× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

পেশাজীবীদের রাজনৈতিক বিভক্তির প্রতিবিধান

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪ ১০:২৮ এএম

এম আর খায়রুল উমাম

এম আর খায়রুল উমাম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করেছে। দেশের ছাত্ররা জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে নানা ঐতিহাসিক মুহূর্তে জীবনের মায়া ত্যাগ করে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছেÑযা সাধারণ মানুষ অস্বীকার করতে পারবে না। সাম্প্রতিক স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনেও ছাত্ররা একটা সফল ভূমিকা রেখেছে। দেশে কথা বলার সুযোগ ছিল না, ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। দেশে ছিল রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, রাজার অংশীজন থাকার প্রাণান্ত প্রচেষ্টা, উন্নয়ন ও অগ্রগতির নামে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, ঘুষ বাণিজ্যের রমরমা প্রতিযোগিতা, আকাশছোঁয়া আয় বৈষম্য, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেট ব্যবসা প্রভৃতি। সে অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে প্রথম এগিয়ে এসেছে ছাত্ররা, পরে তাতে যোগ দিয়েছে সব শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষ। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, সাধারণ মানুষ ৫ আগস্টের পর থেকে আজ পর্যন্ত মুক্তির আশায় থাকলেও আশার আলো দেখতে পাচ্ছে না এখনও। সাধারণ মানুষের এ অপেক্ষার পালা শেষ কবে হবেÑতা কেউ বলতে পারে না। কারণ আগের মতোই আশু সমাধানের ধারাবাহিকতায় সারা দেশ সরগরম হয়ে আছে। 

সরকারি প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে গত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ হত্যা, নির্যাতন, গণরুমকেন্দ্র্রিক নিপীড়ন, ছাত্রাবাসে সিট বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়নসহ নানাবিধ জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। এ সম্পর্কিত প্রামাণ্য তথ্য দেশের সব প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।’ মজার বিষয় হচ্ছে, সাধারণ মানুষ সামান্য অতীতের স্মৃতিরোমন্থন করলেই দেখতে পাবে দেশে সেই ষাটের দশকের এনএসএফ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বিশেষায়িতরূপে সরকারি দলের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্র সংগঠনগুলো ডিক্রির কম বেশি আনুপাতিক হারে একই কাজ করে এসেছে। সরকারি দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবেই ছাত্র সংগঠনগুলো নিজেদের ব্যবহৃত হতে দিয়েছে। তাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে আশু সমস্যার সমাধান হয়তো হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই এটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। 

সাধারণ বিবেচনায় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দোষ একটাই, সেটা হচ্ছে ১৫ বছরের মতো দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের মসনদ দখল করে রাখা এবং সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন হিসেবে এ দখলদারিত্বের ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে নিজেদের অবস্থানকে ধরে রাখা। ছলে-বলে-কৌশলে আওয়ামী লীগ স্বৈরাচার হয়ে গিয়েছে এবং ফলে অংশীজনরাও দানব হয়ে পড়েছে। প্রতিটি সরকারের সময়ই তাদের ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মকাণ্ড গণমাধ্যমের পাতায় পাতায় বর্ণিত আছে। যে কেউ দায়িত্ব নিয়ে একটা সমীক্ষা পরিচালনা করলেই সমসাময়িক সরকারি ছাত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের ছবি উঠে আসবে। অন্তর্বর্তী সরকার অনেক কিছু সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর ধারাবাহিকতায় ছাত্ররাজনীতি সংস্কারের জন্যও তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে শুধু ছাত্ররাজনীতি সংস্কার করে কোনো লাভ হবে না। সরকার যদি দেশের সকল ক্ষেত্রের কর্মকাণ্ডকে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত করতে চায়, তবে সেসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে নিয়োজিত পেশাজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তির যে ধারা সে ধারাকে সংস্কার করতে হবে সর্বাগ্রে। দেশের আমলা, শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শ্রমিক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে কামার-কুমোর-তাঁতি এমন কোনো পেশাজীবী নেই যারা রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে যায়নি। তাই শুধু ছাত্রদের ওপর বিভক্তির দায় চাপিয়ে কোনো লাভ নেই। দায়মুক্তি যদি পেতেই হয়, তবে সব পেশার মানুষকে দলীয় রাজনীতির বাইরে আনতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকার অনেকের দাবির মুখে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশে খুব ভালো একটা উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই জানে যে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পূর্ববর্তী সরকার ইতঃপূর্বে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু ছাত্রলীগ বহুবিধ নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড করার পরও তাদের ওপর এ আইন প্রয়োগ করেনি। জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করতে একদা বহুদল ও ব্যক্তি দাবি করলেও আজ তাদের অনেকেই যে মিত্র হয়ে জামায়াত-শিবিরের পাশে আছেÑ তা সাধারণ মানুষ দেখছে। তারা বিশ্বাস করে যে, আওয়ামী সময়েই এ বর্ণচোরাদের নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন ছিল। 

নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে জামায়াত-শিবিরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তাই মনে করা যেতেই পারে যে, কোনো দল বা সংগঠনকে আজীবন নিষিদ্ধ করে রাখা যাবে না। যার যখন যাকে প্রয়োজন মনে হবে তাদের নিষিদ্ধ করবে এবং আবার প্রয়োজনে তাদের মাঠে নামার সুযোগও করে দেবে। দেশ ও জাতি এহেন কালচার থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মেতে উঠলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সাধারণ মানুষ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এমন খেলা দেখার পূর্বপ্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে পারে। তবে একটা বিষয় উল্লেখ করে রাখতে চাই, জামায়াত-শিবির যেখানে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি সেখানে ছাত্রলীগ পক্ষের শক্তি। তাই সাধারণ মানুষ দ্বিধায় পড়ে যাবে কিনা সে বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন? যদিও বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ায় কেউই সাধারণ মানুষের মুক্তির বিষয়টা মাথার মধ্যে রাখেনি। ভবিষ্যতেও রাখবে কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ জাগে। 

বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যবেক্ষণে বলা যায়, স্বাধীনতা থেকে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান সকল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেই ছাত্রসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ’৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ’৫৪-এর নির্বাচন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণআন্দোলন, ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম, ’৯১-এর আন্দোলন, ’২০২৪-এর সরকার পতন ইত্যাদি এমন অনেক আন্দোলন-সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের একটা সম্মিলিত রূপ সাধারণ মানুষ দেখেছে। দেশের শিক্ষার্থীদের সেই সম্মিলিত রূপই সবসময় দেখতে চায় দেশের মানুষ। শিক্ষার্থীদের রাজনীতির বাইরে রাখা কোনো দায়িত্বশীল মানুষের কাম্য নয়। আগামীর জন্য, দেশ ও জাতির জন্য রাজনীতি শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় রাজনীতি সম্পৃক্ত মানুষ প্রয়োজন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাÑ সেই রাজনীতির মানুষ যেন বিদ্বেষপূর্ণ না হয়, রাজনীতির আদর্শবান মানুষ হিসেবে দেশ ও জাতির সামনে দাঁড়াতে পারে। মানুষের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শন অবশ্যই থাকবে, কিন্তু তা যদি পেশার মধ্যে চলে আসে সেটা যে দেশের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে নাÑস্বাধীনতার ৫০ বছরে সাধারণ মানুষ তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছে। তাই অবিলম্বে শিক্ষার্থী, সরকারি চাকরিজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষক প্রভৃতি সকল পর্যায়ের পেশাজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তি বন্ধের প্রজ্ঞাপন জারি করা হোক। একজন পেশাজীবী গাছের খাবে আবার তলারটাও কুড়াবেÑ তা চলতে পারে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি বিষয়টা ভেবে দেখে, তবে আশা করা যায় অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে পারে।

  • সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা