সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৬ অক্টোবর ২০২৪ ০৮:৩৫ এএম
ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক
সরকারের অনুরোধ অগ্রাহ্য করলেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের
অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারেননি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। উপরন্তু বাংলাদেশে
তার ঝটিকা সফরের মধ্য দিয়ে বন্ধু হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে
সম্পর্কের যে নতুন উচ্চতা দৃশ্যমান করলেন তা অভাবনীয়। আনোয়ার ইব্রাহিম ও ড. মুহাম্মদ
ইউনূসের মধ্যে আন্তরিকতার ছোঁয়ার আরও চিত্র এবং দুজনের মধ্যে অন্তরঙ্গ বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়র
পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়াদি নিয়ে যে আলাপ-আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতেও
সম্পর্কের নতুন উচ্চতার মাত্রা পরিস্ফুটিত হয়েছে। বাংলাদেশের ভাগ্যবিড়ম্বিত ১৮ হাজার
শ্রমিকের জন্য মালয়েশিয়ার বন্ধ দরজাও পর্যায়ক্রমে খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছে দেশটির
প্রধানমন্ত্রীর তরফে। ৫ অক্টোবর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনে যথার্থই বলা হয়েছে,
সফর সংক্ষিপ্ত হলেও সম্পর্কের উষ্ণতায় এর ব্যাপ্তি অনেক বড়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে সেখানে
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষে দুই সরকারপ্রধানের একই গাড়িতে চড়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের
ভেন্যু হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আসার বিষয়টিও ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবেই
ইতিহাসের অধ্যায়ে সংযুক্ত থাকবে।
এক দশকেরও বেশি
সময় আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী
নাজিব রাজাক। এর দীর্ঘদিন পর বন্ধুত্বের ডাকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পথে মালয়েশিয়ার
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম মাত্র ছয় ঘণ্টার সফরে ৪ অক্টোবর ঢাকা আসেন। অন্তর্বর্তী
সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিদেশি কোনো সরকারপ্রধানের বাংলাদেশে এটাই ছিল প্রথম সফর।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মালয়েশিয়ার
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের অনুষ্ঠিত বৈঠকে অনেক দিন ধরে দেশটির শ্রমবাজারে আমাদের
জন্য যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল এরও নিরসন ঘটল আন্তরিকতার কারণেই। নানা প্রেক্ষাপট
বিশ্লেষণে আনোয়ার ইব্রাহিমের এই ঝটিকা সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলতেই হবে।
এই সফরে রাজনৈতিক
গুরুত্ব নিশ্চয়ই রয়েছে, কিন্তু এর পাশাপাশি দুদেশের মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে
যে নতুন পথরেখা নির্ণীত হয়েছে তাও সংগত কারণেই আমাদের আরও বেশি আশাবাদী করে তোলে। দুই
দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির দৌরাত্ম্যের যে অপচ্ছায়া দৃশ্যমান হয়েছিল এর নিরসনে মালয়েশিয়ার
প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক মন্তব্য সাধুবাদযোগ্য। অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ ইউনূস
সব জটিলতা কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তাও
ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। দুই নেতার মধ্যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রোহিঙ্গা
ইস্যু ছাড়াও বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিষয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন,
জনশক্তি রপ্তানি, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতাসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট
আরও নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
দুই দেশের অর্থনীতিতে
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের কথা আনোয়ার ইব্রাহিম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন
করেছেন। তিনি এও বলেছেন, আঠারো হাজার বাংলাদেশি কর্মী সব ধরনের প্রক্রিয়া অবলম্বন করে
মালয়েশিয়ায় যেতে না পারাটা তাদের দোষের কারণে নয়। এই প্রেক্ষাপটে তিনি প্রয়োজনীয় সমন্বয়
ও পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাতে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের
সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার জন্য তার আন্তরিক প্রয়াস রয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে সিন্ডিকেটের
তৎপরতা নিয়ে তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, অতীতের পদ্ধতি ভেঙে দেওয়া হয়েছে, এখন
স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়োগ হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতি
মর্যাদাপূর্ণ আচরণের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার
মধ্যে সম্পর্কের নতুন মোড় যে প্রেক্ষাপটে সৃষ্টি হয়েছে এর কৃতিত্বের দাবিদার অন্তর্বর্তী
সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আমরা দেখছি, তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের
সূত্র ধরেই আনোয়ার ইব্রাহিমের ঝটিকা সফরের গুরুত্ব আমাদের শ্রমবাজারের বিষয়টিকে ছাপিয়ে
আরও বিস্তৃত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার
উন্মুক্ত হয়েছে তিন দশকেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু কখনও কখনও রিক্রুটিং এজেন্সির কারণে
আমাদের জন্য তা নানামুখী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক
সম্পর্ক শুরু হয় ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি। এই হিসেবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বয়স প্রায়
৫৩ বছর। বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগও কম নয়। আশার কথা হলো, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার
বিনিয়োগের পরিসর বৃদ্ধির সম্ভাবনাও আনোয়ার ইব্রাহিমের এই সফরের মধ্য দিয়ে অনেকটা উজ্জ্বল
হয়ে উঠেছে।
আসিয়ান জোটভুক্ত
দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়া অত্যন্ত প্রভাবশালী সদস্য। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও ইতোমধ্যে
আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সার্কসহ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের সম্পর্ক
আরও সরব হোক। এই প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের শ্রমশক্তির চাহিদা বিশ্বের অনেক শ্রমবাজারে রয়েছে। তবে আমরা যদি দক্ষ শ্রমিক
প্রেরণের ব্যাপারে মনোযোগ গভীর করি, তাহলে তা জাতীয় স্বার্থের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ
সৃষ্টি করবে। বিশ্বের শ্রমবাজারে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে এবং মালয়েশিয়াও
এর বাইরে নয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে আরও ঘনিষ্ঠতর
করার যে সংকল্পের কথা জানিয়েছেন, আনোয়ার ইব্রাহিমও এর সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন এবং
নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কারণ মালয়েশিয়ায় আমাদের শ্রমবাজারের
ভবিষ্যৎ আরও বিস্তৃত করার পাশাপাাশি সেদেশের বিনিয়োগ আকর্ষণ করার সুযোগ আরও বাড়তে পারে
এই প্রেক্ষাপটে।
তবে জনশক্তি রপ্তানি
থেকে শুরু করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ প্রশ্নমুক্ত করার ব্যাপারে বাংলাদেশকে অধিকতর জোর
দেওয়া বাঞ্ছনীয়। আসিয়ান জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে যে আলোচনা চলমান এই পরিস্থিতিতে
মালয়েশিয়ার আমাদের জন্য যথেষ্ট ইতিবাচক ভূমিকা রাখার অবকাশ রয়েছে। মালয়েশিয়ার নির্মাণ,
শিল্প উৎপাদন ও কৃষি খাতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। অভিবাসীকর্মীদের
ন্যায্য মজুরি, কর্মপরিবেশ, অনিবন্ধিত শ্রম নিয়ন্ত্রণসহ যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলোও
যৌথ প্রচেষ্টায় নিরসন করা সম্ভব। তা ছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়া সহজতর করার পাশাপাশি শ্রম
অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি উন্নত করার ক্ষেত্রেও মালয়েশিয়ার তরফে যে ইতিবাচক মনোভাব প্রতিভাত
হয়েছে, এসব কিছুর সূত্র ধরেই দুই দেশের সম্পর্ক নিশ্চয়ই আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার মতো
পরিস্থিতি এখন নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করি, কূটনৈতিক তৎপরতার
মধ্য দিয়েই দুদেশের মধ্যে বিকাশমান টেকসই সম্পর্ক আরও বেশি প্রতিভাত হবে।