সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ ০৯:৪৬ এএম
খাদ্যপণ্য সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে মূল্যবৃদ্ধির সেই পুরোনো ফন্দি আঁটছে একটি অসৎ ব্যবসায়ী মহল। মহলটি খাদ্যপণ্য খালাস না করে বাজারে সরবরাহ সংকট সৃষ্টি করে বাড়তি মুনাফার পাঁয়তারা করছে। ১৪ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাম বাড়ানোর এ ফন্দির বিষয়ে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। অভিযোগ আছে, আমদানি করা পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে দেড় মাস ধরে ভাসছে ৫০০ লাইটার জাহাজ। অথচ পণ্য খালাসে সময় লাগতে পারে সর্বোচ্চ আট দিন। প্রকাশিত সংবাদে দেখা গেছে, বিদেশি জাহাজ থেকে পণ্য লোড করে নির্ধারিত গন্তব্যে খালাস করতে একটি লাইটার জাহাজের সাত থেকে আট দিন লাগে। সে হিসেবে বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) প্রতি ট্রিপ পণ্য খালাসের জন্য একটি লাইটার জাহাজকে ১২ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত সময় দেয়। কিন্তু ৪৫ দিন পার হলেও জাহাজ পণ্য খালাস না করে সাগরে ভাসছে। বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, আমাদের কাছে যে তথ্য আছে ৮৭৬টি লাইটার জাহাজ মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য লাইটারিং করার পর সেগুলো খালাস না করে অলস বসে আছে। জাহাজগুলোতে চিনি, ডাল, ভোজ্য তেল, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল রয়েছে। পণ্য বোঝাই একেকটি জাহাজ ৩০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত বসে আছে। যে কারণে চাহিদামতো লাইটার জাহাজও সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
অভিযোগের সত্যতা উঠে এসেছে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মন্তব্যেও। তারা মনে করে, এটি সেই পুরোনো খেলা। বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর জন্যই এসব পন্থা অবলম্বন করেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। জাহাজে পণ্য থাকলে একটি পণ্য আমদানি হওয়ার পরও বাজারে তার রিফ্লেকশন দেখা যায় না। যে কারণে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তাই বড় জাহাজ থেকে লাইটারিংয়ের পর ব্যবসায়ীরা যাতে লাইটার জাহাজে পণ্য মজুদ রেখে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি করতে না পারেন তা মনিটরিংয়ে সরকারকে আরও কঠোর হওয়া দরকার। তবে ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, পণ্য খালাসে বিলম্বের পেছনে আমদানিকারকদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নেই। তাদের ব্যাখ্যা, দুটি কারণে জাহাজে পণ্য গুদামজাত করা হয়।
প্রথমত. অনেক আমদানিকারক চিন্তা করেন জাহাজে রেখেই মালগুলো বাজারে বিক্রি করে দেবেন। তখন তারা মাল খালাস না করেই জাহাজে রেখে দেন। আবার অনেকে গুদামে খালি জায়গা না থাকলে তখন মাল খালাস না নিয়ে জাহাজে রেখে দেন। তবে প্রেক্ষিত যা-ই হোক, এতে একদিকে বাজারে পণ্যের সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হচ্ছে; অন্যদিকে পণ্যবোঝাই জাহাজগুলো অলস বসে থাকায় বড় জাহাজ থেকে পণ্য লাইটারিংয়ের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এ সমস্যাটি দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত।
আমদানিকৃত পণ্যের উচ্চমূল্য দেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে অস্বস্তির বিষয়। এটা অর্থনীতিতেও বড় সমস্যা। তাই সরকার আমদানিকৃত বেশিরভাগ পণ্যের ক্ষেত্রে ভর্তুকিও দিয়ে থাকে। ইতোমধ্যে বেশকিছু পণ্যের দাম নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। রমজান সামনে রেখে শঙ্কা আরও বাড়ছে। এ কথা সত্য, বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। যার প্রভাবে বহু দেশের মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। বিশ্বে খাদ্যমূল্য সহনশীল হলেও বাংলাদেশের মানুষকে তা কিনতে হচ্ছে উচ্চমূল্যে।
সাম্প্রতিক সময়ে পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও আমদানিকৃত পণ্যের দামে তেমন একটা হেরফের হয়নি। বলা চলে এখনও লাগামহীন। সে কারণে গত নভেম্বরে সরকার ভোজ্য তেলসহ ১১টি খাদ্যপণ্য আমদানির ওপর গুরুত্ব দেয়। লক্ষ্য ছিল, রোজায় পণ্যের মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা। সে লক্ষ্য যে ব্যাহত হতে পারে এ প্রতিবেদন থেকেই অনুমান করা যায়। তাই পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবার আগে সরবরাহব্যবস্থা ঠিক রাখতে হবে। আমরা মনে করি, সরবরাহব্যবস্থায় সঠিক তদারকির অভাবই মানুষকে উচ্চমূল্যে খাদ্যপণ্য কিনতে হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাস সামনে রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমদানিকৃত
এসব পণ্য দ্রুত খালাসের ব্যবস্থা করতে হবে। আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য যেন সিন্ডিকেট তথা অসাধু ব্যবসায়ীদের কোপানলমুক্ত হয়, সরকার ও সংশ্লিষ্টদের তা নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের সংকট সৃষ্টির কোনো পাঁয়তারা যেন কিছুতেই সফল না হয়।