× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জনস্বাস্থ্য

ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমানোর উপায়

ড. কবিরুল বাশার

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৫:৩৪ পিএম

ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমানোর উপায়

প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা। ১৮ সেপ্টেম্বর এক দিনে হাসপাতালে ভর্তি হন ৮৬৫ জন এবং মারা গেছেন ছয়জন। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গতকাল পর্যন্ত ১১৯ জন মারা গেছেন; সেপ্টেম্বরের গত কয়েক দিনে মারা গেছেন ৩৬ জন। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৭০৫ জন মারা গেছেন। গত কয়েক দিনের আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় সামনের দিনগুলোর পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে। সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এ শংকা রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই যেকোনো রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার হিসাব এবং পর্যবেক্ষণ করে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার অতি উচ্চ। গত বছর বাংলাদেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৭০৫ জন মারা গেছেন। গত বছর বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার (সিএফআর) ছিল ০.৫ শতাংশ আর এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৫৬ শতাংশ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মৃত্যুহার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা খুব সফলভাবে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমাতে পেরেছে। পৃথিবীতে ডেঙ্গুর অন্যতম ঝুঁকির দেশ হচ্ছে ব্রাজিল ও ফিলিপাইন। এ দেশগুলোয়ও ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম। ব্রাজিল ও ফিলিপাইনে মৃত্যুহার যথাক্রমে ০.০৪৯ ও ০.৩৪ শতাংশ। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ০.০১ শতাংশেরও কম। যে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা যত উন্নত, সে দেশে সংক্রামক রোগে মৃত্যুহার তত কম। বাংলাদেশে ডেঙ্গুরোগীর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারীর তুলনায় পুরুষ বেশি আক্রান্ত হয়। পুরুষ ৬২ শতাংশের বেশি আক্রান্ত হলেও মৃত্যু হচ্ছে নারীর অনেক বেশি। ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যু কেন বেশি এবং এর প্রতিকারের উপায় কীÑএ নিয়ে একটি দৈনিকে আমার বিস্তারিত লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৩ সালের ২২ জুলাই। আমি বলেছিলাম ডেঙ্গুতে নারীর মৃত্যুহার কীভাবে কমানো সম্ভব।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবমতে এ পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ পরিসংখ্যানটি শুধু যেসব হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে রিপোর্ট করে তাদের যোগফল। এমন অনেক হাসপাতাল বা ক্লিনিক আছে যারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে রিপোর্ট করে না এবং অনেক মানুষ বাসায় থেকে ডেঙ্গু চিকিৎসা নেন; যে সংখ্যাটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংখ্যার সঙ্গে যুক্ত হয় না। ডেঙ্গুকে সঠিকভাবে ম্যানেজমেন্ট করতে গেলে আক্রান্ত রোগীর সঠিক পরিসংখ্যান এবং তার ঠিকানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত ব্যক্তির সঠিক ঠিকানা সংগ্রহ করতে পারলে ওই বাসায় ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করলে ডেঙ্গুকে ওখানেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ্‌ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে, আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বেশি। এ ছাড়া কক্সবাজার, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, ভোলা, মানিকগঞ্জ, মাদারীপুর, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোর এসব জেলায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে বলে আমাদের গবেষণায় প্রতীয়মান হচ্ছে।

সেপ্টেম্বরের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। ২০০০ সালে ডেঙ্গু প্রথম চিহ্নিত হওয়ার পর পরই ডেঙ্গু নিয়ে গবেষণা শুরু করি। দীর্ঘ ২৫ বছর ল্যাবরেটরি ও মাঠ পর্যায়ে মশা নিয়ে কাজ করছি। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি ও আমার টিম ঢাকার প্রতিটি অলিগলি চষে বেড়িয়েছি। যখনই কোনো জেলায় মশা ও মশাবাহিত রোগের আবির্ভাব হয়েছে আমার টিম নিয়ে ছুটে গিয়েছি সেখানে। বাংলাদেশ ও জাপানে তাত্ত্বিক পড়াশোনা ও মাঠ পর্যায়ের জ্ঞান দিয়ে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেছি মশা নিয়ন্ত্রণবিষয়ক পরামর্শ দিতে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সে পরামর্শের বাস্তবায়ন দেখিনি।

দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা ডেঙ্গু আমরা এখনও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারিনি। ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুহার দিনদিন বেড়েই চলেছে। ছোট্ট একটি পতঙ্গ মশা আর এরই কাছে হেরে চলেছি আমরা! স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করে। আবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে চিকিৎসার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের। ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ ও গবেষকদেরও দায়িত্ব আছে। গবেষকরা গবেষণালব্ধ ফলাফলের মাধ্যমে দেশকে নির্দেশনা প্রদান করবেন। সে নির্দেশনা অনুযায়ী দেশ মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ দেশে গবেষকদের কথা মূল্যায়ন বা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য আমি একটি বিস্তারিত মডেল প্রস্তাব করেছি। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমার মডেল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ হবে। আমার প্রস্তাবিত এ মডেলটি গত বছর ১৬ অক্টোবর একটি দৈনিকের সম্পাদকীয় পাতায়ও প্রকাশিত হয়। পরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আমার মডেলটি আমি সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এবং সিটি করপোরেশনের মেয়রদয়কে দিয়েছিলাম কিন্তু কেউই বিষয়টি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাননি।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে নাগরিকেরও করণীয় রয়েছে। তারা যার যার অবস্থান থেকে নিজ নিজ বাড়ি ও আঙিনায় যেন এডিস মশার প্রজনন না ঘটে তা নিশ্চিত করবেন। এখন যেহেতু ডেঙ্গুর মৌসুম তাই কারও জ্বর হলে সময় ক্ষেপণ না করে সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ ডেঙ্গু ধরা পড়লে কোনো একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বাসায় বা হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি নেই বললেই চলে। তবে শিশু, বয়স্ক, সন্তানসম্ভবা মা অথবা যাদের দেহে অন্যান্য রোগ আছে তাদের ডেঙ্গু ধরা পড়লে অবশ্যই হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা ব্যর্থ হলেও আমাদের পাশের দেশের নগর কলকাতা দারুণভাবে সফল। আবহাওয়া, জলবায়ু, অবকাঠামো এবং জনগণের আচরণ একই রকম হওয়ার পরও কলকাতা সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগের মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সফলভাবে করে ডেঙ্গুকে শাসনে রেখেছে। আমাদেরও সফল হওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি। ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমানোর জন্য বিশেষ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। মৃত্যুহার কমানোর জন্য প্রথম দায়িত্ব রোগী এবং রোগীর পরিবারের। ডেঙ্গু ধরা পড়লে সঙ্গে সঙ্গে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে বাসায় বা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে। কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা হাসপাতালগুলোর ডেঙ্গুরোগীকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর না করে নিজ দায়িত্বে চিকিৎসা করতে হবে।

বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশিরভাগ রোগী ঢাকা মেডিকেল কলেজে মারা গেছেন হাসপাতালে ভর্তির এক দিন বা দুই দিনের মধ্যে। এতে প্রতীয়মান হয়, ওই রোগীটির বাড়িতে অথবা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কালক্ষেপণ হয়ে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মৃত্যু পর্যালোচনা টিমের ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ডেঙ্গুতে এত মৃত্যুর কারণ নিরূপণ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। উপজেলা বা জেলা হাসপাতালগুলোর কমপক্ষে দুজন ডাক্তারকে ডেঙ্গু চিকিৎসায় উপযোগী করে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করা প্রয়োজন। ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু নামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি বই রয়েছে; সেটি স্থানীয় ডাক্তারদের পড়া এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা প্রদান করা দরকার।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে এডিস মশার প্রজনন বন্ধ করা এবং নিয়ন্ত্রণ। যেসব পাত্রে পানি জমা হয়ে এডিস মশার প্রজনন হতে পারে সেসব পাত্র ব্যবস্থাপনা করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। যদি কোনো বাড়িতে ডেঙ্গুরোগী থাকে সে বাড়ির চারদিকে ২০০ মিটারের মধ্যে ফগিং করে উড়ন্ত মশা মেরে দিতে হবে। আমি আমার মেডেলটি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রত্যেকটি মহলকে জেনে নেওয়ার আহ্বান জানাই। সঙ্গে সঙ্গে ওই বাড়িতে লার্ভানাশক কীটনাশক প্রয়োগ করে লার্ভা ধ্বংস করতে হবে এবং এমন কোনো পাত্র রাখা যাবে না যেখানে এডিস মশার প্রজনন হয়। সিটি করপোরেশন এবং নাগরিক দুই পক্ষকেই এ মুহূর্তে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের বিশেষ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, গবেষক, কীটতত্ত্ববিদ ও নাগরিকের সম্মিলিত প্রয়াস ঘটাতে পারলে ডেঙ্গুকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখা সম্ভব।


  • কীটতত্ত্ববিদ ও গবেষক। অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা