× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম-সমাজমাধ্যমের বার্তা সম্প্রীতির নয়

এম হুমায়ূন কবির

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৮:৫২ এএম

এম হুমায়ূন কবির

এম হুমায়ূন কবির

জুলাই-আগস্টে যে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা ভিন্ন এক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছি তার প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা জরুরি। বিশেষত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গণহত্যা সামাজিক মনস্তত্ত্বে ভিন্ন এক প্রভাব ফেলে। এমন বাস্তবতা আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সমাজে ভূরাজনীতি নিয়েও প্রবলভাবে সচেতন হয়ে ওঠার প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত এ দুই দেশের জনগণের মধ্যে এক ধরনের বিদ্বেষমূলক ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে ভিন্ন এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের অজানা থাকার কথা নয়। তাদের সরকার এমনকি প্রশাসনিক মহলও এ বাস্তবতা মেনে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়।

আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের তোপে দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। কিন্তু এরপর আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরের গতিবিধি যে ভারত সরকার বুঝতে অপারগ, তা স্পষ্ট। বিশেষত আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করার বিষয়টি কারো নজর এড়ায় না। পরবর্তীতে তাদের প্রচারিত বিভ্রান্তিমূলক তথ্যগুলোর সুলুকসন্ধান করে মিথ্যা প্রমাণও হয়েছে। তারপরও তারা যেভাবে তথ্য প্রচার করেছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এ ধরনের উপস্থাপনা বৈশ্বিক পর্যায়ে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে আমরা দায়ী নই, বরং তাদের তরফে যে প্রচ্ছন্নভাবে চেষ্টা চালানো হয়েছে; তাই আজ আমাদের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে।

আমরা দেখেছি, ৫ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে কার্যত রাজনৈতিক শক্তির হাতে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ ছিল না। সরকারের পতনের ফলে গোটা দেশে যে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয় সেখানে জনরোষই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল। তখন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উৎসারিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এ জনরোষ সমাজে বিদ্যমান থাকে এবং জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। মব জাস্টিস রাতারাতি সারা দেশে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রসঙ্গত, সারা দেশে যেকোনো সম্প্রদায় বা শ্রেণির মানুষেরই নিরাপত্তা কম অনুভূত হয়। এখনও সার্বিকভাবে সমাজে জননিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রত্যাশিত সক্ষমতা ফিরে পায়নি। এজন্যই সমাজে বিশৃঙ্খল ঘটনার মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ঘটা কিছু সহিংসতার খবরও এসেছে। বিষয়টি দায়িত্বশীল মহলের পর্যাপ্ত মনোযোগও আকর্ষণ করেছে। এ ক্ষেত্রে ভারত যে  ভুলটি করেছে তাহলো তারা কোনোভাবেই পরিবর্তিত বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীল বাস্তবতা অনুধাবন করতে পারেনি। এ পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করেছে। পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দেশ নতুন বাস্তবতার সংহত কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে; এ বিষয়টি তাদের উপলব্ধি করা জরুরি ছিল। এ ক্ষেত্রে ভারতীয় মহল যে এক ধরনের বিভ্রান্তিতে পড়েছিল এবং এখনও বিভ্রান্ত তা আর নতুন করে বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

আমরা দেখছি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোকে মুখ্য বানিয়ে ভারতে একটি ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা চলছে কয়েক মাস ধরেই। বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন না করেই নিজস্ব একটি ন্যারেটিভের ভিত্তিতে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে গোটা ব্যবস্থাকে। অনেকটা মাৎস্যন্যায়ের মতো পরিস্থিতিই তাদের সব মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায়। তাদের এ প্রচার গোটা বিশ্বের কাছে বেশ দ্রুত পৌঁছাচ্ছে এবং তাতে ক্ষতি হচ্ছে আমাদের। ভারত সরকারের তরফে বরাবরই সুস্থির সম্পর্ক রাখার কূটনৈতিক বয়ান রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এবং সমাজমাধ্যমের বরাতে দেশটির মানুষের নেতিবাচক মনোভাবনা যেভাবে আমাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে তা কোনোভাবেই সম্প্রীতির নয়। অর্থাৎ ভারতের জনমনেও বাংলাদেশের প্রতি এক ধরনের বিদ্বেষমূলক ভাবনা বিরাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছে ভারত; যার সঙ্গে আমাদের সংশ্লিষ্টটা কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সম্প্রতি আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হিন্দু উগ্রবাদী সংগঠনের হামলা থেকে অন্তত তা-ই প্রতীয়মান হচ্ছে। এ ঘটনার পর বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনগুলোর নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলার বিষয়ে ভারত এক বিবৃতিতে দুঃখপ্রকাশ করেছে।

ভারতে বাংলাদেশ ঘিরে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তার বদৌলতে এখানেও এক ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে। সেখানে ভারতীয় হাইকমিশনার একটি বিষয়ে বলেছেন, যা উল্লেখ করার মতো। তিনি বলেছেন, ‘একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নড়বড়ে হওয়ার আশঙ্কা নেই।’ অন্যদিকে সারা দেশে ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে মিছিল ও প্রতিবাদ হয়েছে। ভারতের কূটনৈতিক মহল বরাবরই জানাচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটে এমন কোনো সম্ভাবনাকে ঠাঁই দেওয়ার বিষয়েও ভারতের আপত্তি রয়েছে। এ ধরনের বক্তব্য বা অবস্থানকে ইতিবাচকভাবেই দেখা জরুরি। সামাজিক উগ্রবাদ দমন করা জরুরি, এ বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। কিন্তু কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্পর্ক সাবলীল থাকা আবশ্যক। দুটি পৃথক রাষ্ট্রের সরকারের মতাদর্শিক পার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু ভারত কিংবা দেশটির জনগণের তরফে যদি আমাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে তাহলে ভারতকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের নিজস্ব জাতীয়বাদের উত্তাপ আমাদের ওপর যেন না পড়ে তা নিশ্চিত করতে হবে।

সম্প্রতি আগরতলাতেও দেখা গেলো ভারতের অনেকে সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করেছে। আসন্ন সময়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় যদি এভাবে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি জটিলতা সৃষ্টি করবে। যেকোনো সময় একটি দুর্ঘটনা ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় জটিলতা হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। এমনটি কাম্য নয় এবং দুই দেশের কূটনৈতিক মহলই তা এড়ানোর চেষ্টা করবে-এটাই প্রত্যাশা। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বিদ্যমান অস্বস্তি দূর করার স্বার্থে সামাজিক পর্যায়ের রোষ দমানোর বিষয়ে উপলব্ধিতে পৌঁছানো সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তরফে অফিস কনসালটেশনের তাগাদা দেওয়া হলেও ভারত এখনও সাড়া দেয়নি। কিন্তু বিদ্যমান অস্থিরতায় এ উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর করা জরুরি। দুই দেশের সচিব পর্যায়ে আলোচনা হলে সামাজিক অস্থিরতা এবং সরকারি পর্যায়ে একটি অবস্থান রাখা সহজ হবে। অর্থাৎ আলোচনার মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রতান্ত্রিক অবস্থানই পারে দুই দেশের মধ্যকার রোষ দূর করে কিছুটা হলেও সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনতে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের আভাস পাওয়া গেলে তা ইতিবাচক হবে। এমনকি ওই আলোচনা যদি ডিসেম্বরের মধ্যেই সম্পন্ন করা যায় তাহলে বাড়তি সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত ভারতীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ কিছুটা হলেও প্রশমনের সুযোগ হবে। তা ছাড়া ওই আলোচনায় দুই পক্ষই যদি মৌলিক কিছু বিষয়ে একমত হতে পারে তাহলে দুই দেশের মধ্যকার শীতল সম্পর্ক আস্তে আস্তে উষ্ণ হতে শুরু করবে। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে ভারতের ওপর দায় চাপানোও ঠিক হবে না। আমরা যদি ভালোভাবে লক্ষ করি, দুই পক্ষেই রোষের আদানপ্রদান ঘটছে। যেহেতু ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং ঐতিহাসিকভাবে মিত্ররাষ্ট্র, তাই দুই দেশের পারস্পরিক সমঝোতা এবং তাদের অবস্থা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী হিসেবে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ভিন্নতার বাস্তবতা মেনে নিতে হবেই। আমরা হয়তো একমত হতে পারব না অনেক জায়গায়। কিন্তু এই যে বোঝার জায়গা তৈরি করা, এটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতময় সম্পর্ক রাখলে ভূরাজনৈতিকভাবেও পিছিয়ে পড়া হয় এবং বিশ্বের বাস্তবতায় এমনটি কোনো রাষ্ট্রের জন্যই কাম্য নয়। এর প্রভাবে শুধু ওই রাষ্ট্রই নয়, রাষ্ট্রের জনগণের জীবনেও ভোগান্তি আসে। এ বাস্তবতা বাংলাদেশ-ভারত দুই পক্ষের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

ভারত যদি তাদের দেশে কোনো পরিবর্তন ঘটায় তবে তা তাদের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা বলে মেনে নিতে হবে। আমাদের ক্ষেত্রেও ভারতকে এমন সহনশীলতা দেখাতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট উদারতাই দেখাচ্ছে এবং ভারতের তরফেও শিগগিরই আমরা আলোচনার আমন্ত্রণ পাবো, এমনটিই প্রত্যাশিত। ইতোমধ্যে এর ইঙ্গিতও মিলেছে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ফোনালাপ করেছিলেন। অর্থাৎ ভারত আমাদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হোক এমনটি চায় না। কিন্তু তারা যে আমাদের পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতা এখনও ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারেনি; এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে না পারলে সমস্যার আশু সমাধান হবে না।

  • যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত। সভাপতি, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা