সবজির দাম
ড. মো. হুমায়ুন কবির
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:১৩ এএম
ড. মো. হুমায়ুন কবির
এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে। এ দেশে এত ধরনের সবজি উৎপাদন হয় যা পৃথিবীর অনেক দেশেই হয় না। একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, কিছু বিদেশি জাত মিলে বাংলাদেশে প্রায় ১৪২ ধরনের সবজি চাষ হয়। সবচেয়ে বেশি যেসব সবজি বাংলাদেশে চাষ হয়, তার মধ্যে টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, কাঁচা মরিচ, করলা, লাউ, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, ঢেঁড়স, শসা, ক্ষীরা, মুলা, শিম, পটোল, ঝিঙা, কাঁকরোল, গাঁজর, পুঁইশাক, লালশাক, বরবটি, কাঁচা পেঁপে, কাঁচকলা, মটরশুঁটি ইত্যাদি। সঠিকভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী চাষ করতে পারলে সবজি উৎপাদন একটি লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। এর সম্ভাবনা বুঝতে পেরে বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণসমাজ সবজি উৎপাদনে এগিয়ে আসছে।
শিক্ষিত যুবসমাজ নতুন নতুন প্রযুক্তি ও ইনোভেটিভ ধ্যানধারণা নিয়ে
সবজি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু এর অগ্রগতির জন্য একটি সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনা
দরকার। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। আমরা দেখছি এখন সবজির বাজার খুব অস্থির। সবজির দাম এত
বেশি বেড়ে যাওয়ার প্রকৃত কারণ কী? আমরা জানি বাংলাদেশে
সারা বছরই কিছু না কিছু সবজি উৎপাদিত হয়। শীতকাল বিভিন্ন শাকসবজি চাষের জন্য বেশ উপযোগী।
এ সময় নানা ধরনের শাকসবজির চাষ হয়। আর এ সময়ে উৎপাদন অনেক বেশি হয়ে থাকে। কিন্তু গ্রীষ্মকালীলে
শাকসবজির চাষ করা একটু কষ্টসাধ্য। কারণ এ সময় রোদ, বৃষ্টি, খরা, শিলাবৃষ্টিসহ নানান
ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। সেজন্য একটু সতর্কতার সঙ্গে এ সময় বিভিন্ন সবজির
চাষ করতে হয়।
আমরা যদি সবজির
প্রাপ্যতা বিবেচনায় আনি তবে প্রকৃতিগতভাবে বাংলাদেশে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কম
সবজি উৎপাদিত হয় তাই এমনিতেই বাজারে সবজির স্বল্পতা থাকে এবং সবজির দাম বেশি থাকে।
তবে এ সময়ে কৃষক গ্রীষ্মকালীন বা বারোমাসি অথবা হাইব্রিড জাতের সবজি চাষ করে এ
চাহিদা মিটিয়ে থাকেন। কিছু আগাম শীতকালীন সবজিও চাষ করে থাকেন যেগুলোর বাজারমূল্য
অনেক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি এবার প্রচুর
বৃষ্টিপাত হয়েছে। বাতাসে ক্রমাগত গ্রিনহাউস গ্যাস বাড়ার ফলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং
হচ্ছে, ফলে বাতাসের আর্দ্রতা বেড়েছে এবং তীব্র বন্যা হয়েছে দেশের অধিকাংশ জেলায়। অসময়ে
বন্যার ফলে দেশের অধিকাংশ সবজি বাগান বা ক্ষেত পানিতে নষ্ট হয়েছে। যার ফলে বাজারে
সবজির জোগান কমেছে এবং সবজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ
তাদের গুরুত্বপূর্ণ মত দিয়েছেন।
অনেকের মতে সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ বন্যা। আগস্টে
বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় দেশের পূর্বাঞ্চলের সাত জেলা। এতে প্লাবিত এলাকায় ফসলি
জমি তলিয়ে থাকে সাত থেকে ২০ দিন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় শীত ও শরৎকালীন সবজি, রোপা আমন,
আউশসহ বিভিন্ন ফসল। সিলেট অঞ্চল বন্যায় আক্রান্ত হয়। ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন এলাকা বন্যায় আক্রান্ত হয়।
প্রবল বন্যায় এসব জেলার অধিকাংশ মানুষ পানিবন্দি হয়। কৃষিজমি, বসতবাড়ি পানিতে ডুবে যায় । এরই মধ্যে উত্তরবঙ্গেও বন্যা ভয়াবহ রূপ নেয়। অন্যদিকে অক্টোবরের
শুরুতেই আকস্মিক বন্যার কবলে পড়ে ময়মনসিংহ অঞ্চল। ময়মনসিংহ, শেরপুর ও নেত্রকোণার
১০ উপজেলা সপ্তাহখানেক পানিতে ডুবে থাকায় নষ্ট হয় জমির শস্য। অন্যদিকে এবার সারা
দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর ফলে সারা দেশেই কমবেশি সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সিন্ডিকেট বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি নয়, বন্যায়
ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার প্রভাবও বাজারে পড়েছে, যা বাজারে সবজির দামে ঊর্ধ্বগতির অন্যতম
কারণ।
বিশ্লেষণে
দেখতে পাই, গত দুই মাসে আমাদের দেশের কোথাও না কোথাও টানা বৃষ্টি ও বন্যা হয়েছে।
যার কারণে বিভিন্ন সবজির উৎপাদন ও বাজারে সবজির সরবরাহ কমেছে। কৃষকের জমির সবজি
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার ফলে কৃষক পর্যায়েই সবজির দাম বেড়েছে। তারাও আগের তুলনায়
বেশি দামে পণ্য বিক্রি করছেন। যার প্রভাব বাজারে পড়ছে। এ বিষয়টি কোনোভাবে খাটো করে
দেখার সুযোগ নেই। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে
জানিয়েছেন, এ বছর অসময়ে অতিবৃষ্টিতে শীতকালীন আগাম সবজির উৎপাদন ২৫ শতাংশ কমে
গেছে। তাতে বাজারে সবজির দাম বাড়তি। অন্যান্য বছর এ সময় শীতকালীন আগাম সবজিতে প্রচুর
সরবরাহ থাকত।
বাজার
সিন্ডিকেট শব্দটিও আমাদের সমাজে বহুল আলোচিত। অনেক দিন থেকেই বাংলাদেশে কৃষিপন্যের মূল্য বাজার সিন্ডিকেট নামক একটি চক্রের কাছে
জিম্মি। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাজারে সব
ধরনের সবজির দর অনেক নেমে এসেছিল। স্বস্তিদায়ক সেই পরিস্থিতি মাসখানেকের মতো ছিল।
এর পর থেকেই পুরোনো চেহারায় ফিরেছে সবজির বাজার। এ সময় বাজারে সবজির দাম একটু বাড়তি
হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এখন সবজির বাজারে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবের পাশাপাশি অন্য সময়ের মতো
বাজার সিন্ডিকেট সক্রিয় আছে। হাতেগোনা তিন-চারটি ছাড়া বেশির ভাগ সবজির দর শতক
ছাড়িয়েছে। শুধু শহর নয়, উৎপাদন এলাকায়ও চড়া দাম শাকসবজির। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের
কাছে সবজি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে সবজিকে এখন বিলাসী খাদ্যপণ্য বলছেন। এদিকে সবজির দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ
টাস্কফোর্স ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বাজার তদারকি টিম বলছে, কারওয়ান
বাজারের ট্রাক থেকে সবজি নামানোর পর ছয় থেকে সাত বার হাতবদল হয়। প্রতিবার হাতবদলে
বাড়ানো হচ্ছে দাম। এর সঙ্গে জড়িত ১ হাজার ২০০ ফড়িয়া, যাদের কোনো লাইসেন্স নেই।
তারা পণ্য কেনাবেচার কোনো রসিদ দেয় না। এ সুযোগে আড়তদারদের যোগসাজশে পাইকারি,
ব্যাপারী, খুচরা ব্যবসায়ী সবাই মিলেমিশে বাড়াচ্ছে পণ্যের দাম। ভোক্তা
অধিকারের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পথে পথে চাঁদাবাজি ও বাজার সিন্ডিকেটের কারণে ৩০%
মূল্য বাড়ে। তবে ক্ষেত্রবিশেষ আরও অনেক বেশি হতে পারে। তবে এ অবস্থা চলতে দেওয়া
যায় না। একে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক।
প্রাকৃতিক কারণে যদি কোনো পণ্যের মূল্য বাড়ে তা নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য।
তার পরও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তারা যৌক্তিক উপায়ে যেমন সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি বাড়িয়ে,
