ফিলিস্তিনে গণহত্যা
ডেভিড হার্স্ট
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:২১ এএম
ডেভিড হার্স্ট
মধ্যপ্রাচ্যে
ভূরাজনৈতিক সমীকরণ গেছে পাল্টে। তবে ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রÑ এই দুই রাষ্ট্রের
কোনোটির জন্যই তা সুখকর কিছু না। অন্তত এক বছর আগেও কেউ ভাবেনি এই যুদ্ধ দীর্ঘদিন স্থায়ী
হবে। কিন্তু গাজায় এই যুদ্ধ প্রলম্বিত হচ্ছে। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এত দীর্ঘায়িত
যুদ্ধ তাদের লড়তে হবে, তা কি কেউ কোনো দিন ভেবেছিল? গাজায় বোমা হামলা করে তারা অঞ্চলটিকে
প্রস্তরযুগে পাঠিয়ে দিয়েছে। অঞ্চলটির ৭০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। বর্তমানে তারা
লেবানন, ইয়েমেনেও একই ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। কোনো পক্ষই শান্তির বার্তাবাহী সাদা পতাকা
উত্তোলন করতে রাজি নয়। কয়েকটি জরিপ অনুসারে, এখন পর্যন্ত গাজায় হামলা, রোগ এবং স্বাস্থ্যসেবার
অভাবে ১ লাখ ৮৬ হাজার মানুষ মারা গেছে। শুধু বোমা হামলায় ৪১ হাজার তাজা প্রাণ ক্ষয়ে
গেছে। গাজায় মানুষ খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে না। সামনে শীতকাল। এ সময়টাতেও বোমা
হামলা চলমান। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা এত সহজে হার মানার নয়। নিজ বাসভূমি দখলে রাখতে তারা
সব যন্ত্রণা-লাঞ্ছনা সইতে রাজি।
যুদ্ধের শুরু
থেকেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার
দুটো কৌশল অবলম্বন করে চলেছেন। ইসরায়েল এখন পর্যন্ত চারটি লক্ষ্য অর্থাৎ ফিলিস্তিন
ও লেবাননে অবস্থানরত জঙ্গিদের নির্মূল, সব জিম্মিদের মুক্তি, ইরানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রাম
ধ্বংস এবং ভূরাজনৈতিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে সাজানোর কথা বলেছে। অবশ্যই এই নতুন সাজানো
পরিকল্পনায় ইসরায়েল থাকবে অগ্রভাগে। তবে হামাস ও সিআইএয়ের প্রচেষ্টা শুরুর পর বোঝা
গেল নেতানিয়াহু জিম্মিদের মুক্তি করার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি বরং
ইসরায়েলিদের বোঝালেন, হামাসকে চাপে রাখলে জিম্মিদের তারা মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। ইতোমধ্যে
অধিকাংশ জিম্মিই মারা গেছে। নেতানিয়াহু সরকারের কাছে হামাসকে নির্মূল করাই প্রধান উদ্দেশ্য।
জিম্মি উদ্ধার নয়। জিম্মিরা যদি একবার ফিরে আসে তাহলে নেতানিয়াহুকে গণহত্যার দায়ে জেলে
যেতে হবে।
হামাসকে পুরোপুরি
নির্মূলের লক্ষ্য ইসরায়েল পূরণ করতে এখন পর্যন্ত ব্যর্থ। বরং তারা লেবানন ও হিজবুল্লাহর
সঙ্গে নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। হামাস এখনও গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণে। এখন পর্যন্ত
গাজায় তাদের নির্মূলে দুটি বড় অভিযান চালানো হয়েছে। কিন্তু লাভ হয়নি। হামাস প্রতিবারই
নিজেদের সংস্কার করে ফিরে আসছে। সম্প্রতি ইসরায়েল আল শিফা হাসপাতালের সামনে হামাস নিধনের
কথা বলে গণহত্যা চালিয়েছে। এমনকি সম্প্রতি তারা হামাসের নেতা রাওহি মুস্তাফাকে হত্যার
দাবিও করেছে। অতীতে হামাসের ওপর হামলা সংস্থাটির জন্য নানা সংকট তৈরি করে। তবে এখন
তারা এতটা অসংগঠিত নয়। হিজবুল্লাহপ্রধান হত্যার পর সংগঠনটি একটু পিছিয়ে পড়লেও অসংখ্য
যোদ্ধা প্রতিশোধ স্পৃহায় মত্ত। দীর্ঘমেয়াদে নেতাদের পুনর্বাসন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতিও
তারা নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে
ইরানের সংযুক্তির জন্য ইসরায়েল দায়ী। তারা গাজায় সাধারণ পরিবারগুলোকেও লক্ষ্য করে হামলা
চালাচ্ছে। এসব পরিবারের বেঁচে যাওয়া অনেকেই প্রতিশোধের জন্যই যোগ দিচ্ছে সশস্ত্র সংগঠনে।
জেনিন, তুলকারেম ও নেবলুসেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। তারা ইতোমধ্যে প্রতিহত করে চলেছে
ইসরায়েলি আগ্রাসন। ইসরায়েলের তৈরি করা আতঙ্কই তাদের ওপর আতঙ্ক হয়ে ফিরছে। নেতানিয়াহু
ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা ধ্বংসের পরিকল্পনা করছেন। ইরান তো এত সহজে পিছিয়ে পড়ার
মতো আঞ্চলিক শক্তি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজেও সরাসরি ইরানের সঙ্গে
সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে আগ্রহী নন। এমনকি ইরানের তেল বাংকারে হামলার বিষয়েও তিনি নিষেধ করেছেন
ইসরায়েলকে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র জানে, ফিলিস্তিনের লক্ষ্য ইরানের সংগ্রামের মূল লক্ষ্য
নয়। ভূমধ্যসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের যত বন্ধুরাষ্ট্র রয়েছে তারা সবাই ইরানে ইসরায়েলের হামলার
বিষয়ে শঙ্কিত। ইতোমধ্যে একাধিক রাষ্ট্র নিজেদের যুদ্ধনিরপেক্ষ অবস্থানে দাবি করেছে
এবং জানিয়েছে ইরানে হামলার জন্য তারা কোনো এয়ারবেজ দিতে রাজি নয়। ইরানের পারমাণবিক
পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবে ফিলিস্তিনের সম্পর্ক নেই। ইরান ইসরায়েলের বড় শত্রু নয়। বরং
জেনিন কিংবা গাজার বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিশোধ স্পৃহায় মত্ত তরুণরাই তাদের বড় শত্রু।
নেতানিয়াহু এই
অঞ্চলে একাধিপত্য বিস্তার করার বিষয়কে নাম দিয়েছেন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা স্থাপন। এজন্য
তিনি মডারেট সুন্নি আরব নেতাদের সহযোগিতা চেয়েছেন। কিন্তু যাদের সাহায্য চেয়েছেন তারা
নিজেরাই একনায়কতন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পূর্ববর্তী সময়ের
মতোই ভুল করছে। তারা আরব নেতাদের বক্তব্যই বুঝতে পারেনি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট
সেক্রেটারি অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন জানিয়েছেন, ‘সৌদি যুবরাজ ফিলিস্তিনের চাওয়া নিয়ে চিন্তিত
নন।’ কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ তরুণ
এত দিন ফিলিস্তিন সম্পর্কে জানত না। কিন্তু এই যুদ্ধের পর তারা সচেতন হতে শুরু করেছে।
ফিলিস্তিন নিয়ে আমার তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু আমার দেশের মানুষ যেহেতু বিষয়টি
নিয়ে ভাবে তাই আমার উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া।’ একটি অঞ্চলে স্বৈরতন্ত্র্য যত জাঁকিয়ে
বসে, ততই অঞ্চলটির নেতা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার মতো সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন।
এমনকি সৌদি আরব জানিয়েছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলেই তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক
স্বাভাবিক করবে।
যুদ্ধ শুরুর পর
থেকেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার গোটা বিশ্বের সমর্থন আদায়ের
জন্য কাজ করেছেন। ইতোমধ্যে ফিলিস্তিনের জন্য বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমর্থনও আসতে শুরু
করেছে। আর্থিক এই সহায়তা হামাসের জন্য নানাভাবে উপকার বয়ে আনবে এবং বিষয়টি ইতোমধ্যে
ইসরায়েলের অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মনে বাড়তি শঙ্কা তৈরি করেছে। বিশেষত ইসরায়েলি সামরিক
বাহিনী ধসে পড়ায় ইসরায়েল বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। এই ধাক্কা সামাল দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও
তাদের এখন নেই। বিশেষত তাদের সামরিক বাহিনী দেশটির নাগরিকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে
পারছে না। ফলে ইসরায়েল এখন নিরাপদও নয়।
সম্প্রতি ডেভিড
ইগনাটিয়াস গার্ডিয়ানে একটি নিবন্ধে এক হামাস সেনাকে ধিক্কার জানান। ইহুদিদের মেরে তার
উল্লাস-উদযাপনকে সমালোচনা করেন। তিনি কি ভুলে গেলেন, অসংখ্য ইসরায়েলি সেনা প্রতিদিন
টিকটকে ফিলিস্তিনিদের মেরে ফেলার পর উল্লাস-উদযাপন করে ভিডিও দেয়? নাকি এগুলোকে তিনি
যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন না। শুধু হলোকাস্টের কথা বলেই ইসরায়েল গণহত্যার
অধিকার পেয়ে যায় না। অসলো চুক্তির ৩০ বছর পর গাজা এখন পুরোপুরি আলাদা। তাদের পুরোপুরি
দখল করে ফেলেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটির অ্যাডভাইজার মার্ক সুলিভান
জানিয়েছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে এখন অসংখ্য সমস্যা। কিন্তু এই অঞ্চলটি এখন বিগত যেকোনো দশকের
তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত শান্ত। কারণ সংঘাত বন্ধে এখনও কোনো পক্ষেরই উদ্যোগ দেখা যায়নি।’
ভূমিদখল করে ইসরায়েল
ভাবতেই পারে তারা বিজয়ী। কিন্তু আসলে তা নয়। হামাস এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। অসলো চুক্তি
স্বাক্ষরিত হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে অন্তত হামাসের জন্ম
হতো না। এমনকি তাদের আলাদা সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবেও কাজ করতে হতো না। সম্প্রতি লেবাননে
নতুন করে যুদ্ধ শুরু করায় ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধ থেকে বের হওয়া এক প্রকার অসম্ভব। হামাসও
তাদের কৌশল পাল্টেছে। ফিলিস্তিনি তরুণরা তাদের ট্যাক্সি আর দোকান বিক্রি করে অস্ত্র
কিনছে। মাত্র এক বছরেই হামাস পশ্চিম তীর, জর্ডান, ইরাক, মিসর এবং উত্তর আফ্রিকায় হিরোর
মতো স্ট্যাটাস পেয়ে গেছে। অর্থাৎ আঞ্চলিক সহযোগিতাও পাচ্ছে। এখন নির্বাচন হলে হামাস
আরেক রাজনৈতিক সংগঠন ফাতাহকে উড়িয়েই দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যে
আরেক আরব বসন্ত দেখা দিচ্ছে। হিজবুল্লাহ এত দিন হামাসের জন্য কিছুটা হলেও চুপচাপ থাকলেও
এবার আর চুপ থাকছে না। লেবাননের বৈরুতে হামলার পর থেকেই তারা এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
লেবাননেও গাজার মতোই সংঘাত দেখা যাচ্ছে। ফিলিস্তিনের আর্তিও বদলে গেছে। ফিলিস্তিন এখন
বিশ্বের একমাত্র মানবাধিকার প্রসঙ্গ। গোটা বিশ্বের জন্য ফিলিস্তিনে মানবাধিকার নিশ্চিত
করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। আপাতত চীন, রাশিয়া ও ইরান যদি সমর্থন দেয় তাহলে আমরা হয়তো
নতুন দিনের আলো দেখতে পাব। যুদ্ধের কারণে ইসরায়েল বিশ্বের দক্ষিণ এমনকি পশ্চিমের একাংশের
সমর্থন হারিয়েছে। এখন পর্যন্ত হামাসের যুদ্ধকৌশলই এগিয়ে আছে।
সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন ইসরায়েল অনেক ছোট রাষ্ট্র। বাইডেনও তা বুঝতে পারছেন। কারণ ইসরায়েল যদি ভাবে যে লেবাননের একাংশ ও গাজাকে ইসরায়েল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে তাহলে ভুল ভাববে। ইসরায়েল একটি গণহত্যাকারী রাষ্ট্র। এ নিয়ে ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যমে কম বিতর্ক হয়নি। নেতানিয়াহুর স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ এত দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ ছিল না। যদি শান্তি প্রতিষ্ঠা করতেই হয় তাহলে তাদের এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এই যুদ্ধে কে জিতবে তা না ভেবে বরং এখনই এই যুদ্ধ বন্ধ করা জরুরি।
মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : আমিরুল আবেদিন