প্রজন্মের ভাবনা
মিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:৫১ এএম
ঘুম ভাঙার পর আমাদের অনেকের দিন শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড দেখে। আর
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন উপস্থাপনে এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল। রকমারি রি-অ্যাক্ট আর কমেন্টে ভরে যাচ্ছে নোটিফিকেশন বক্স। ব্যস্ত হয়ে
পড়ছি টেক্সট আর কমেন্টের রিপ্লাই দিতে। সময়মতো রিয়েক্ট, কমেন্ট
বা টেক্সটের রিপ্লাই দিতে না পারলে ইগনোর করছি বলে মনে করা হচ্ছে। সারাদিন
বিভিন্ন সময় আমরা কোনো না কোনোভাবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি
সোশ্যাল মিডিয়ায় অজস্র সময় ব্যয় করছি। এভাবে আমাদের অনেক মূল্যবান সময়ের
অপচয় ঘটছে। আবার আমরা নিজেরা আমাদের ব্যবহারিক জীবনের অনেক কাজ পিছিয়ে দিচ্ছি। সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমও এক ধরনের মাদকের মতো সমাজে রয়ে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আকর্ষণের প্রভাব পরিবার ও শিশুদের ওপর তীব্রভাবে পড়ছে। আমরা জানি, আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম এখন বইনির্ভর
ও মুখস্থনির্ভর। শহর এলাকায় খেলার মাঠ নেই। ঘোলাটে জীবন থাকায় তাদের চিত্তবিনোদনের
অংশ হয়ে পড়ছে গেম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এলগরিদম অন্য
রকম। ফলে এখানে বয়সভেদে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না কে কী কন্টেন্ট দেখবে। যদিও এখন প্যারেনশিয়াল
কন্ট্রোল চালু হওয়ায় অনেকেই সন্তানরা অ্যাপে কি করতে পারবে তা পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান
করতে পারেন। কিন্তু আমাদের সামাজিক বলয়ে সবার পক্ষে প্রযুক্তিতে পারদর্শী হওয়া সহজ
না। তাই প্রজন্মের বিরাট একটি অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা গেমিংয়ের খপ্পরে পড়ছে। অ্যাসাইনমেন্টের নাম করে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে স্মার্টফোন। সুলভ
মূল্যের এই ইন্টারনেট, যা মুহূর্তের মধ্যেই সবকিছু হাতের মুঠোয় এনে দিতে পারে। যা
অল্প বয়সের এই কোমলমতি শিশুদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
দুরন্ত শৈশব, খেলার মাঠ ছেড়ে শিশুরা গৃহবন্দি
হয়ে যাচ্ছে। তীব্রভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কেউবা আসক্ত ভিডিও
গেমস, ফ্রি ফায়ার,
পাবজি, ইউটিউব ও টিকটকে। আসক্ত হয়ে পড়ছে
পর্নোগ্রাফিতে। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সমাজের ভাবমূর্তি। পরিবারকে চাপ দিয়ে কিনে
নেওয়া হচ্ছে নামিদামি ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও কম্পিউটার। এর মহামারি
শুধু শহরে নয় পৌঁছে গেছে গ্রামগঞ্জে।
গ্রামের শিশুরাও খেলার মাঠ ছেড়ে, ফোন হাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত। ফেসবুক,
যা রীতিমতো ‘টাইম কিলিং’ মেশিনে পরিণত হয়েছে। স্কুলপড়ুয়া ছেলেমেয়েরা সোশ্যাল
মিডিয়াকে ব্যবহার করে ‘অসুস্থ কনটেন্ট’ বানাচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হলে সামাজিক সচেতনতা
জরুরি সর্বাগ্রে। তা না হলে প্রজন্ম ডুবে যাবে অন্ধকারে। এখনকার
ছেলেমেয়েরা খেলাধুলার জন্য নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হওয়ার কারণে বকা
খাচ্ছে। অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, যা ক্রমশ গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের
মেধাবীদের প্রতিভা। বাস্তবিক চিন্তা, মেধার-বিকাশ, দায়িত্বশীলতা, নেতৃত্ব
দান, পরিকল্পনা ও স্বাভাবিক জীবন-যাপনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্তমানে আধুনিকতার
ছোঁয়ায় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নাÑ এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বিরল।
চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ‘ সোশ্যাল মিডিয়ার রাজত্ব’, যার বাধ্যগত প্রজা আমরা সকলেই। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সুস্থ বিনোদন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়স্বজনদের খোঁজখবর রাখা সবকিছু থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি। নিজ, শিশু, দেশ, জাতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টিকটক, ভিডিও গেমস ও অসুস্থ কনটেন্ট থেকে দূরে থাকি।