সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০২৫ ১৩:৫১ পিএম
‘ভরা মৌসুমেও চালের চড়া দামে নানা প্রশ্ন’ শিরোনামে ৯ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি উদ্বেগের। খবরটি সাধারণের স্বস্তি কেড়ে নেওয়ার জন্যও যথেষ্ট। কারণ চালের দাম বাড়লে মানুষ স্বস্তি হারাবে। এক সপ্তাহে কেজিপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ৩ থেকে ৪ টাকা। অথচ এই সময়ে চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এখন চলছে আমনের ভরা মৌসুম। সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে তো বটেই, খাদ্য ও বাণিজ্য উপদেষ্টার বরাতেও জানা যাচ্ছে, দেশে এখন চালের সংকট নেই। চালের মজুদও যথেষ্ট। তারপরও কোন অজুহাতে চালের দাম বাড়ছে?
চালের দাম বাড়ার পেছনে সাময়িক মজুদদারিকে দায়ী করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা। ৮ জানুয়ারি টিসিবির জানুয়ারি মাসের পণ্য বিক্রির কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি আমনের ভরা মৌসুমে বাজারে চালের ঘাটতি নেই বলেই জানিয়েছেন। সঙ্গে চালের মূল্যবৃদ্ধিকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে ব্যাপকভাবে চাল আমদানির উদ্যোগের কথাও বলেছেন। চালের দাম বাড়ার পেছনে যে কারসাজি রয়েছে, তা তো অস্বীকার করার জো নেই। বাজারে দাম বাড়া-কমার পেছনের কারসাজি নতুন নয়। বিগত রাজনৈতিক সরকারের আমলেও এমন কু-নজির দেখা গেছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই বহুবার আমরা চালের বাজার নিয়ে কারসাজির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পক্ষে বলেছি। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি, তাও তো দৃশ্যমান।
মানুষকে স্বস্তি দিতে হবে। মানুষ স্বস্তি চায়। মূল্যস্ফীতির যে অভিঘাত গত কয়েক বছর ধরে মানুষ বয়ে চলেছে, তা থেকে মুক্তি চায়। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে মানুষের প্রত্যাশা ছিল আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে। বাজার থেকে যেভাবে টাকা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, খেলাপি ঋণের যে পাহাড় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে মুক্তি মিলবে। কিন্তু কার্যত খুব বেশি সুফল দেখা যায়নি। ফলে মূল্যস্ফীতি তো কমেইনি, বরং কিছুটা যে বেড়েছে তা স্বীকার করেছেন সরকারের পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদও। ‘মূল্যস্ফীতি এখনও বাড়তি, চাপে আছে মধ্যবিত্তরা’ শিরোনামে ৯ জানুয়ারি প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ভিন্ন একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক শেষে অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেন, ‘মূল্যস্ফীতি সবাই বলছে কিছুটা কমেছে, কিন্তু এটাকে কম বলে না। মূল্যস্ফীতি এখনও বাড়তিই আছে। এর ফলে দিনমজুরদের ওপর চাপ পড়ছে। মধ্যবিত্তরাও চাপে আছে।’
চালের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকার আমদানির উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছে। আমরা জানি, শুধু বেসরকারি উদ্যোগেই নয়, দেশে সরকারি পর্যায়েও চাল আমদানি হয়। বাজার নিয়ন্ত্রণের তাগিদ থেকে সরকার ইতঃপূর্বে চালের আমদানি শুল্কও কমিয়েছে। কিন্তু অতীতে বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। চালের বাজার সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণেÑ এই অভিযোগও তো পুরোনো। সিন্ডিকেট ভাঙতে বহু কথাবার্তা হয়েছে। কিন্তু সিন্ডিকেটের কবল থেকে বাজার মুক্ত হয়নি। কারসাজির হোতাদের কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য শাস্তির নজিরও আমাদের সামনে নেই। অপরাধীর শাস্তি হয় না বলেই অপরাধীরা বারবার অপরাধ করার সাহস পায়। আমরা প্রত্যাশা করি, মানুষকে স্বস্তি দিয়ে, মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করতে এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার সিন্ডিকেটের হোতাদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করবে। অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নব উদ্যমে তৎপর হবে। যাতে কোনো অসাধু চক্রই যেন বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে। সরকারের কড়া নজরদারিই পারে বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে। বাজার অস্থিতিশীল করার সকল কারসাজি ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে একটি স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থা গড়ে উঠবে এবং সেখানে অসাধু চক্রের কোনো কারসাজি থাকবে না।
আমরা বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের দুর্ভোগ লাঘবে ওএমএসের মাধ্যমে চাল বিক্রির পরিধি বাড়ানোর জন্য বলি এবং এই প্রক্রিয়া শুধু শহরাঞ্চলেই নয়, গ্রামে-গঞ্জেও ছড়িয়ে দিতে বলি। আমরা চাই না, ‘অসারের তর্জন গর্জন সার’ প্রবাদটি সত্য হোক। আমরা সান্ত্বনা বাক্যের মধ্যেও সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। বাজার নিয়ন্ত্রণে যারা কারসাজি করছে, যারা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। অপরাধীকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিতে হবে। বাজারকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। মধ্যস্বত্বভোগী বড় বড় কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে দেশের বাজারব্যবস্থা কোনোভাবেই জিম্মি হতে পারে না। যেকোনো মূল্যে এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। অসাধু চক্রের সকল কারসাজি ভেঙে একটি স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থা গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত করতে বাজার নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর হতেই হবে।