× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সম্প্রীতি

সাম্প্রদায়িকতার ছায়া সরাতে হবে

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ : ১৬ নভেম্বর ২০২৪ ০৮:১৪ এএম

মযহারুল ইসলাম বাবলা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

আমাদের ভূখণ্ডে প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকে বিপদগ্রস্ত এবং আক্রান্ত হয়ে এসেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা, যার সূচনা ঘটেছিল ১৯৪৭-এর দেশভাগে। এরপর ১৯৫০-এর দাঙ্গা, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ, একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আক্রান্তের শিকার হয়েছিল বাঙালি জাতি। তুলনামূলকভাবে হিন্দু সম্প্রদায়কেই লক্ষ্যবস্তু করেছিল। পাকিস্তান থেকে আগত সেনা সদস্যদের হিন্দু সম্প্রদায় পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তেমন বার্তাই তাদের দেওয়া হয়েছিল। হত্যাকারীরা তাই হিন্দুদেরই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করেছিল। তবে গণহত্যাকালে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বাছবিচার হত্যাকারীরা করেনি। আত্মরক্ষায় প্রতিবেশী ভারতে ১ কোটি শরণার্থীর বেশিরভাগই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বী। সাতচল্লিশ থেকে দেশত্যাগের ধারাবাহিকতায় তারা পরিস্থিতি আঁচ করে দ্রুত দেশত্যাগ করে প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫-এর মধ্য আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে, বাবরি মসজিদ ভাঙা নিয়ে সৃষ্ট দাঙ্গায়, ২০০১ সালে ক্ষমতার পালাবদলে এবং এবারের ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ক্ষমতা পরিবর্তনের পর একই কায়দার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর মানবতাবিরোধী হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে। হিন্দুদের হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, ছিল অতীতের মতো তাদের সম্পত্তি, অর্থকড়ি লুণ্ঠনের অভিপ্রায়। হিন্দুরা ব্রিটিশ ভারতের পূর্ব বাংলায় অর্থবিত্ত, জমি-জমিদারি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে ছিল অগ্রসর। আমাদের ভূখণ্ডের জায়গাজমির মালিকানা তাদের অধীনেই ছিল বেশি। নোয়াখালীর দাঙ্গা থামাতে মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীতে এসে হিন্দুদের অগ্রসর শ্রেণিকে প্রশ্ন করেছিলেন, এ অঞ্চলে হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে সংখ্যাধিক্য কারা? উত্তরে তারা গান্ধীকে বলেছিল, ৬৫ শতাংশ মুসলিম এবং ৩৫ শতাংশ হিন্দু। গান্ধী পুনরায় তাদের প্রশ্ন করেন, এখানকার জায়গাজমির মালিকানা কাদের কত? তারা বলেছিল, এখানকার ৭০ শতাংশ জায়গাজমির মালিক হিন্দুরা। আর ৩০ শতাংশ মুসলমানের। এটা শুনে গান্ধী বলেন, তাহলে তো সমস্যা ওই ভূসম্পত্তিতেই নিহিত। দাঙ্গাটা উপলক্ষ মাত্র। গান্ধীর এ বিশ্লেষণটি ছিল নির্ভুল। তারই ধারাবাহিকতা আজও বিদ্যমান।

আশার কথা, এবারই প্রথম সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন; যা ইতঃপূর্বে কখনও দেখা যায়নি। তারা আট দফা দাবি নিয়ে একের পর এক কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এটা তো অস্বীকার করা যাবে না, এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সমান অধিকার ও মর্যাদা আমাদের সংবিধান নিশ্চিত করেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে রাষ্ট্রের কর্তব্য সংখ্যালঘু সব সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর সুরক্ষা দেওয়া। পাশাপাশি তাদের সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক অপশক্তিসমূহকে আইনের আওতায় এনে বিচার করা। দেশে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি সব ক্ষেত্রে বিরাজমান। তাই এ ধরনের ঘৃণিত অপকীর্তির সুযোগ হাতিয়ে ধর্মীয় ও জাতিগত নিপীড়ন অব্যাহত গতিতে চলছে। সরকার ও রাষ্ট্রের কর্তব্য হবে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিশ্চিত করে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহকে দমন ও নির্মূল করা।

এবারের সনাতনীদের সমাবেশ থেকে একটি স্লোগান তারা তুলেছেন, তা আপত্তিকর। তাদের শ্লোগান ‘জয় শ্রীরাম’। ইতঃপূর্বে আমাদের দেশে এ ধরনের স্লোগান সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেয়নি। এ স্লোগান হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের। সারা ভারতে কেবল হিন্দু জাতীয়তাবাদী আরএসএস এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এ স্লোগানটি দিয়ে থাকে। এ ছাড়া ভারতের অন্য কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক এমনকি সাধারণ আম-জনতা এ স্লোগান দেয় না। আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা কেন এ স্লোগান দিচ্ছেন? অনেকে ইতোমধ্যে এ স্লোগানের জন্য সনাতনীদের আরএসএসভুক্ত বলেও প্রশ্ন তুলেছেন। অনতিবিলম্বে তাদের হিন্দুত্ববাদী এ স্লোগান পরিহার করতে হবে। ধর্ম নিয়ে রাজনীতি কখনোই কাম্য নয়। এমনটি হলে হয়তো জনমনে ধারণা জন্মাবে, তারা হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা শুরু করেছেন। আমরা চাই সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির আলো। আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই আমাদের সেই প্রত্যয়েÑ ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’। আমরা সবাই এ দেশের নাগরিক, সবার অধিকার সমান। অধিকার তো বটেই, কোনো ক্ষেত্রেই আমরা আর বৈষম্য দেখতে চাই না। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পথ সুগম হলে নিশ্চয় সাম্যের আলো ছড়াবে। তখন কাউকে অধিকারহীন ও বিপদগ্রস্ত মনে হবে না।

স্মরণ করা যায় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গানটির সুর করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কংগ্রেসের অধিবেশনে গাওয়া এ গানকে কংগ্রেসের জাতীয় সংগীত না করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কেননা গানটিতে হিন্দু ধর্মাচারের নানা উপকরণ সন্নিবেশিত রয়েছে। অহিন্দুরা এ গান যৌক্তিক কারণেই গাইবে না। প্রত্যাখ্যান করবে। কংগ্রেস তাদের স্লোগান নির্ধারণ করেছিল বন্দে মাতরম। বিপরীতে মুসলমানের স্লোগান হয়ে উঠেছিল ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবার’। এ  স্লোগান সম্প্রদায় বিভক্তির অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, যার পরিণতি ঘটেছিল রক্তাক্ত দেশভাগ। এটা তো সত্য, কংগ্রেস যদি এক জাতির আওয়াজ না তুলত তবে মুসলিম লীগ দ্বিজাতিতত্ত্ব সামনে আনতে পারত না। জিন্নাহর সেই দ্বিজাতিতত্ত্ব এখন ভারতব্যাপী বিস্তার লাভ করেছে। আমাদের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যদি জয় শ্রীরাম স্লোগান পরিত্যাগ না করেন তবে মুসলিম মৌলবাদীরা বিপরীত স্লোগান নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে যাবে। কলকাতার এক বামপন্থি দলের মহাসচিবের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, দেশভাগে পূর্ববঙ্গ থেকে প্রত্যাগতরা বামপন্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানের দশা ঠিক বিপরীত।

পূর্ববঙ্গীয় ব্যাকগ্রাউন্ডের বর্তমান প্রজন্মরা বামপন্থা ত্যাগ করে হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপির ভোটব্যাংকে পরিণত। পূর্বপুরুষের দেশত্যাগের বদলা নিতেই বোধ করি তারা সদলবলে বিজেপি, আরএসএসের কর্মী, সমর্থক ও নেতা হয়েছেন। পশ্চিম বাংলার বামফ্রন্টের বিদায়ের পর এখন তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরে বিজেপির উত্থান ঘটেছে। শূন্য অবস্থান থেকে বিজেপি দ্বিতীয় অবস্থানে। পশ্চিম বাংলা এখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চারণভূমি। গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল ২ কোটি ৮৭ লাখ ভোট আর বিজেপি ২ কোটি ২৮ লাখ ভোট। বিধানসভায় বামফ্রন্ট শূন্য। পশ্চিম বাংলার জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ হিন্দু ভোট বিজেপির দখলে। কিন্তু বিজেপির রাজ্য ক্ষমতা দখলে অন্তরায় ৩০% মুসলিম জনসংখ্যা। যারা বিজেপিকে ঠেকাতে অকাতরে তৃণমূলকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করছে।

স্বীকার করতেই হবে, স্বাধীনতার পর গত সরকারের শাসনামলে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর বাড়বাড়ন্ত অতীতের রেকর্ড ভেঙেছে। সরকারের সংশ্লিষ্টতায় এবং আশকারায় তাদের আস্ফালন ক্রমাগত বৃদ্ধিতে আমরা শঙ্কিত। আমাদের ঐতিহ্যপূর্ণ সংস্কৃতি রক্ষায় তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে রুখতে না পারলে পরিণাম ভালো হবে না।

  • নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা