মধ্যপ্রাচ্য সংকট
ড. বিনয় ক্যাম্পমার্ক
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৪৭ এএম
ড. বিনয় ক্যাম্পমার্ক
ভিয়েতনাম যুদ্ধের
সময় ভিয়েত কং নামক সংস্থাকে একাধিক দেশে নানা সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এপারথেইড
যুগে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকেও নানা সংকট পার করতে হয়েছে। আইরিশ রিপাবলিকান পার্টির
(আইআরএ) ক্ষেত্রেও ভিন্ন কিছু ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলেশিয়ায় এ তিনটি
সংগঠনকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আখ্যা দিয়ে ধ্বংস করা হয়। অথচ এ সংস্থাগুলো অনেকের সমর্থন
আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। হাল আমলে লেবাননে শিয়া আন্দোলনকারী হিজবুল্লাহদের জঙ্গি সংগঠন
বলে চিহ্নিত করেছে একাধিক পশ্চিমা রাষ্ট্র। অথচ এই হিজবুল্লাহর কারণেই গাজা ও লেবাননে
গণহত্যার বিরুদ্ধে গোটা বিশ্ব সোচ্চার হয়ে উঠতে পেরেছে।
উপরোক্ত তিনটি
সংগঠনই তাদের দেশের রাজনীতিতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ে। ফলে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে তাদের
আখ্যা দেওয়ার জটিলতাও দেখা দেয়। যুদ্ধকামী এবং সহিংসতাকামীরা এ সুযোগে বিভিন্ন অঞ্চলে
কাগুজেভাবে ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে। এভাবেই আস্তে আস্তে তারাও দখল নেয় কিন্তু সেজন্য
সময় লাগে। বিষয়টি সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কারণ লেবাননে ইসরায়েলের হামলার
পরিপ্রেক্ষিতে গোটা বিশ্বে বিভিন্ন স্থানে হিজবুল্লাহর পক্ষে অবস্থান নিয়ে অনেকে বিক্ষোভ
করছে। কিন্তু অনেক দেশেই বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিষয়টি বাকস্বাধীনতার
ওপর বড় আঘাত অবশ্যই। অস্ট্রেলিয়াতেই এমন ঘটনা ঘটেছে যেখানে সামাজিক সংহতি এখন ভেঙে
যাওয়ার পথে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই এখন বাকস্বাধীনতা প্রশাসনিক চাপে থেমে যাওয়ার
পক্ষে।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে
কাউন্টার টেররিজম লেজিসলেশন অ্যামেন্ডমেন্ট পাস হয়। এর মাধ্যমে নাৎসি স্যালুট দেওয়া
নিষিদ্ধ করা হয়। এ বিলটি যেকোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
ক্রিমিনাল কোড ১৯৯৫ অনুসারে, এ ক্ষেত্রে অভিযোগ আনার আগে বেশ কিছু প্রমাণ লাগবে। তবে
এ বিষয়ে যা নির্দেশনা রয়েছে তা স্পষ্ট নয়। একজন ব্যক্তি সজ্ঞানে যখন নিষিদ্ধ প্রতীক
ব্যবহার করছে তখন তাকে আইন যেভাবে বিচার করবে জনবিক্ষোভের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। কারণ
মানুষ এ প্রতীককে ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করছেন। বিভিন্ন বিক্ষোভে হিজবুল্লাহর পতাকা ব্যবহার
করার মানে এই নয় যে তারা সহিংসতা কিংবা ঘৃণা ছড়াতে চাচ্ছে। সংহতি জানানোর অন্যতম প্রধান
ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে এটিকে। অর্থাৎ এখন যেভাবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আন্দোলন
দমন করার চেষ্টা হচ্ছে তা আসলে অহেতুক। এর পেছনে কোনো সুষ্ঠু আইনি ভিত্তি নেই।
মানুষ সচরাচর
যা মেনে নিতে রাজি নয় তা শুনলেই আঘাত পায়। মতামতের ইতিহাসে এ অন্যের মতে আঘাতের ঘটনাই
বেশি। মনে রাখতে হবে, মতামত এলে কেউ না কেউ আঘাত পাবেনই। আবার অনেকের মত হয়তো মিলবে
না। কিন্তু অন্তত এভাবে একটি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণে পৌঁছানো সম্ভব। বাকস্বাধীনতার প্রসঙ্গ
এলে মূলত এ সূক্ষ্ম দিকটিই আমরা বিচার করে দেখি না। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় হিজবুল্লাহর
পক্ষে বিক্ষোভ করায় অনেককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় বাকস্বাধীনতা হরণের দৃষ্টান্তই পাওয়া
যায়। ২ অক্টোবর সিডনিতে এক ১৯ বছর বয়সি তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় নিষিদ্ধ
বলে ঘোষিত হিজবুল্লাহর প্রতীক ব্যবহার করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন
হচ্ছে, তিনি কি হিজবুল্লাহর পক্ষ হয়ে এমন কিছু প্রদর্শন করেছেন? এ প্রতীক প্রদর্শনের
মাধ্যমে তিনি কাউকে হেয়, অপমান কিংবা সংঘাত ছড়াননি। ফলে গোটা অস্ট্রেলিয়ায় বিষয়টি ভিন্ন
মোড় নিয়েছে। এমন ঘটনা আমরা ফিলিস্তিনে যুদ্ধের বছরপূর্তিতে আবার দেখতে পাই। বিশ্বের
অনেক পশ্চিমা দেশে পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটেছে।
ইসরায়েল গাজায় আক্রমণ বন্ধ না করলে হিজবুল্লাহও লেবানন
থেকে হামলা বন্ধ করবে না। হিজবুল্লাহর সঙ্গে এক বছরের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ইসরায়েলি
আক্রমণ বেড়েই চলেছে লেবাননে। গোষ্ঠীটি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের প্রক্সিবাহিনীর
সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন। গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালিয়ে
হামাসের সমর্থনে লড়াই করছে। গোটা বিশ্বই এখন এ যুদ্ধের অবসান দেখতে চায়। বিশেষত ইসরায়েল
জিম্মিদের মুক্তি করার বিষয়টি প্রাধান্য না দিয়ে একের পর এক জায়গায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
এসব গোটা বিশ্বের কাছেই ভয়াবহ বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। ইংল্যান্ডে ফিলিস্তিনপন্থিদের মধ্যে
সংঘর্ষ হয়েছে, ইতালিতেও পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা
কিংবা হিজবুল্লাহর কোনো প্রতীক অথবা হাসান নাসরাল্লাহর ছবি দেখা গেলেই আটক করা হচ্ছে।
পশ্চিমা অনেক দেশে ফেডারেল টাস্কফোর্স রয়েছে যারা মূলত ধর্মীয় সংঘাত ঘটতে পারে এমন
মানুষ চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে।
কমনওয়েলথভুক্ত
রাষ্ট্রগুলোয় অবশ্য কিছু আইন রয়েছে নির্দিষ্ট। কেউ যদি জঙ্গি সংগঠনের পতাকা উত্তোলন
করে তাহলে পুলিশ চাইলে তাদের বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে। এমন প্রচেষ্টার
ফলে বরং পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে শুরু করে। ফিলিস্তিন ও লেবাননে সহিংসতার বিরুদ্ধে
অসংখ্য মানুষ সংহতি জানিয়েছে। তাদের এ সংহতি জানানোর মাধ্যমেই মূলত বিশ্বে ইসরায়েল
গণহত্যাকারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। ফলত এ ধরনের আন্দোলন দমানোর মাধ্যমে ইসরায়েলকে
পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা হয়। বিশেষত আন্তর্জাতিক আইন ও জঙ্গি সংগঠনবিষয়ক যে ট্যাবু
তৈরি করা হয়েছে তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ বাড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন
দেশের নীতিনির্ধারকরা এখন দোটানায় পড়ে গেছেন। ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার মাধ্যমেই তারা
তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমস্যার মুখে রয়েছেন। আর এ সংকট তাদের জন্য
সামনে আরও বাড়বে। বিক্ষোভের অধিকার সবার রয়েছে। আবার প্রতীকী সংহতির বিষয়টিও এড়ানোর
নয়। যদি তা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে মানবাধিকার প্রসঙ্গটি চাপা পড়ে যায়। যা থাকে তা মোটেও
সুখপ্রদ কিছু নয়।
যদিও এভাবে হিজবুল্লাহ কিংবা ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ আরও জনসমর্থন আদায় করে নেবে। তাদের
দমানো যাবে না।
মিডল ইস্ট মনিটর
থেকে অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন