সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০২৪ ০৯:২৬ এএম
আমাদের ভোগ্যপণ্য তালিকায় পেঁয়াজ অন্যতম একটি উপাদান। কিন্তু পেঁয়াজ নিয়ে প্রায় প্রতি বছরই সংকট দেখা দেয় এবং এ জন্য ভোক্তাকে নাকাল হতে হয়। চাহিদার নিরিখে দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়, তাতে বড় ধরনের ঘাটতি থাকে না। তারপরও যে ঘাটতি সৃষ্টি হয় তা আমদানির পর যথাযথ সংরক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে। ১ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে এক দেশ নির্ভর পেঁয়াজ আমদানির বিষয়টি উঠে এসেছে। একই সঙ্গে চাহিদা-সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটির কারণে প্রায় প্রতিবছরই যে সংকট সৃষ্টি হয়Ñতা দূর করা খুব কঠিন কিছু নয় বলেই আমরা মনে করি। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা ৩০-৩২ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু সংরক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথ না হওয়ায় ৮-১০ লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ঘাটতি দেখা দেয়।
অসাধু আমদানিকারকদের বক্তব্যÑ দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি হয়, তার
সিংহভাগই আসে ভারত থেকে। কিন্তু ভারত যখন মাঝেমধ্যে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ
করে কিংবা রপ্তানি সীমিত করে দেয়, অভ্যন্তরীণ বাজারে সংকট তখনই প্রকট হয়ে ওঠে। তখন
বিকল্প উৎস নিউজিল্যান্ড, মিসর, মিয়ানমার, পাকিস্তান, তুরস্ক ও থাইল্যান্ড থেকে পেঁয়াজ
আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ঘাটতির নিরিখে নিতান্তই কম। আমরা জানি, গত কয়েক বছরে
আমদানিকারক কিংবা পাইকারি ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ নিয়ে দেশে অনেক ‘তুঘলকি’ কাণ্ডই ঘটিয়েছেন।
সংকটকে পুঁজি করে ভোক্তার পকেট কেটে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে তারা যে
কাণ্ড ঘটিয়েছেন তা অত্যন্ত নিন্দনীয় হলেও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা
নেওয়ার দৃষ্টান্তযোগ্য তেমন কিছুই দৃশ্যমান হয়নি।
এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছিলাম, পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ভারতের
ওপর সিংহভাগ নির্ভর না করে বিকল্প উৎস থেকে পেঁয়াজ আমদানির পরিমাণ বাড়ানো জরুরি। প্রতিদিনের
বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে নিউজিল্যান্ড থেকে আমদানি
করা প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায় আর ভারত থেকে আমদানি করা প্রতি কেজি পেঁয়াজ
বিক্রি হচ্ছে ৮০-৮৫ টাকায়। আমাদের বোধগম্য নয়, নিউজিল্যান্ডসহ অন্য কয়েকটি দেশে ভারতের
তুলনায় পেঁয়াজের দাম কম হলেও সেসব উৎস থেকে ঘাটতির নিরিখে কেন পেঁয়াজ আমদানি করা হচ্ছে
না। ভারত আমাদের প্রতিবেশী বিধায় কম সময়ে সেখান থেকে পেঁয়াজ আমদানির সুযোগ থাকলেও বিশ্ববাজারের
তুলনায় পেঁয়াজের দাম সেখানে বেশি হওয়ার পরও একটি মাত্র উৎসের দিকেই আমদানিকারকদের নজর
নিবদ্ধ কেন?
পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে আরও বিকল্প উৎস খোঁজার অবকাশ রয়েছে বলে আমরা
মনে করি। অভ্যন্তরীণ বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকলেও যখন সেখান থেকে আমদানির
পরিমাণ কমিয়ে অন্য দেশ থেকে আমদানির পরিমাণ বাড়ানো হবে, তখন সংগত কারণেই ভোক্তা তার
চাহিদা পূরণের জন্য সেদিকেই হাত বাড়াবেন। নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তানসহ বিকল্প দেশগুলো
থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হলে এলসি করার পরও যেসব জটিলতার কারণে আমদানির পেঁয়াজ দেশে
আসতে বিলম্ব হয়, সেসব বিষয় চিহ্নিত করে নিরসনের উদ্যোগ নিলে সংকট দূর করা অসম্ভব নয়।
আমদানির ক্ষেত্রে একদিকে দামের ক্ষেত্রে ব্যাপক তারতম্য, অন্যদিকে এক দেশ নির্ভরতাÑ
এ দুই-ই ভোক্তার জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা দেখছি, অভ্যন্তরীণ বাজারে যে
কৃষিপণ্যটি দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আলোচনার কেন্দ্রে থাকে এর মধ্যে অন্যতম হলো পেঁয়াজ।
সাপ্লাই চেইনে কোথাও বিঘ্ন সৃষ্টি হলে দাম বৃদ্ধির সব সমীকরণই যেন হার মানে পেঁয়াজের
কাছে।
গত বছরও আমরা দেখেছি, পেঁয়াজ কিনতে টিসিবির ট্রাকের পেছনে দীর্ঘ লাইন।
সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে অনেক সচিত্র প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। টিসিবির ট্রাকের পেছনে
পেঁয়াজ কেনার জন্য দৌড়ানোর চিত্রও মানুষের মনে নাড়া দিয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
দেখা গেছেÑপেঁয়াজ দিয়ে বানানো গয়না, গান, কবিতা ও আরও কত কিছুর রম্যচিত্র। আমরা মনে
করি, আমদানিকারকসহ সরকারের নীতিনির্ধারকদের পেঁয়াজ আমদানির ব্যাপারে গভীর ভাবনার প্রয়োজন
রয়েছে। সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছে, আমদানির ক্ষেত্রে এক দেশ নির্ভরতার ফলে বিকল্প উৎস
থেকে পেঁয়াজ আমদানি হয় এক-শতাংশের মতো। আমদানিকারকদের এক দেশ নির্ভরতা থেকে সরে আসা
প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে সরকারেরও সহযোগিতা দরকার।