বাংলাদেশের অর্থনীতি
প্রভাত পট্টনায়েক
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:১৮ এএম
প্রভাত পট্টনায়েক
বাংলাদেশের অর্থনীতির
সংকটের মূলে রয়েছে একটি নব্য উদারনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে কেবল রপ্তানির ওপর নির্ভর করে
জিডিপি বৃদ্ধির কৌশল। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্থানপতনের কারণ হিসেবে বেশিরভাগ
বিশ্লেষণই শেখ হাসিনা সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ এবং কর্তৃত্ববাদের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ
করেছে! এ ধরনের বিশ্লেষণগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন উপেক্ষা করে বা
সাধারণভাবে অবমূল্যায়ন করে। মাত্র কয়েক মাস আগে একটি অর্থনৈতিক ‘অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে
সমাদৃত একটি দেশ এখন একটি আর্থিক সংকটে নিমজ্জিত; যা হঠাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রার
অবস্থা আরও খারাপ করেছে। এ অবনতির কারণেই শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি বিদ্বেষ উল্লেখযোগ্যভাবে
বৃদ্ধি পায়। এর জন্য হাসিনা সরকারকে দায়ী করা হয় এবং এর বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ পায়
রাস্তায় অর্থাৎ রাজপথে প্রতিবাদে।
২০২১ সাল পর্যন্ত
বাংলাদেশকে একটি নব্য উদারনীতির মধ্যে রপ্তানিকেন্দ্রিক বৃদ্ধির সাফল্যের গল্প হিসেবে
বিবেচনা করা হয়েছিল। এর রপ্তানির প্রায় ৮০% ছিল গার্মেন্ট এবং এর গার্মেন্ট রপ্তানির
বৃদ্ধি এতটাই দ্রুত ছিল যে, এমনকি এটি মনে করা হচ্ছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ
বিশ্বের পোশাকের চাহিদার ১০% পূরণ করবে। ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলো ‘লাখ লাখ মানুষকে
দারিদ্র্য থেকে উদ্ধার করে আনার জন্য’ বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করে। এবং ২ এপ্রিল,
২০২৪-এর শেষের দিকে, বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল যে ২০২৪-২৫
অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি (মোট দেশি পণ্যের মূল্যমান) বৃদ্ধি হবে ৫.৬%, যেটা যেকোনো
মানদণ্ডে একটি দারুণ পরিসংখ্যান! বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে যখন পোশাক
রপ্তানি কোভিড মহামারি দ্বারা প্রভাবিত হয়। যদিও এ অবনতি অস্থায়ী হওয়ারই কথা ছিল (বিশ্বব্যাংকের
২০২৪-২৫ সালের জন্য একটি আশাজাগানো পূর্বাভাসে এমনটাই বলা হয়েছিল)। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে
ক্রমাগত স্থবিরতার কারণে এটি আরও স্থায়ী হয়েছে, যেটা আদৌ আশ্চর্যজনক নয়।
একই সময়ে বিদেশে
অবস্থিত বাংলাদেশিদের পাঠানো টাকা, যেটা বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার আরেকটি প্রধান
উৎস, নিঃসন্দেহে একই কারণে আঘাত হানে। যেহেতু বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আমদানি
করা জ্বালানির ওপর নির্ভর করে, তাই রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আমদানি করা জ্বালানির
দাম বৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার একটি মারাত্মক ঘাটতিতে অবদান রেখেছে। এসব কারণেই বিদ্যুতের
দামের বৃদ্ধি হয়েছে। সব মিলিয়ে এগুলোই সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে।
আরও দুটি কারণ
বিদ্যমান। কারণগুলো হলো- মূল্যস্ফীতির অস্বাভাবিক বৃদ্ধিতে অবদান রেখেছে যা আগস্টে
৯.৫২%-এ পৌঁছেছে, যা বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু এখনও অনেকে এ সংখ্যাকে
কম করে দেখানো হয়েছে বলে মনে করেন। প্রথমটি হলো ডলারের বিপরীতে বিনিময় হারের অবমূল্যায়ন,
যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুদ্রাস্ফীতিবিরোধী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে সুদের হার বৃদ্ধির
কারণে ডলারের শক্তিশালী হওয়ার ঘটনা। বাংলাদেশ তার অ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রার সমস্যার
সম্মুখীন হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো ক্রমবর্ধমান ব্যয় সংকোচনের চাপ যেটা একটি নব্য উদারনীতির
পথ অনুসরণ করার জন্য বাংলাদেশের সরকার অর্থনীতির ধীরগতির কারণে প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়।
মনে রাখতে হবে, নব্য উদারনীতি জনগণকে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব থেকে দূরে রাখার যেকোনো
প্রচেষ্টা বাতিল করে। কারণ মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব থেকে জনগণকে মুক্ত করার যেকোনো প্রচেষ্টার
জন্য ভর্তুকি বিল বৃদ্ধির প্রয়োজন, আর ভর্তুকি শব্দটি নয়া উদারনীতিতে অবশ্য-পরিহার্য।
রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের বৃদ্ধির ধীরগতি এর বহুমুখী প্রভাবের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের
জন্য দায়ী, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী
তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিনিময় হারের ক্রমাগত অবমূল্যায়নের ফলে যে ব্যয়বৃদ্ধির প্রভাব
ফেলেছিল, তা-ও মুদ্রাস্ফীতির ত্বরণের জন্য দায়ী।
মুদ্রাস্ফীতির
মুখে পোশাক শিল্পসহ নানা খাতের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের মাধ্যম হিসেবে ন্যূনতম মজুরি
বৃদ্ধিও নব্য উদারনীতির প্রেক্ষাপটে একেবারেই প্রশ্নাতীত নয়। কারণ এটি বিদ্যমান রপ্তানি
বাজার ধরে রাখা আরও কঠিন করে তুলেছে এবং ন্যূনতম মজুরির এ ধরনের বৃদ্ধি যদি রপ্তানিকে
প্রতিকূলভাবে প্রভাবিত করা থেকে এ বৃদ্ধিকে রোধ করার জন্য আরও বিনিময় হারের অবমূল্যায়নের
সঙ্গে থাকে। তবে এটি জ্বালানির আমদানিকৃত দাম আরও বাড়িয়ে দিয়ে মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা
সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলবে। এসবের মাঝে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ
এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঋণদাতার কাছে ঋণের জন্য যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু যে ঋণগুলো
এটি সুরক্ষিত করেছিল তা ঋণসেবার বোঝা যোগ করে পরিশোধের ক্ষমতা আরও অনিশ্চিত করে তুলেছিল।
এমনকি বিগত দিনে সরকারের সীমিত পরিমাণ জনকল্যাণ নীতি তৈরি করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে।
কারণ আইএমএফ ওই দেশের নীতিগুলো কড়া নজরদারির মধ্যে রাখে। এ ছাড়া আইএমএফ কর্তৃক আরোপিত
‘ব্যয় সংকোচন নীতি’ বেকারত্ব পরিস্থিতি আরও তীব্র করে তুলেছে।
যারা শেখ হাসিনার
শাসনের অবসান ঘটানো এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক
সংকটের গুরুত্ব স্বীকার করেন তারাও এ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রধানত তার শাসনের দ্বারা
প্রদর্শিত ব্যাপক ‘ক্রোনিজম’কে দায়ী করেন। একইভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য চাকরির
‘সংরক্ষণ’ নীতির বিরোধিতাকে সাধারণত শাসকবিরোধী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু যুক্তির
এ লাইন, আসল সমস্যা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। বাংলাদেশে বেকারত্ব সংকটের তীব্রতার কারণেই
‘সংরক্ষণের’ বিরোধিতা এতটা প্রকট হয়ে উঠে এবং অর্থনীতির সংকটের মূলে ছিল নিওলিবারাল
সেটিংয়ের মধ্যে রপ্তানি নেতৃত্বাধীন বৃদ্ধির কৌশল। সংক্ষেপে এটা ‘ক্রোনিজম’ নয়, বরং
অর্থনৈতিক সংকটের মূলে নিহিত কৌশলের ফলমাত্র। এমনকি যখন এ ধরনের শর্টকাট পদ্ধতি কিছু
সময়ের জন্য নাটকীয়ভাবে সফল ফল দেয়, বিশ্ব অর্থনীতির যেকোনো ধীরগতি যা রপ্তানিকে প্রভাবিত
করে বা বাহ্যিক ফ্রন্টে অন্য কোনো প্রতিকূল পরিবেশ অর্থনীতিকে এমন একটি সংকটের দিকে
ঠেলে দেয় যা সময়ের সঙ্গে এর সাফল্যের পরিবর্তে অনেক কিছুরই উল্টো ফল ফলতে থাকে। বাংলাদেশের
উন্নয়ন থেকে যে দুটি অসামান্য পাঠ শিখতে হবে তা হলো প্রথমত, তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ
আকস্মিকতার সঙ্গে ‘সফল’ থেকে ‘ব্যর্থ’ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটা বাস্তব যেকোনো একটি
ফ্রন্টে দেশটি প্রাথমিকভাবে যে অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছিল সেটা অন্য আরও কয়েকটি ফ্রন্টে
অসুবিধা ডেকে আনতে পারে।
কেউ কেউ বলবেন,
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যাটি তার সমস্ত ডিম এক ঝুড়িতে রাখার মধ্যে নিহিত, কারণ এটি
রপ্তানির বৈচিত্র্যময় পণ্যসম্ভারের পরিবর্তে প্রায়-একচেটিয়াভাবে কেবল পোশাক রপ্তানির
ওপর নির্ভর করার ফল। অন্যরা পরামর্শ দেবেন যে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে তার সাফল্য
ব্যবহার করা উচিত ছিল তার অর্থনীতি ভার্সেটাইল করার জন্য শিল্পের একটি সম্পূর্ণ পরিসরের
বিকাশের মাধ্যম তৈরি করা যা দেশি বাজার পূরণ করবে। এ ধরনের সমালোচনাগুলো অবশ্য একটা
মূল বিষয়কে গুরুত্ব দেয় না। একটি নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতিতে রাষ্ট্র বাজারের ওপর
হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এটা প্রমাণিত সত্য যে, দেশি বাজারের কিছুটা সুরক্ষা ছাড়া দেশি
শিল্পায়নকে উন্নীত করা যায় না। আর এ ধরনের সুরক্ষানীতিকে আন্তর্জাতিক পুঁজি (যে পুঁজির
সাহায্য ছাড়া রপ্তানি বৃদ্ধি করা সম্ভবই নয়) দ্বারা কঠোরভাবেই সমালোচিত করা হয়।
একইভাবে কোন বিশেষ রপ্তানি আন্তর্জাতিক বাজারে সফল হবে তা আন্তর্জাতিক পুঁজি দ্বারা নির্ধারিত বিষয়, দেশের নয়। তাই নব্য উদারনীতিবাদের অধীনে রপ্তানি-নেতৃত্বাধীন বৃদ্ধির ক্ষতির জন্য রাষ্ট্রকে দোষারোপ করা সম্পূর্ণরূপে অযৌক্তিক। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ছাত্রদের উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক না কেন, নির্বাচনে যদি সব দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেওয়া হয় এবং বামপন্থিরা যদি ঐকমত্য গড়ে একত্র হতে না পারেন, তাহলে রাজনৈতিক উত্থানের প্রধান সুবিধাভোগী হিসেবে ধর্মীয় মৌলবাদীরা ব্যাপকভাবে আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ হাতিয়ে নেবে। সেটা বাংলাদেশিদের জন্য শুভফল বয়ে আনবে না। ১৭ কোটি জনসংখ্যার দেশকে কোনোভাবেই ‘ছোট’ বলা যায় না। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, একটি বাড়ি-বাজার-ভিত্তিক উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করা সহজ নয়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব যে এখন বিশ্ব পুঁজিবাদী সংকটের পরিণতির মুখোমুখি হচ্ছে, তার জন্য অন্য কোনো বিকল্প নেই।
ভাষান্তর : সৌভিক ঘোষ