× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

শাসনব্যবস্থা

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও জনগণতান্ত্রিক সরকার চাই

মযহারুল ইসলাম বাবলা

প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:১৪ এএম

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ০৮:১৭ এএম

মযহারুল ইসলাম বাবলা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশে একটি পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে। দেশ-জাতি নতুন আশায় আশান্বিত হয়েছে বটে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কোনো পরিবর্তন এখন পর্যন্ত সমাজজীবনে প্রতিফলিত হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ট্রাফিক পুলিশের পর্যাপ্ত উপস্থিতি নেই। তাই ঘটছে হরেক অরাজক পরিস্থিতি। ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ, গণপিটুনিতে হত্যাকাণ্ড ভয়ানক রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতি সমাজের চরম অসহিষ্ণুতার সাক্ষ্য বহন করে। তাছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গণমামলা, হামলা, ভাঙচুর ও অন্যভাবেও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুপস্থিতিতে ব্যক্তিগত শত্রুতারও সুযোগের হাতছাড়া করছে না অনেকে। সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নেই। মূল বা ভিআইপি সড়কেও যানজট লেগেই থাকে। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত বেড়িবাঁধের রাস্তায় হেন কোনো যান নেই যা চলাচল করে না। কিন্তু ট্রাফিকব্যবস্থা বলে সেখানে কিছু নেই। তাই যানজটে নাকাল সব যানবাহন।

ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটো, টেম্পোয় ছেয়ে গেছে ঢাকা শহর। আগে এগুলো সীমিত পরিসরে চলাচল করলেও ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটো সরকার বন্ধ করার ঘোষণার পর বিগত সরকার চালকদের আন্দোলনের মুখে ব্যাটারিচালিত যান চলাচলের অনুমতি দেওয়ার ফলে সীমিত পরিসর ছেড়ে এখন সারা ঢাকা শহরে অবাধে চলাচল করছে ব্যাটারিচালিত সব ধরনের যান। এরা নিজেদের ভারী যান্ত্রিক যান ভেবে সব ধরনের যান্ত্রিক যানকে ওভারটেক করে যাত্রীদের প্রবল ঝুঁকির কবলে ফেলতেও দ্বিধা করে না। এদের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। নেই চলাচলের সরকারি অনুমোদন। সড়কে অপ্রতুল ট্রাফিক থাকায় তারা সিগন্যাল পর্যন্ত মানে না। সড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বলতে কার্যত এখন কিছুই নেই, এ অভিযোগ অনেকের।

বিগত সরকার তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে একটি ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক দলকে সমঝোতার মাধ্যমে পক্ষে টেনে নিয়েছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন করেছিল। শিক্ষাক্রম, সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তকে নানা সংস্কার করে তাদের দাবি পূরণ করেছিল। সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল দেশজ ঐতিহ্যপূর্ণ যাত্রা, মেলা, নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণে। লোকমুখে প্রচারিতÑতাদের শীর্ষস্থানীয় নেতার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের দূতিয়ালিতে তাদের সরকারবিরোধী অবস্থান থেকে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল। পাশাপাশি রেলওয়ের প্রচুর জায়গাও তাদের অনুকূলে প্রদানের কথা শোনা গিয়েছিল। দূতিয়ালির পুরস্কার হিসেবে ড. হাছান মাহমুদকে পররাষ্ট্র মন্ত্রিত্ব পর্যন্ত উপহার দেওয়া হয়েছিল। পক্ষান্তরে ওই ধর্মাশ্রয়ী দলের নেতারা সন্তুষ্টচিত্তে শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ খেতাবে ভূষিত করেছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের মাথায় বাঁধা ছিল বাংলাদেশের পতাকা। কণ্ঠে ছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, ডি এল রায়, অতুলপ্রসাদ, মোহিনী চৌধুরী, সলিল চৌধুরীদের আগুনঝরা সব গান। এমনকি স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রচারিত গানও তারা সমবেতভাবে গেয়েছিল। গেয়েছিল জাতীয় সংগীতও।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এক দফায় পরিণত হয় এবং আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিলে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পতনের পর আন্দোলনকারীরা দেশের সংবিধানকে গণতন্ত্রায়ণের দাবি তোলে। একটি পক্ষ অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই দাবি তোলে জাতীয় সংগীত ও জাতীয় পতাকা পরিবর্তনের। ছাত্র-জনতার সম্মিলিত প্রতিবাদে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়িত হতে পারেনি। তাদের দাবির বিষয়টি যতটা না যৌক্তিক তার চেয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিটি অধিক মাত্রায় প্রাসঙ্গিক বলেই মনে করি। স্বীকার করতেই হবে আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত জাতীয় সংগীত ও পতাকা। আমাদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি ছিল এবং ওই প্রস্তুতিতে ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ থেকে বাঙালির দেশাত্মবোধক যত ধরনের গান ছিল তার পাশাপাশি নতুন নতুন গানও পরিবেশিত হতো।

আন্দোলনকারীদের একাত্তরের অভিজ্ঞতা না থাকারই কথা। মুক্তিযুদ্ধের আগে দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রামের সময় তাদের জন্মও হয়নি। তাদের কাছে ২০২৪-এর আন্দোলন এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের বিষয়টিই প্রধান বিবেচ্য নিশ্চয়ই। কিন্তু যে পাকিস্তানি উপনিবেশ থেকে মুক্ত হতে কত ত্যাগ, লাখ লাখ মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল, লাখ লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছিল; ওই পতাকা এবং জাতীয় সংগীত আমাদের স্বাধীনতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ সুযোগের মওকায় যারা দাবি তুলছে, তারা কারা? তাদের তো আমরা জানি, চিনি। এসব করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। এ অন্তর্বর্তী সরকারকে শৃঙ্খলা ফেরাতে মনোযোগ আরও গভীর করতে হবে।

আইয়ুব খানের শাসনামলে রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা চলেছিল। কিন্তু দেশের সমষ্টিগত মানুষ তা রুখে দিয়েছিল। বাংলা বর্ণমালা দিয়ে ভিন্ন ভাষারও অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেটাও সফল হয়নি। অথচ স্বাধীন দেশে অতীত পাকিস্তানি আমলের অভিন্ন দাবির যে পাঁয়তারা চলছে সেটাও জনগণের প্রতিরোধে মুখ থুবড়ে পড়বে। কেননা এ জাতি ধর্মীয় জাতীয়তা পরিত্যাগে ভাষিক জাতীয়তাবাদকে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপরই গ্রহণ করেছিল বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বর্তমান সরকারের আগমনের পর মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার ঘটেছে। বেড়েছে প্রত্যাশা। মানুষ যেমন স্বাধীনতা চায়, তেমন চায় মুক্তিও। বিগত ৫৩ বছর দেশে গণতন্ত্র অধরাই ছিল। মানুষের জীবন ছিল রাজতান্ত্রিক শাসনামলের প্রজাস্বরূপ। আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক নামেই তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কেন? রাজা-প্রজা দেশের প্রাতিষ্ঠানিক নামে থাকলে তার প্রভাবমুক্ত হব কীভাবে? হওয়া আবশ্যক ছিল জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। কিন্তু প্রজা শব্দের ব্যবহারে রাজা ও প্রজার বিষয়টি যেমন রয়েছে আমাদের শাসক সংস্কৃতিতে, তেমন দেশের সংবিধানেও। সংবিধানে লেখা আছে, এই রাষ্ট্রের মালিক রাষ্ট্রের জনগণ। আবার এটাও লেখা রয়েছে, রাষ্ট্রের সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী সরকারের প্রধান নির্বাহী। এসব স্ববিরোধী বিষয়ের অবসান চাই। চাই সংবিধানকে গণতন্ত্রায়ণ করাও। আমরা শক্তিশালী রাষ্ট্রের বিপরীতে শক্তিশালী সমাজ চাইব যাতে রাষ্ট্র সাবেকি আমলের ধারাবাহিকতায় জনগণের ওপর কর্তৃত্ব, নিপীড়ন করা থেকে বিরত থাকতে পারে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল আওয়াজ সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা চাই। সমাজে ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সকল প্রকার বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে সব মানুষের সমঅধিকার, সমমর্যাদার বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বেগবান হোক। অর্থাৎ একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেমন চাই, তেমন চাই জনগণতান্ত্রিক সরকারও। তবে সবার আগে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে শৃঙ্খলা। জননিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অনেক কিছু ভেস্তে যাবে।

  • নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা