সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৪১ এএম
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:৪২ এএম
আমাদের শ্রমিক শ্রেণি বরাবরই বঞ্চিত। শ্রম দিয়েও ন্যায্য মজুরির জন্য
তাকে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করতে হয়। নিরলস পরিশ্রম করেও তারা কারখানায় নিজেদের
প্রয়োজনীয় বা নিরাপদ ভাবতে পারেন না। মালিকপক্ষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে তাদের
কর্মজীবন। যেকোনো সময় চাকরিচ্যুত হওয়ার শঙ্কা মাথায় নিয়েই শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। দেশে
শ্রম আইন রয়েছে, শ্রমিকের নিরাপত্তার জন্য সরকারের তরফে উদ্যোগও রয়েছে। কিন্তু তারপরও
শ্রমিকদের নিরাপত্তা আক্ষরিক অর্থেই নিশ্চিত হয়নি। কারণে-অকারণে তো বটেই, মালিকপক্ষের
ইচ্ছাতেও যখন-তখন চাকরিচ্যুত করা হয় শ্রমিকদের। অভিযোগ রয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা
হয় না শ্রম আইন। দেখা হয় না শ্রমিকের অধিকার। তারই উদাহরণ হয়ে এসেছে ২৩ ডিসেম্বর প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন। ‘আহত শ্রমিক ছাঁটাই, মানা হয় না আইন’ শিরোনামের
প্রতিবেদনটিতে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকজন শ্রমিকের বেদনাঘন কথায় উঠে এসেছে সময়ের
নির্মম চিত্র। জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হতাহতের সংখ্যা অনেক। সেই হতাহতের
তালিকায় শ্রমিকরাও রয়েছেন। যারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অনেকে আহত হয়ে হারিয়ে ফেলেছেন
কর্মক্ষমতা। অথচ আহত এই শ্রমিকরা যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তাদের ছাঁটাই করার সময়
যথাযথভাবে আইন অনুসরণ করা হয়নি। কাজে যেতে না পারায় কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের চাকরি
না থাকার কথা জানিয়েছে। কিন্তু বুঝিয়ে দেয়নি আইন অনুযায়ী ন্যায্য প্রাপ্য।
শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করলে নোটিস দিতে হয়। এ ছাড়া
তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হয় প্রতিষ্ঠান থেকে। তবে কারখানাগুলো থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন
না শ্রমিকরা। আইন অনুযায়ী, কারখানা যে কাউকেই চাকরিচ্যুত করতে পারে। সেক্ষেত্রে যাকে
চাকরিচ্যুত করা হবে, তাকে নোটিস দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। রয়েছে চাকরিচ্যুত শ্রমিককে
নির্দিষ্ট সময়ের বেতন ও তার প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা বুঝিয়ে দেওয়া। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে,
অধিকাংশ ক্ষেত্রে কারখানা কর্তৃপক্ষ চাকরিচ্যুত শ্রমিককে নোটিস দেয় না, চাকরিচ্যুত
করার পর তাদের প্রাপ্য পাওনা বুঝিয়ে দেয় না। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর জন্য আইন রয়েছে,
শ্রম আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই আইন এবং শ্রম আদালত পর্যন্ত যাওয়া অনেকের
পক্ষেই সহজ হয়ে ওঠে না। এজন্য সচেতনতার যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে দীর্ঘসূত্রতার
অভিযোগও। ফলে চাকরিচ্যুত অনেক শ্রমিকই তার প্রাপ্য বুঝে নিতে পারেন না।
শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। শ্রম আইন যেন যথাযথভাবে মেনে
চলা হয়, তা যেন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকটি নিশ্চিত করতে হবে। আর এ
দিকটি নিশ্চিত না হলে শ্রমিক অসন্তোষ থাকবে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কমে যাবে উৎপাদনব্যবস্থা,
যা অর্থনীতির জন্যও বড় ক্ষতি। শ্রমিকরা যদি তাদের অধিকার আদায়ের জন্য, ন্যায্য পাওনা
আদায়ের জন্য রাজপথে নামে, সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, তার নেতিবাচক প্রভাব দেশে তো
বটেই বিদেশেও পড়ে। এ থেকে উত্তরণের জন্য শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিটি শ্রমিকের পাওনা যেমন
নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে কর্মপরিবেশ ও হঠাৎ করে যেন কাউকে চাকরিচ্যুত
করা না হয়, বা হলেও যেন যথাযথভাবে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আশার কথা বর্তমানে শ্রম সংস্কার কমিশনের ভাবনাতেও বিষয়টি রয়েছে। যা
নিশ্চিত হয়েছে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান
ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন
আহমেদের মন্তব্যে। শ্রমিকের অধিকার ও তার ন্যায্য প্রাপ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন,
‘বেতন বকেয়া থাকলে শ্রমিকরা তো বারবার রাস্তায় নামবেই। কারণ রাস্তায় না নামলে তাদের
কথা কেউ শোনে না। এখন আমাদের প্রথম কাজ হলো, শ্রমিকদের বেতন যেন বকেয়া না হয়। সবকিছু
মাথায় রেখে সম্মিলিত ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে শ্রম সংস্কার কমিশন সুপারিশ প্রণয়ন
করা হবে।’
আমরা প্রত্যাশা করি, শ্রম সংস্কার কমিশন শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিতে যেমন কাজ করবে তেমনি কারখানা মালিক ও শ্রমিকের সমন্বয়ে শ্রমবান্ধব পরিব্শে তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। শ্রমের ক্ষেত্রে শ্রমিক-মালিকের মাঝে ন্যায্য পাওনা নিয়ে যে বৈষম্য, তা দূর করতে উদ্যোগী হবে। সমাজের সকল স্তরে বৈষম্য দূর করতে সম্পদের সুষম বণ্টন যেমন প্রয়োজন তেমনি বৈষম্য নিরসন আরও জরুরি। সমাজের কোনো জনগোষ্ঠী যদি বৈষম্যের ছায়ায় থাকে তাহলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। শুধু শ্রমিকের অধিকারের প্রশ্নেই নয়, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মানুষের জীবনযাপনের সব অনুষঙ্গ আমলে রাখতে হবে। কেউ যেন বঞ্চিত না হয়, কাউকে যেন অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা না হয়, চাকরিচ্যুত কাউকে যেন তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত রাখা না হয়, তা নিশ্চিতের মাধ্যমেই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে উদ্যোগী হতে হবে।