সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৪ ০৮:২৩ এএম
দেশে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি যে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে এর
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশের পূর্বাঞ্চলীয়
১১ জেলায় চলমান বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কোনো কোনো অঞ্চলে বন্যার
পানি ধীরগতিতে নামতে শুরু করেছে এবং একই সঙ্গে বন্যায় সৃষ্ট বহুমাত্রিক ক্ষতও দৃশ্যমান
হয়ে উঠছে। আমরা জানি, প্রায় প্রতিটি প্রাকৃতিক দুর্যোগেই ক্ষয়ক্ষতি জনজীবনে যে দুর্ভোগের
সৃষ্টি করে তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে। এবারের বন্যা পরিস্থিতিও এর বাইরে নয়। সংবাদমাধ্যমে
বলা হয়েছে, অবকাঠামোগত ক্ষতি অন্যান্যবারের তুলনায় এবার অনেকটা বেশিই হয়েছে। সড়ক অবকাঠামো
অনেক ক্ষেত্রেই ভেঙে পড়েছে এবং ফসলের মাঠসহ সহায়-সম্পদ অনেককিছু বন্যার গ্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত মাসের শুরুতে ফেনীর কিছু এলাকায়
বন্যা দেখা দিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তা স্মরণকালের রেকর্ড-বন্যা হিসেবে প্রত্যক্ষ করল
জেলাটির মানুষ।
বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে প্রাত্যহিক কর্মচাঞ্চল্যের বহু ক্ষেত্র এখনও
বানের জলে থইথই। ঘরবাড়ি ছেড়ে অসংখ্য মানুষ পাড়ি জমান আশ্রয়কেন্দ্রে। কেউ কেউ আবার আশ্রয়
নিয়েছেন বহুতল বাসাবাড়ির ছাদে। বিপর্যস্ত জীবনের সবটাই কতটা এলোমেলো হয়ে পড়েছে এরও
ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, দেশের প্রায় অর্ধকোটি
মানুষেরও বেশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা ২৭। বিনষ্ট
হয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং এর ফলে মানুষের জীবনে বাড়তি সংকট সৃষ্টি করেছে। পূর্বাঞ্চলীয়
জেলাগুলো ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের আরও অনেক জেলা বন্যাক্রান্ত হওয়ায় চিরচেনা অবকাঠামোর
অনেক কিছুই অচেনা হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নানাবিধ অনিরাপত্তার মাঝেই বিপন্ন-বিপর্যস্ত
মানুষ জীবনটাকে আবার স্বাভাবিক করে তোলার প্রয়াস চালাচ্ছেন। এবারের দুর্যোগে মানবিক
সহায়তা এবং যূথবদ্ধভাবে বিপন্ন মানুষদের উদ্ধার ও তাদের মাঝে ত্রাণকার্য পরিচালনায়
এক অভূতপূর্ব দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা জানি, বন্যা-উত্তর পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্যের
নানারকম সংকট দেখা দেয়। এবারও ইতোমধ্যে তা পরিলক্ষিত হয়েছে এবং ক্রমেই এই পরিস্থিতি
আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় বন্যা-উত্তর জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায়
ভিন্ন ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সুনির্দিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্রগুলো ছাড়াও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যার্তদের
আশ্রয়ের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর মতো
উপযোগিতা হারিয়েছে এবং এই প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে বিশেষ
কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়া বসতভিটে নতুন করে নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা
অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, বন্যার গ্রাস মানুষের সামর্থ্য
কেড়ে নেওয়ায় এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সাহায্য-সহযোগিতার বিষয়টি অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বন্যার পর অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ক্রমেই স্ফীত হয়ে উঠতে
থাকে। বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে অবকাঠামোর এই ক্ষয়ক্ষতি মানুষকে নতুন করে আরেক ধরনের
সংকটের মুখোমুখি করে। দেশের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের কয়েকটি জেলাও বন্যাক্রান্ত
হয় এবং মানুষের দুর্দশা প্রকট হয়ে ওঠে। অনেক জেলায় এখনও বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত
রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের ১৬টি নদ-নদীর পানিবৃদ্ধির পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাঙন মানুষকে
উদ্বাস্তু করছে। আমাদের দেশে দুর্যোগের মাত্রা নিরূপণ করা হয় প্রাণহানির সংখ্যার নিরিখে,
যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি, মানুষের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত
সরকারি কর্তৃপক্ষ কোনো দুর্যোগকে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে চায় না। তবে এবার
এর ব্যতিক্রম দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা দেখেছি, সরকারি পর্যায়ে তো বটেই বেসরকারি
পর্যায়ের পাশাপাশি ব্যক্তি এবং সামাজিক উদ্যোগে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ফলে ক্ষয়ক্ষতি
অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। সংবাদমাধ্যমে
এও উঠে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রেই ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পানি নিষ্কাশন
ব্যবস্থায় ঘাটতি থাকায় পানি নামছে ধীরে ধীরে। বন্যা-উত্তর পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের
সবার আগে বসতভিটে ঠিক করার পাশাপাশি অবকাঠামোগত অন্যান্য দিকে নজর গভীর করার প্রয়োজন।
এবার আকস্মিক বন্যা যে একটা বড় দুর্যোগ আকারে এসেছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও ব্যাপক হতে
পারে এটা উপলব্ধি করা দরকার। এই অভিজ্ঞতা থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুতি
রাখাও বাঞ্ছনীয়। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সুচারু না হওয়ার কারণে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির
চিত্র স্ফীত হয়েছে। এ দিকটায় বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি বলে আমরা মনে করি। আমরা মনে করি,
অবকাঠামোগত সংস্কার অনিষ্পন্ন রেখে পরবর্তী কার্যক্রমের পথ সুগম করা কঠিন।