শুল্ক কমিয়ে অথবা অন্য কোনো যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ
করবেন বলে আমরা আশাবাদী হতে চাই। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের এ পর্যায়ে কেউ কৃত্রিমভাবে
পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা যে নতুন বাংলাদেশের কথা বলছি
তার সঙ্গে এ বিষয়টি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাই সরকারকে শক্ত হাতে বাজার কারসাজির সঙ্গে
সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ইতোমধ্যে সরকার কিছু উদ্যোগ গ্রহণ
করেছে বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি। মানুষকে কিছুটা
স্বস্তি দিতে সুলভ মূল্যে ১০টি কৃষিপণ্য বিক্রি করছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায়
একজন গ্রাহক ৩০ টাকায় ১ কেজি আলু, ১৩০ টাকায় ১ ডজন ডিম, ৭০ টাকায় ১ কেজি পেঁয়াজ,
২০ টাকায় ১ কেজি কাঁচা পেঁপে ও ৫ কেজি বিভিন্ন ধরনের সবুজ শাকসবজি প্যাকেজ আকারে
কিনতে পারছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসূত্র জানান, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর ২০টি
স্থানে ট্রাকে করে এসব কৃষিপণ্য বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কৃষি উৎপাদকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যা উৎপাদন করেন তার কোনোটিরই উপযুক্ত
মূল্য পাচ্ছেন না। লাভের বড় অংশ যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। আবার ভোক্তাদের উচ্চ
মূল্যে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এ সময়ে সরকারি সংগঠনগুলোর ব্যবস্থাপনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় উৎপাদিত সবজি কৃষকের
কাছ থেকে সরাসরি কিনে ঢাকা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা যায়।
সাপ্লাই চেইনে বারবার হাতবদলের সংখ্যা অর্থাৎ মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমিয়ে আনতে
হবে। শহরের কোনো স্থানে এমন বাবস্থা করতে হবে যাতে উৎপাদনকারী বা কৃষক সরাসরি ভোক্তাদের
কাছে সবজি বিক্রি করতে পারেন। বিভিন্ন সুপারশপ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সবজি
সংগ্রহ করে বাজারের চেয়ে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করার ব্যবস্থা করতে পারে। তবে
সুপারশপ ‘স্বপ্ন’ এ বিষয়ে কিছু কাজ করছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ।
এবার সবজির দাম বাড়ার পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যা প্রধানত দায়ী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে এ দুর্যোগ বাড়তে থাকবে। এ দুর্যোগে আমাদের কৃষক সমাজ তথা উৎপাদনকারীরা সরাসরি আক্রান্ত হচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। সাধারণ মানুষকেও ক্রয়সীমার বাইরে গিয়ে পণ্য কিনতে হচ্ছে। তাই কৃষিজ পণ্য উৎপাদনকারীদের স্বার্থ নিশ্চিতের লক্ষ্যে শস্যবীমা প্রবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য বাজার তদারকি ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। ভাঙতে হবে সিন্ডিকেট, নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট খাতের চাঁদাবাজি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের অবাধ বিচরণের পথ সংকুচিত করতাও বাঞ্ছনীয়। মনে রাখতে হবে, উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয় পক্ষের স্বার্থ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা টেকসই কৃষি বাজার ব্যবস্থাপনা ভাবতে পারব না।