধি করেছিলাম বলেই হয়তো সে সময়ে অসংখ্য মানুষের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের দেয়ালে দেয়ালে ঘুরেছিল। কিন্তু সেই উপলব্ধি যে অন্তঃসারশূন্য, তা যে অনেকাংশে কুম্ভিরাশ্রু, প্রকৃতার্থে কৃষকের জন্য নয় সে কথাটিও হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। আমরা কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে নিজেদের পরিচিতি করাই। কৃষি ও কৃষক আমাদের গর্ব বলেও প্রচার চালাই। কিন্তু উদয়াস্ত পরিশ্রম করে কৃষক ফসল উৎপাদন করেন, অথচ তার দাম পান না। বাজারে দাম বাড়া-কমার সঙ্গে কৃষকের কোনো সম্পর্ক থাকে না। এর নিয়ন্ত্রণ অন্য কারও হাতে, অন্য কোনোখানে। এই অবস্থার অবসান না হলে, প্রতিনিয়ত লোকসানের বোঝা টানতে টানতে আমাদের কৃষক যদি ফসল উৎপাদন ছেড়ে দেন, তার পরিণতি কি আমরা ভাবী? আমাদের ভুলে গেলে চলবে না কবির সেই পঙ্‌ক্তি, ‘সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা,/দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।’ আমরা কৃষকের বঞ্চনার ছবি দেখতে চাই না। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির আশা কৃষক। কৃষক ও কৃষির সঙ্গেই আমাদের বাঁচা-মরা। কৃষককে বাঁচাতে তাই তার উৎপাদিত ফসলের নায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক বাঁচলেই নিশ্চিত হবে স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা।

  • কবি ও সাংবাদিক
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা