আইসিসির সিদ্ধান্ত
ড. বিনয় ক্যাম্পমার্ক
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:৩৫ এএম
ড. বিনয় ক্যাম্পমার্ক
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিষয়টি নিয়ে অনেক আগেই চাপ তৈরি করা হয়। অবশেষে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োয়াভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দিয়েছে আইসিসি। অবশ্য এক্ষেত্রে মোহাম্মদ দেইফের নামও রয়েছে। যদিও ইসরায়েল চলতি বছর জুলাইয়ে তাকে হত্যার দাবি করেছে, কিন্তু হামাস এ বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। ফলে এ সিদ্ধান্তটি একটু বিতর্কিত হয়েছে। চলতি বছর ২০ মে আইসিসির কৌঁসুলি নেতানিয়াহু ও তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন। মূলত হামাসের শীর্ষস্থানীয় তিন নেতাকে হত্যার দায়ে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করা হয়। ২১ নভেম্বর প্রাক-বিচার চেম্বারে তিনজন বিচারক ঐতিহাসিক এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ইসরায়েল যদিও বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি করেছে কিন্তু আইসিসি তা খারিজ করেছে। ইসরায়েলের দাবি এক্ষেত্রে তদন্তে গাফিলতি রয়েছে এবং এ রায় অন্যায্য। অবশ্য ২০২১ সালে তারাই তদন্তে সহযোগিতা না করার দায়ে অভিযুক্ত। পরোয়ানা জারির পর ইসরায়েলের পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ এটাকে ‘বিচারের আদলে আধুনিক ইহুদিবিদ্বেষ’ বলে বর্ণনা করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নেতানিয়াহুর অফিসও। এক বিবৃতিতে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ‘অবান্তর’ ও ‘মিথ্যা’ বলে দাবি করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনে সশস্ত্র সংঘাত বিষয়ক দিক থেকে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার প্রতিফলন ঘটেছে অবশেষে। অবশ্য এই রায়ের চেম্বারের ভেতরের কথা সম্পূর্ণ ‘গোপন’ বলা হলেও কিছু কিছু তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। কয়েকটি তথ্য অনুসারে, নেতানিয়াহু এবং গ্যালান্ট দুজনে মিলে যে ধরনের যুদ্ধাপরাধ করেছেন তা অমানবিক এবং নিষ্ঠুর বলেই বিবেচিত হয়েছে। এমনকি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার অপরাধও এই দুজন এড়াতে পারেন না। গাজার অমানবিক পরিস্থিতির জন্য এ দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ইতিহাসের যেকোনো নিষ্ঠুরতাকে ছাপিয়ে গেছে।
গাজায় সুনিপুণভাবে জাতিগত নিধন চালানো হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা প্রতিনিয়ত যে দৃশ্য দেখতে পাই তা বাস্তবিকই অস্বাভাবিক। নেতানিয়াহু প্রথম কোনো পশ্চিমা ধাঁচের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নেতা হলেন, যার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। একই সঙ্গে তার সরকারের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট ও হামাস নেতা মোহাম্মদ দাইফের বিরুদ্ধেও পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। আইসিসির তিন সদস্যের বিচারক প্যানেল বলেন, তাদের কাছে বিশ্বাস করার মতো কারণ আছে, নেতানিয়াহু ও গ্যালান্ট গাজায় অনাহারকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধ করেছেন। সেই সঙ্গে হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন। প্যানেল আরও বলেন, গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যে পরিণত করা হয়েছে। হামাস নেতা দাইফের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন ও জিম্মি করার অভিযোগ আনা হয়।
এর আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে এ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আইসিসি। গ্রেপ্তারের গুঞ্জনের মধ্যে গত বছর পুতিন মিত্র দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকে বিরত থাকেন। দ্য গার্ডিয়ান অনলাইন জানায়, নিয়ম অনুযায়ী, আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে সংস্থাটির অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের ১২৪ দেশে পা রাখা মাত্রই ওই ব্যক্তি গ্রেপ্তার হবেন। এর অর্থ হচ্ছে, নেতানিয়াহু অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোতে যেতে পারবেন না। তবে ইসরায়েল ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সদস্য দেশ নয়। আরব দেশগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিন ছাড়া কেবল জর্ডান ও তিউনিসিয়ার সদস্যপদ রয়েছে। জার্মানিসহ ইউরোপের সব দেশ আইসিসির সদস্য। এশিয়ার জাপানও আইসিসির সদস্য। এ ছাড়া আফ্রিকার অন্তত ৩৩টি দেশে যেতে পারবেন না নেতানিয়াহু।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাস। তারা এটাকে ‘বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছে। আইসিসির এ আদেশ বিষয়ে গাজার সাধারণ মানুষ দ্বিধা প্রকাশ করে বলেছে। তারা মনে করে, এমন আদেশের তেমন কোনো ফল আসবে না। এ আদেশকে চ্যালেঞ্জ করবে যুক্তরাষ্ট্র। অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনের কর্তৃপক্ষ বলছে, আইসিসির এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আশা ও বিশ্বাস জাগিয়েছে। বেলজিয়াম বলেছে, অপরাধের সঙ্গে যারাই জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, সবার উচিত আন্তর্জাতিক আইন মান্য করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল বলেছেন, এটা কোনো রাজনৈতিক পরোয়ানা নয়। তাই সবার উচিত এর প্রতি সম্মান দেখানো ও মান্য করা। সমর্থন জানিয়েছে ফ্রান্সও।
আইসিসির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন খোদ জো বাইডেন। তিনি এটাকে ‘আপত্তিকর’ বলে বর্ণনা করেছেন। সমালোচনা করেছে আর্জেন্টিনা। দেশটির প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার মিলেই বলেন, তার দেশ এ সিদ্ধান্তের প্রতি গভীর অমত প্রকাশ করছে। অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্দার স্টেকেলেনবার্গ এটাকে ‘হাস্যকর’ সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করেছেন। বিরোধিতা করেছে হাঙ্গেরিও। কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের বিরোধিতা কার্যকর কোনো সমাধানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে না। উলটো আন্তর্জাতিক পরিসরে নির্লজ্জ সহযোগিতাই তারা করবে এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পরও যে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ আছে এমনটি নয়। আন্তর্জাতিক আইন কোনো অদ্ভুত কারণে বৈষম্যমূলক বলেই প্রতীয়মান হয়। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের অবস্থানও অদ্ভুত। আইসিসির এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানার সফলতা মূলত যুদ্ধ বন্ধের সদিচ্ছা রাখা রাষ্ট্রগুলোর ওপরই নির্ভর করবে। তারপরও এই রায়ের কিছুটা প্রভাবও রয়েছে। নেতানিয়াহু কার্যত এখন যেনতেন চলাফেরা বা ভ্রমণ করতে পারছেন না। তার মিত্র রাষ্ট্রও যেকোনো সময় আন্তর্জাতিক পরিসরে চাপের কথা ভেবে ব্যবস্থা নিতে পারে। ইতোমধ্যে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য এমন ইঙ্গিত দিয়েছে। সাতটি পশ্চিমা রাষ্ট্র স্পষ্ট করেছে অবস্থান। ফলত নেতানিয়াহুর ওপর চাপ রয়েছে। যদিও তা তিনি অস্বীকার করার চেষ্টা করছেন। এখন দেখার বিষয় আন্তর্জাতিক আইনে এই রায় কতটা প্রভাব রাখতে পারে।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন