পোশাক শিল্পে অস্থিরতা
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:২৩ এএম
মোস্তফা হোসেইন
গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারের পোশাক কারখানাগুলোর শ্রমিকরা
আন্দোলনে। ১৭ সেপ্টেম্বর শ্রমিকদের দুপক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। একই দিন
ফের বিক্ষোভ হয়েছে গাজিপুরে। গত কিছুদিন ধরেই চলছে এ খাতে চরম অস্থিরতা। কারখানাগুলো
ভাঙচুর করতেও দেখা গেছে তাদের। মহাসড়ক অচল করে দেয় দফায় দফায় শ্রমিকরা। জনদুর্ভোগ
তৈরি হয় তাদের আন্দোলনের কারণে। সাভার ও আশুলিয়ায় ২ শতাধিক কারখানা বন্ধ করে দিতে
হয়েছিল নিরাপত্তার কারণে। সর্বশেষ কিছু কারখানা চালু হলেও নতুন করে আবার ছুটি
ঘোষণা হচ্ছে আরও কারখানায়। রীতিমতো অর্থনীতি অচল করে দেওয়ার পাঁয়তারা। এ
অস্থিতিশীলতা কেন? সাধারণত শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয় শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, নিয়মিত
বেতন পাওয়া, শ্রমপরিবেশ নিশ্চিত করার মতো দাবিগুলো সামনে রেখে। এবারও তেমন কিছু
দাবি করতে দেখা যায়। কিন্তু দাবিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কারখানা বন্ধ করে
আন্দোলন করার মতো অবস্থা অনুপস্থিত। ভাঙচুর, কারখানা ধ্বংস করা তো পরের কথা। সঙ্গত
কারণেই প্রশ্ন আসে, কেন পোশাক খাতকে এভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে? বিভিন্নভাবে আলোচনায়
এসেছে এর পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে। এটা স্পষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না,
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে পরাজিত শক্তিই এর পেছনে সরাসরি জড়িত। যেমনটা ৫ আগস্ট-পরবর্তীকালে
বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের পেছনে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোকে দায়ী করা হয়েছিল কোনো
কোনো সংবাদমাধ্যমে। কিন্তু পোশাক খাত অস্থির করার পেছনে কারা?
এ মুহূর্তে শ্রমিকরা সরকারবিরোধী কোনো দাবি উত্থাপন
করেনি। তাদের দাবিগুলোর অধিকাংশই শিল্পমালিকদের কাছেই। সেটা হতেই পারে। কিন্তু যখন
মুখোশ পরে শ্রমিকদের আন্দোলনে ডাকা হয়, যখন শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে মালিকপক্ষের
আলোচনায় বিষয়টি সুরাহা না হয় তখন ভিন্নতর চিন্তার অবকাশ থাকছেই। পোশাক শিল্পের
সঙ্গে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি জড়িত থাকে, যারা স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি কাজে
লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে। এবারের আন্দোলনে ওই গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার
বিষয়টিও আলোচনায় আসছে। বিশেষ করে ঝুট ব্যবসায় জড়িত থাকার কথাটি। সাধারণত এ ব্যবসায়
জড়িত থাকে স্থানীয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক গোষ্ঠী। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ
সুবিধাভোগীদেরও পরিবর্তন হয়। ৫ আগস্টের আগে প্রায় ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ও শ্রমিক
লীগের নেতা-কর্মীরা ঝুট ব্যবসায় জড়িত ছিলেন, চাঁদাবাজির মতো অপকর্ম তারা করতেন।
এখন তাদের পলাতক জীবন বেছে নিতে হয়েছে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে। সে সুযোগটিই
নতুনদের গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা নিজ নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখানোর
প্রয়াস হিসেবে এ অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে বলে ইতোমধ্যে আলোচনা হচ্ছে এবং এ তথ্যও
পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে।
বাস্তবতা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো দলীয় পরিচিতি
নেই, তাদের পক্ষে কোনো বাহিনী তৈরির সুযোগও নেই। অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা জাতির
উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে স্পষ্ট করে বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিগুলো বিবেচনাযোগ্য।
