× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিজয়ের মাস

অক্ষয় স্মৃতি, মর্মন্তুদ অনুভূতি

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৩১ পিএম

আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৪ ১২:৩১ পিএম

অক্ষয় স্মৃতি, মর্মন্তুদ অনুভূতি

১৬ ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। এদিনে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তি ও মিত্র যৌথ বাহিনীর কাছে পরাজয় বরণ করে আত্মসমর্পণ করেছিল। পাকিস্তানি রাষ্ট্র ভেঙে আমরা পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। বিজয়ের এই দিনের স্মৃতি আমার জীবনস্মৃতির সর্বোত্তম স্মৃতিরূপে আজও জাজ্বল্যমান। মনে পড়ে এ দিনটির কথা। আমি তখন ঢাকার পুরানা পল্টন লেনে দাদার বাড়িতে। দাদার বাড়ির লাগোয়া হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি। যেটি অঞ্জলিদের বাড়ি নামে কথিত ছিল। প্রাণ রক্ষায় তারা পুরো পরিবার দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে গিয়েছিল। ফাঁকা সে বাড়িতে দখলদাররূপে জনৈক পাকিস্তানি দরিয়া খান জেঁকে বসে। দরিয়া খানের দখলদারিতে নয় মাস ছিল বাড়িটি। ১৬ ডিসেম্বর দুপুর ১২টায় দুজন অবাঙালি সাইকেলে চেপে ছুটে আসে দরিয়া খানের কাছে। তাদের চোখেমুখে শঙ্কা-ভয়ের আতঙ্ক। দরিয়া খানকে ডেকে অল্প সময়ে কিছু কথা চুপিচুপি বলে দ্রুত কেটে পড়ে। দরিয়া খানও কালবিলম্ব না করে তার লুণ্ঠিত মোটরসাইকেল ও মালামাল ফেলে অঞ্জলিদের বাড়ি ত্যাগ করে। দুই বাড়ির সীমানার বেড়ার ফাঁক দিয়ে আমরা তাদের দেখছিলাম।

সময় গড়িয়ে দুপুরের পরপর চারদিকে রটে যায় নিয়াজি আত্মসমর্পণ করছেন। অর্থাৎ জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণ মানেই আমরা স্বাধীন। স্বাধীনতার সীমাহীন উত্তেজনায় আর বাড়িতে থাকা সম্ভব হয়নি। শীতের সেই অপরাহ্ণের আগেই বেরিয়ে পড়ি। বিজয়নগরের রাস্তা ধরে গুলিস্তান অভিমুখে যাওয়ার সময় দেখি উৎফুল্ল প্রচুর মানুষ রাস্তায় উল্লাস প্রকাশ করছে। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা গুলিতে মৃত বেশ কজনের লাশ ঘিরে মানুষ জটলা করে আছে। হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে যাওয়ার সময় উৎফুল্ল নিরস্ত্র মানুষের ওপর নির্বিচার গুলি ছোড়ে। বিজয়নগর থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত বেশ কিছু লাশ পড়ে থাকতে দেখেছি, যারা হানাদারদের সর্বশেষ শিকারে পরিণত হন। বিজয়োল্লাসে রাস্তায় বের হওয়া এসব মানুষের ওপর চলন্ত গাড়ি থেকে নির্বিচার গুলি করে আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। বিজয় মুহূর্তে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া মানুষের লাশ আমাকে বিষণ্ন করে তোলে। মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর সাঁজোয়া যান দেখে মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে ছুটে গিয়ে আলিঙ্গন-করমর্দন করে মিত্রবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে। আমিও জনতার সঙ্গে ছুটে গিয়ে হাত মেলাই-গলাগলি করি। তাদের অভিনন্দন জানাই।

গুলিস্তান থেকে সোজা পুব দিকে সাবেক গভর্নর হাউসের (বর্তমান বঙ্গভবন) পাশ ধরে টিকাটুলী হয়ে কখন যে সায়েদাবাদ চলে এসেছি টের পাইনি। ওই পথ দিয়েই মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ির বহর ঢাকায় ঢুকছিল। সম্বিৎ ফিরে এলে উৎফুল্ল জনতার অভিনন্দনে একটি মিত্রবাহিনীর সামরিক ট্রাক থামে। আমি চটজলদি সেই ট্রাকে উঠে পড়ি। আমাকে মিত্রবাহিনীর সদস্যরা বাধা না দিয়ে সঙ্গী করে। বর্তমান মৎস্য ভবনের কাছে এসে ট্রাক থামলে নেমে পড়ি এবং দ্রুত রেসকোর্সের দিকে এগিয়ে যাই। অজস্র মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাদের আত্মসমর্পণ প্রত্যক্ষ করছিল। তবে আমাদের কাউকে রেসকোর্সের ভেতরে ঢুকতে না দিয়ে মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর সদস্যরা বেষ্টনী দিয়ে রেখেছিল। আত্মসমর্পণের দৃশ্য দূর থেকে দেখে ফিরে আসি পুরানা পল্টন লেনের দাদার বাড়ি। আমার দেখা ঘটনাসমূহ অন্যদের কাছে সবিস্তার জানাই। শোনার সময় কেউ কিছু না বললেও শোনার পর আমার প্রাণ সংহারের আশঙ্কায় তিরস্কার শুনতে হয়েছিল। স্বাধীনতা প্রাপ্তির উত্তেজনায় সে তিরস্কার আমাকে সেদিন বিন্দুমাত্র স্পর্শ করেনি।

পরদিন সকালে রায়েরবাজারে অগণিত লাশের স্তূপের সংবাদ পাই। তখন ঘণ্টায় সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত। তেমন একটি দোকান ছিল পুরানা পল্টন লেনে। আমাকে চেনে বলে সহজেই ভাড়ায় সাইকেল নিয়ে কাউকে না জানিয়ে সেই সাইকেলে চেপে রায়েরবাজারের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী ইটভাটাসংলগ্ন স্থানে গিয়ে দেখি অগণিত মানুষ, যারা স্বজনের খোঁজে লাশের পচা দুর্গন্ধ উপেক্ষা করে স্বজন শনাক্তে লাশের স্তূপ হাতাচ্ছে। ইটভাটায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইটের স্তূপের পাশে অগণিত পচা-গলা লাশ। বিকৃত চেহারার কারণে চেনারও উপায় নেই। আলবদর, রাজাকার বাহিনীর সদস্যরা বাড়ি থেকে ধরে এনে দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবী-সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে নৃশংস নির্যাতনে হত্যা করে, তাদেরই লাশের স্তূপ। স্বজনদের আহাজারি-ক্রন্দন, গলিত লাশের স্তূপ, লাশ খোঁজার সেই দৃশ্য আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। অনেকে দুর্গন্ধে নাকে মুখে কাপড় জড়িয়ে লাশ টেনে টেনে স্বজন খুঁজছেন। অনেকের নাকে-মুখে কাপড়ও নেই। বেহুঁশের মতো তারা চিৎকার করে কাঁদছে আর স্বজনদের খুঁজে চলেছে। মর্মান্তিক সেই দৃশ্য দীর্ঘক্ষণ দেখা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একসময় সাইকেল নিয়ে একরকম পালিয়ে সেই নৃশংস অমানবিক স্থান ত্যাগ করি। সেই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে তিন দিন কিছু খেতে পারিনি। রাতে ঘুম থেকে হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠেছি। সেই নৃশংস স্মৃতি আমাকে সহজে ছাড়েনি। অনেক দিন তাড়িয়েছে। স্বাধীনতা-বিজয় প্রাপ্তির আনন্দ এ বর্বরোচিত নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতায় বিষাদে পরিণত হয়েছিল। সে ভয়ংকর স্মৃতি আজও আবেগে আপ্লুত করেছে। আজও চোখ বুজে সেই নৃশংস স্মৃতি অনুভব করি।

