সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৬ এএম
দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা
খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। তাদের বিকাশে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের পরও কাঙ্ক্ষিত
ঋণ পাচ্ছেন না তারা, এই বার্তা উঠে এসেছে ২০ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত
প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, অন্যান্য খাতের ঋণ বিতরণের প্রবৃদ্ধি থাকলেও এ খাতে উল্টো
কমছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে ঋণ বিতরণ কমেছে ১৩ শতাংশেরও বেশি, এ
তথ্য মিলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে। অথচ আমরা জানি, ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত ২৫ শতাংশ
কুটির শিল্প, অতিক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে। আমরা
এও জানি, ব্যাংকে আমানতের বড় একটি অংশ রয়েছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের। প্রভাবশালী বড় ব্যবসায়ীরা
নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে খেলাপি ঋণের চিত্র কতটা স্ফীত করেছেন, এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন
করে নিষ্প্রয়োজন। ২০০৭ সালে কোম্পানি আইনের অধীনে এসএমই খাতের উন্নয়নে যাবতীয় পরিকল্পনা,
অর্থায়ন, পরামর্শ সেবা ও সহায়তা, সচেতনতা বৃদ্ধি, মূল্যায়ন ও প্রতিনিধিত্বকরণের কেন্দ্রীয়
প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের
১১টি কৌশলগত লক্ষ্য রয়েছে, যা পরিকল্পনা প্রণয়ন ও ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করে। কিন্তু
আমরা দেখছি, এসবই শুধু বিধি-বিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি
শিল্পের উন্নয়নে এসএমই নীতিমালা ২০১৯-এর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ওয়ার্কিং কমিটি চূড়ান্ত
করে জাতীয় এসএমই উন্নয়ন পরিষদ। এর মূল লক্ষ্য ছিল যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা
সহজে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পান এবং ঋণ বিতরণ পদ্ধতি যাতে সহজ হয়। কিন্তু এরও প্রতিফলন
কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ঘটেনি
দেশের প্রায় ৭৮ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তা নিজেদের কর্মসংস্থানের
পাশাপাশি আরও অনেকেরই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। স্বচ্ছতা-দায়বদ্ধতা-জবাবদিহিতা নিশ্চিত
করে এ খাতের উদ্যোক্তারা কাজ করেন, এই সুখ্যাতি তাদের রয়েছে। অথচ তাদের শিল্পের প্রসারে
সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় তারা ঋণ পান না, উপরন্তু পদে
পদে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়, এই বার্তা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প
উদ্যোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনার বিষয়টিকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিযোগ ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে
নতুন নয়। আমরা মনে করি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের জামানতের সক্ষমতার বিষয়টি
বিবেচনা না করে তাদের কর্মধারা কিংবা দক্ষতা অনুযায়ী ঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোর মনোযোগী
হওয়া উচিত। আমরা জানি, শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামেই নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই ক্ষুদ্র
ও মাঝারি শিল্পের অস্তিত্ব রয়েছে। মফস্বলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশের অনুকূল
পরিবেশ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা তাদের লক্ষ্য অনুযায়ী এগোতে পারছেন না আর্থিক
সীমাবদ্ধতার কারণে। দেশের বড় বড় শিল্প উদ্যোক্তার অনেকেই যখন হাজার হাজার কোটি টাকা
ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে খেলাপি ঋণের চিত্র স্ফীত করেছেন, সেখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি
শিল্পের কর্ণধারদের ঋণ পরিশোধের ভালো নজির থাকা সত্ত্বেও তাদের উপেক্ষা করার বিষয়টি
নিশ্চয়ই প্রশ্নবোধক। আমরা মনে করি, গ্রামকে শহরে পরিণত করতে কিংবা মফস্বলের অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ডের বিকাশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া
উচিত। স্থানীয় কাঁচামাল ভিত্তিক শিল্পের বিকাশে সেখানে অবস্থিত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর
জন্য পর্যাপ্ত ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান
হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পরিশোধের
হার প্রায় শতভাগ, এই তথ্য নিকট অতীতে উঠে এসেছিল সংবাদমাধ্যমেই। এমন প্রেক্ষাপটে ব্যাংকগুলো
যদি তাদের ঋণদানের পরিসর বিস্তৃত করে, তাহলে তাদেরও লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ক্ষুদ্র
ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণদানে বাড়তি নজর দিলে এর সুফল আরও বেশি মিলবে,
এমন অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন অর্থনীতিবিদরা। তারা এও বলেছিলেন, অর্থনতিকে চাঙ্গা করতে
ও কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণ বাড়াতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকে
ছোট ও মাঝারি শিল্পের দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার আহ্বান আমরা জানাই। সম্প্রতি বাংলাদেশ
ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও বলেছেন, ‘এসএমই ঋণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে
টাকা আছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের আমরা তা দিতে পারছি না। শুধু
তাই নয়, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু
কোনো একটি সমস্যার কারণে ব্যাংকের মাধ্যমে এই ঋণগুলো বিতরণ হচ্ছে না। আমরা ব্যাংকগুলোকে
লিখিতভাবে এ সমস্যার কারণ ও সমাধানের উপায় জানাতে বলেছি। শিগগিরই ক্ষুদ্র ঋণের প্রভাবও
ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের বক্তব্য ও কর্মপরিকল্পনার
সাধুবাদ জানানোর পাশাপাশি আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, কী কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের
মধ্যে ঋণ বিতরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, এর অনুসন্ধানে কি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া
হয়েছে?
অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়
টিকে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাদের পণ্যের
বাজারজাতকরণ নিয়ে বহুমুখী সমস্যা বিদ্যমান, অন্যদিকে বাজারের পরিসরও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়
বিস্তৃত নয়। বিদ্যমান বাস্তবতায় অনেকেই উৎপাদন কমিয়ে কম মুনাফা করে কোনোরকমে ব্যবসা
টিকিয়ে রেখেছেন। অর্থায়ন এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের জন্য
স্বল্প সুদে সহজেই ঋণ প্রাপ্তির পথ এখনও সুগম হয়নি। অন্যদিকে উদ্যোক্তা ও কর্মীদের
যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে পণ্যের উৎকর্ষও বাড়ানো যাচ্ছে না। বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো
কাটিয়ে ওঠার জন্য দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থে সরকারকে বিশেষ পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়নে
মনোযোগ বাড়াতেই হবে। আমরা মনে করি, আমাদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ও সম্ভাবনা বিবেচনায়
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের রপ্তানি উপযোগী পণ্য উৎপাদনের পথ সহজ করে দিতে হবে।
বর্তমান জামানায় আইসিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল ব্যবসায় তরুণ বা নতুন উদ্যোক্তাদের
উৎসাহিত করার ব্যবস্থাও সুগম করা বাঞ্ছনীয়।
মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এসএমই খাতের অবদান ৩০ শতাংশ। আমরা মনে করি, তা আরও অনেক বাড়ানোর অবকাশ রয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশনের নিজস্ব তহবিল, বিভিন্ন ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তাদের ঋণ দানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এসএমইবান্ধব করা গেলে এর সুফল মিলবে। এসএমই প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে সামগ্রিকভাবে এই খাতটির বিকাশে সব দিকেই সমগুরুত্বের নজর গভীর করা বাঞ্ছনীয়।