তাদের তিনি পরিষ্কারভাবে আহ্বান জানিয়েছেন, সুষ্ঠু উৎপাদন নিশ্চিত করতে নিজেরা যেন
উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন, উৎপাদন পরিপন্থি কোনো কাজ যেন
কেউ না করে; আবার শ্রমিকদের স্বার্থও যেন বিঘ্নিত না হয়। অন্যদিকে এ ধরনের কাজের
সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়কারীদের কেউ জড়িত নন এটাও স্পষ্ট। তারা উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত
হয়, অর্থনীতির জন্য অশুভ কিছু হয় তারা চান না। এটাও তাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্য
থেকে স্পষ্ট হয়েছে। দেখার প্রয়োজন আছে, শ্রমিক লীগ এর পেছনে ইন্ধনদাতা হিসেবে কাজ
করছে কি না। কিংবা অন্য যে-কেউই হোক, তাদের চিহ্নিত করাও শ্রমপরিবেশ রক্ষার্থেই
প্রয়োজন বলে মনে করি। শ্রমিক নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী এ অস্থিতিশীলতার সঙ্গে
শ্রমিকরা জড়িত নয়। তারা বলছেন, শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে তারা মালিকপক্ষের সঙ্গে
আলোচনা করে তা নিরসন করেন, দাবিদাওয়া আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু এখন তৈরি পোশাক
শিল্পে যা চলছে তাকে শতভাগ শ্রমিকস্বার্থসংশ্লিষ্ট নয় বলেই অনেকে মনে করছেন। চলমান
অস্থিতিশীলতার খপ্পরে পড়ে ২ শতাধিক কারখানার উৎপাদন ও বিপনন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে
হয়।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ
(এমসিসিআই)-এর বরাত দিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, এ কারণে কমপক্ষে ৫ হাজার কোটি টাকার
ক্ষতি হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি কমে গেছে ১০%। শিপমেন্ট বাতিল হয়েছে অনেকের। বিজিএমইএ
নেতারা একের পর এক বৈঠক করছেন শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে। কোথাও কিছুটা সফল হওয়ার সঙ্গে
সঙ্গে আরেক জায়গায় শুরু হচ্ছে শ্রমিক অসন্তোষ। এমনও দেখা গেছে, কাজ করতে কারখানায়
ঢুকে সঙ্গে সঙ্গে তারা বেরিয়ে আসছে কারখানা থেকে। যুক্ত হচ্ছে আন্দোলনে। এমনিতেই
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে আওয়ামী লীগ সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখায়
কারখানাগুলো বিপুল পরিমাণ লোকসানের মুখে পড়েছে। তখন বায়ারদের সঙ্গে সাধারণ
যোগাযোগও ছিল না উৎপাদনকারীদের। ফলে অনেক অর্ডার এমনিতেই বাতিল হয়ে যায়। এখন
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ইন্টারনেট সুবিধা বাতিলের কারণে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার
কোনো পরিস্থিতি নেই। মালিকপক্ষ তাদের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে।
একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও তারা কথা বলছেন।
শ্রমিক-মালিকের দ্বন্দ্ব মেটাতে তৃতীয় পক্ষের অবস্থানই মূল কারণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ই বলা হয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে এ তৃতীয় শক্তিই বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় শ্রমিকদের ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করে থাকে। কিন্তু তারা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কিংবা শিল্পপরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা পালন করে কমই। তৈরি পোশাক শিল্পের দুরবস্থা নিরসনে শ্রমিক ও মালিক পক্ষকেই আন্তরিকতাসহ এগিয়ে আসতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারও চাইছে সুষ্ঠু শিল্পপরিবেশ বজায় থাকুক। অন্তত দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাক খাতটি নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাক। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তরিকতায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সহযোগীতা জরুরি। সরকারকে এ খাতটিকে যে কোনো চক্রান্ত থেকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে অধিকতর সজাগ হতে হবে।