মূল্যায়ন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১৪:১৭ পিএম
বয়স শতকের ঘর থেকে মাত্র ৫ অঙ্ক দূরে; কিন্তু গ্রন্থসংখ্যা শতকের ঘর অতিক্রম করেছে আরও আগেই। ১২ সেপ্টেম্বর তিনি অতিক্রম করলেন আরও একটি জন্মদিন। তিনি আহমদ রফিক, পরিচয় যার বহুমাত্রিক। ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, কবি, প্রাবন্ধিক সমান্তরালে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আহমদ রফিক বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন বটে, কিন্তু স্মৃতিশক্তি এখনও জেগে আছে অতন্দ্রপ্রহরীর মতো। সংখ্যায় তো বটেই, বিষয়বৈচিত্র্য ও গুণগত বিচারেও খ্যাত শতাধিক গ্রন্থের প্রণেতা আহমদ রফিক বাংলা সাহিত্যের অতিগুরুত্বপূর্ণ লেখক-গবেষক এবং আমাদের বাতিঘর।তিনি আমাদের গাণ্ডীব। রবীন্দ্রগবেষণায় তো বটেই, রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনে আহমদ রফিক নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন অকাতরে। বলা যায়, তিনি নিজেকে নিঃশেষ করে অন্যকে করেছেন অশেষ। দৃষ্টিশক্তিতে ক্ষয় ধরায় আমরা বঞ্চিত হচ্ছি তাঁর সৃষ্টি থেকে। এর সঙ্গে তিনি হারিয়েছেন তাঁর উপার্জনের মাধ্যমও।
ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, কবি, প্রাবন্ধিক ও ন্যায়ের পথে অবিচল এই মানুষের পরিচয় বহুমাত্রিক বটে; কিন্তু সবার আগে তিনি সামগ্রিকভাবে ঋদ্ধ ও অত্যন্ত বড় মাপের নির্মোহ একজন মানুষ, যে মানুষটি আমাদের সামনে পাহাড়সম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑরাষ্ট্র ও সমাজ তাকে কতটুকু দিয়েছে? গাণিতিক নয়, খুব স্বাভাবিক হিসাবেই আমাদের কাছে তাঁর পাওনা রয়েছে অফুরন্ত। আর কবে আমরা এ দায় মেটাব? যে সমাজে চাপা রব আছে চাই, আরও চাই; চাওয়ার কোনো শেষ নাই, সেখানে আহমদ রফিকের মতো একজন সর্বত্যাগী-দানকারী মানুষকে আজ নিজের ভার নিজে বইতে হচ্ছে বড় কষ্টে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী গৃহকর্মী চন্দ্রভানু আর ড্রাইভার কালাম ভাইয়ের পরিচর্যায় কাটছে তাঁর জীবন। তাঁর স্ত্রী প্রয়াত হয়েছেন প্রায় দুই যুগ আগে। কাছের বলতে আর কেউ নেই। এ অবস্থায় তাঁর দীর্ঘশ্বাস বেরোয় কখনও কখনওÑ‘এই জীবন কি চেয়েছিলাম?’
আহমদ রফিকের কর্মঅধ্যায় ও বিশাল সৃষ্টিভান্ডার নিয়ে আলোচনার যোগ্য আমি নই। প্রতি বছর এ দিনটিতে (অর্থাৎ তাঁর জন্মদিনে) কিছু না কিছু করি কিন্তু এবার অত্যন্ত যাতনাময় পরিস্থিতির কারণে তা পারিনি; এ অনুশোচনায় বড় বেশি কাতর হয়ে গেছি। প্রায় ৩০ বছর তাঁর সানিধ্য লাভ করে আছি। ব্যক্তিগত এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু যাঁর অপত্যমমত্ব মাথায় নিয়ে চলেছি তাঁকে এ দিনটিতে স্মরণ করতে পারিনি কোনো আয়োজনে; তা আমার কাছে বড় বেদনার। তাঁর সর্বশেষ বইটি (ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ কথা) তিনি আমাকে উৎসর্গ করেছেন। এ যে আমার কত বড় প্রাপ্তি তা তো শুধু আমিই জানি। সাহিত্যিক হিসেবে তিনি অসাধারণ রকমের সৃষ্টিশীল। কিন্তু ওই পরিচয়ের ভেতর আরও পরিচয় রয়েছে। প্রথম কথা, তিনি কেবল সাহিত্যিক নন, অঙ্গীকারবদ্ধ সাহিত্যিক। তাঁর অঙ্গীকার কেবল সাহিত্যের প্রতি নয়, সাহিত্যকে সামাজিক করে তোলার ব্যাপারেও। তাঁর সাহিত্যচর্চা সামাজিক অঙ্গীকারেরই অংশ।
ভাষা আন্দোলনের ভেতরে ছিল প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা। সে রাষ্ট্রের হওয়ার কথা ছিল যথার্থ অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ এবং নাগরিকদের ভেতরে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ওই প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য আবশ্যক ছিল একটি সামাজিক বিপ্লবের। আহমদ রফিক ভাষাসংগ্রামে যোগ দিয়েছেন সমাজবিপ্লবের স্বাপ্নিক হিসেবেই, এর চেয়ে খাটো কোনো লক্ষ্যে নয়। তিনি ছাত্র ছিলেন বিজ্ঞানের, অধ্যয়ন করেছেন চিকিৎসাবিদ্যা এবং পেশায় চিকিৎসক না হলেও পেশাজীবনে চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিজ্ঞানের গুণ হচ্ছে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ, সে গুণ দুটি তিনি নিয়ে এসেছেন তাঁর সাহিত্যচর্চায়। তাঁর সাহিত্যে দেখি নান্দনিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈজ্ঞানিকতা। নান্দনিকতা ও বৈজ্ঞানিকতার ভেতরে একটা বিরোধ আছে, থাকবারই কথা; কিন্তু ওই দুটি যখন নান্দনিক সৃষ্টিশীলতার ভেতরে একত্র হয় একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে, ওই সম্পর্ক সমৃদ্ধ করে সৃষ্টির নান্দনিকতাকে।
আমরা জানি, মানুষ জন্মগ্রহণ করলে তার মৃত্যু একদিন অবধারিত। এ নশ্বর দেহ মানুষকে ছেড়ে যেতে হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেহের বিনাশই যে চিরমৃত্যু নয়, এ কথা আজ মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত। এর বিস্তর নজির রয়েছে আমাদের সামনে। আমরা এও জানি, সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে দৈহিক মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই। সভ্যতা বলে যে ধারণাটি আমরা মানি, তার পেছনে আছে মানুষের বেঁচে থাকা। চিরজীবিতরাই সভ্যতা নির্মাণ করেছিলেন এবং করছেন। সেদিক থেকে চিন্তা করলে খুব কম লোকই শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে। যারা এর মধ্যে বেঁচে আছেন ও থাকবেন আহমদ রফিকও থাকবেন সে কাতারে। আহমদ রফিকÑসংগ্রামে, সৃজনে ও মননে এক অনন্য বাঙালি মনীষা। তাঁর সৃষ্টিজগৎ বিশাল ও বহুমাত্রিক। মুক্ত ও প্রগতিশীল চেতনার ধারক ও বাহক হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম ও খাঁটি বাঙালিত্ব অর্জনের সাধনাই ছিল তাঁর একমাত্র ব্রত ও আজন্ম স্বপ্ন।
আহমদ রফিক আলোর লড়াইয়ের পথে একজন জীবনজয়ী সৈনিক। ব্রিটিশ, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ-এ তিনটি সময় প্রত্যক্ষ করেছেন। আহমদ রফিকের রবীন্দ্রচর্চা কেবল গ্রন্থগত পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ‘রবীন্দ্র চর্চা কেন্দ্র ট্রাস্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা, রবীন্দ্রচর্চা পত্রিকার সম্পাদক। নওগাঁর পতিসরে রবীন্দ্র-স্মৃতিস্থান পুনরুদ্ধার-প্রয়াসের এ পুরোধা একজীবনের রবীন্দ্রচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি (১৯৯৫) আর বাংলা একাডেমির ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ (২০১১)-এ ভূষিত হন। পেয়েছেন একুশে পদকও। কিন্তু তাঁর প্রাপ্য রয়ে গেছে আরও অনেক , তা আবারও বলি। তাঁর জীবনের অপরাহ্ণে অন্তত সেই প্রাপ্যটুকু রাষ্ট্রশক্তি দিক। তাঁর আর্থিক ও চিকিৎসাসংক্রান্ত নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করি। কয়েক মাস আগে তিনি ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি জীবনযাপনে এর ফলে কিছুটা শক্তি পেয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের কর্তব্য বিলম্বে হলেও রাষ্ট্রশক্তি পালন করুক। তাঁর দানের কোনো প্রতিদান নয়, এটুকু তাঁর নিশ্চয় পাওনা। তাঁকে যেন আর বঞ্চিত করা না হয়। তাঁর শতায়ু কামনা করি।
পঁচানব্বইতম জন্মবার্ষিকে তাঁকে প্রণতি, বারবার প্রণতি।