পরদিন সন্ধ্যার পর খবর পাই ঢাকার ডিআইটি ভবনের টিভি স্টুডিও থেকে টিভি সম্প্রচারের সংবাদ। দ্রুত টিভির সামনে বসে যাই। স্বাধীন দেশের টিভিতে প্রথম যাকে দেখি তিনি ২ নম্বর সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর হায়দার [যিনি চট্টগ্রাম থেকে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ঢাকায় এসে ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫-এ হত্যার শিকার হন]। মেজর হায়দারের মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পারে আনুষ্ঠানিক বিজয়ের সংবাদ। মুক্তিযোদ্ধারা কাঁধে অস্ত্র ঝুলিয়ে সমবেত সংগীত পরিবেশন করেন। ওইদিন ক্র্যাক প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধারা টিভিতে অনুষ্ঠান ঘোষণারও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যাদের মধ্যে ফতেহ আলী চৌধুরী, প্রয়াত মনিরুল মনু, হাবিবুল আলম, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু প্রমুখ রয়েছেন। বিজয়ের আনন্দে সে রাতে আর ঘুম আসেনি।

অধিক ত্যাগ-আত্মদানে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থে আমাদের স্বাধীন করেনি। দেয়নি মুক্তিও। কতিপয় যেমন অবাধ স্বাধীনতা পেয়েছে, তেমন পেয়েছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা-সম্পদ লুণ্ঠনের একচেটিয়া অধিকারের স্বাধীনতা। সমষ্টিগত মানুষ তাই অধিকার ও সুযোগবঞ্চিত। একমাত্র ভৌগোলিক স্বাধীনতাই আমাদের সামনে দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা স্বাধীনতার সুফলভোগী হতে পারিনি। সংবিধান জনগণকে রাষ্ট্রের মালিকানার অধিকার দিলেও বাস্তবে রাষ্ট্রের মালিকানা শাসকশ্রেণির করতলে। জনগণ সেখানে প্রজা ভিন্ন অন্য কিছু নয়। স্বাধীন দেশে সাবেকি রাষ্ট্রব্যবস্থা এখনও বিদ্যমান। রাষ্ট্রব্যবস্থার সামান্য বদল হয়নি। হয়েছে কেবল ক্ষমতার হাতবদল। রাষ্ট্রব্যবস্থা যেমন ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং পাকিস্তানি আমলে, বর্তমানেও তারই ধারাবাহিকতা। জনগণের ক্ষমতা অর্জিত হয়নি। রাষ্ট্রের চরিত্র বদল হয়নি বলেই রাষ্ট্র জনগণের প্রতিপক্ষ। এযাবৎকালে আমাদের দেশ পরিচালনায় সামরিক-বেসামরিক প্রতিটি রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সরকার পাকিস্তানি স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সংস্কৃতির বৃত্ত অতিক্রম করতে পারেনি। একটি সরকারও গণতান্ত্রিক সরকাররূপে নিজেদের প্রমাণ দিতে পারেনি। যে দ্বিজাতিতত্ত্ব পরিত্যাগ করে আমাদের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-আত্মত্যাগের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অর্জিত স্বাধীনতা; সেই দ্বিজাতিতত্ত্বের ভূত আবার ফিরে এসেছে। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বিদায় দেওয়া হয়েছে ভোটের রাজনীতির আশায়। 

সমাজতন্ত্রকে উদ্দেশ্যমূলক পরিহার করে পুঁজিবাদ বরণ করে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশ। অথচ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও বলতে হচ্ছে, অর্থনৈতিক বৈষম্যের অবসান ঘটেনি। বরং অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। একদিকে জনসমষ্টির আশি ভাগ দরিদ্র; অবশিষ্ট বিশ ভাগের মধ্যে দশ ভাগ মধ্য ও নিম্নবিত্ত। আট ভাগ দোদুল্যমান। দুই ভাগ ধনিক শ্রেণি। যাদের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ও সম্পদ। এরাই আমাদের শাসকশ্রেণি। এদের নিয়ন্ত্রণাধীনে দেশ। জনসমষ্টির আশি ভাগ আর বিশ ভাগের শ্রেণিবৈষম্যের নিরসন না হলে প্রকৃত স্বাধীনতা অধরাই রয়ে যাবে। সমাজের এই শ্রেণিবৈষম্যের স্থায়ী সমাধানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন অর্থাৎ সমাজ বিপ্লব কেবল অপরিহার্য নয়, অনিবার্যও বটে। বিদ্যমান শ্রেণিবিভাজনের পরিসমাপ্তি ঘটানো সম্ভব একমাত্র সমাজ পরিবর্তনে। আমাদের কাঙ্খিত রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হোক সবার প্রচেষ্টায়। সাম্যের আলো ছড়াক। বৈষম্যের ছায়া সরুক।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা