প্রজন্মের ভাবনা
তপন কুমার ঘোষ
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৩৫ পিএম
প্রবা গ্রাফিক্স
ধূমপান ও মাদক সেবন ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ধূমপানে বিষপান, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, ধূমপান ক্যানসারের কারণ’Ñ এসব কথা সবারই জানা। তবু দিন দিন বেড়েই চলেছে ধূমপায়ীদের সংখ্যা। ধূমপায়ীদের চেয়ে পরোক্ষ ধূমপানের কথা ভাবতেই কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। লাখ লাখ অধূমপায়ী মানুষ ধূমপান না করেও পরোক্ষ ধূমপানের ফলে ধূমপায়ী ব্যক্তির সমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ফলে পাবলিক প্লেসে, গণপরিবহনে প্রকাশ্যে ধূমপান করছে ধূমপায়ী ব্যক্তিরা। যার কারণে দিন দিন বেড়েই চলেছে পরোক্ষ ধূমপানে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সংখ্যা।
পরোক্ষ ধূমপান কী? অধূমপায়ী কোনো ব্যক্তি যখন ধূমপানকারীর মুখ থেকে নির্গত তামাকের ধোঁয়া নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে তখন তাকে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়। পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার হওয়া ব্যক্তি ধূমপান না করেও ধূমপায়ী ব্যক্তির সমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় প্রায় ৭ হাজারের মতো ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। যার মধ্যে কমপক্ষে ৭০টি উপাদান রয়েছে যা ক্যানসার সৃষ্টির কারণ। সম্প্রতি একটি দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করছে। পরোক্ষ ধূমপানে কমবেশি সকলেই আক্রান্ত হলে ও এর প্রভাব বেশি পড়ছে সমাজের নারী, শিশু ও প্রবীণদের ওপর। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীরা রয়েছেন মারাত্মক ঝুঁকিতে। গর্ভবতী অবস্থায় পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার হওয়া নারী বা শিশুর অবাঞ্ছিত মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। এ ছাড়া অকালে শিশুর জন্ম হওয়া, জন্মের সময় নবজাতকের ওজন কম হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। কোনো শিশু যদি জন্মের পরে পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার হয় তাহলে জন্মের এক বছরের মধ্যে সুস্থ শিশুর মৃত্যু হতে পারে। একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার হয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ শিশু নিউমোনিয়া ও অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে।
দেশকে ধূমপানমুক্ত করা সহজসাধ্য না হলেও পরোক্ষ ধূমপান রোধ করা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না। পরোক্ষ ধূমপান রোধ করতে হলে প্রথমেই প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৫৬তম সম্মেলনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার জন্য কনভেনশনে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ, যা ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন-২০০৫ নামে পরিচিত। ২০০৫-এর ৪ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপান করতে পারবেন না। সেই সঙ্গে আইন লঙ্ঘনকারী ব্যক্তির জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়। কিন্তু আইন প্রণয়নের দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় এর কোনো সুফল পায়নি পরোক্ষ ধূমপানের স্বীকার হওয়া ব্যক্তিরা।
অনেকেই বলছেন, ধূমপায়ীরা নিজেদের পাশাপাশি যে অন্যদেরও ক্ষতি করছে তা উপলব্ধি না করা পর্যন্ত এই সমস্যা সমাধান প্রায় অসম্ভব। তবে আমার মনে হয়, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করলে আমরা অচিরেই এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে পারব। সকলের উদ্দেশে বলতে চাই, আসুন নিজে পরোক্ষ ধূমপানের কুফল সম্পর্কে সচেতন হই এবং অন্যকেও সচেতন করি। ‘শুধু পরোক্ষ ধূমপান নয়, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে ধূমপান ও মাদকমুক্ত একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার।’ ধূমপানে বিষপান-কথাটি মনে রেখেই আমাদের সবাইকে ধূমপান ও মাদক পরিহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে। ঠেকাতে হবে জনস্বাস্থ্যের ওপর অভিঘাত।