পরিপ্রেক্ষিত
অলিউর রহমান ফিরোজ
প্রকাশ : ১৬ আগস্ট ২০২৪ ১৪:৪৯ পিএম
আবার সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনা ঘটল। গত ১১ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওয়াহেদপুর সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের গুলিতে আব্দুল্লাহ নামের একজন নিহত হন। তাদের হাতে আমাদের কৃষক, জেলে, রাখাল ও চোরাকারবারিরা সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হন। এই বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে অনেক সময় মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোকে সরব হতে দেখা গেলেও ভারত সরকার তা কখনোই কর্ণপাত করেনি। আমাদের সীমান্তের ভেতরে ঢুকে কিছু দিন আগে একজন কৃষককে ডাকেন বিএসএফ সদস্যরা। তিনি সরল মনে তাদের দিকে এগিয়ে গেলে তাকে গুলি করে আহত করে বিএসএফ। ঘটনাটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০১১ সালে ফেলানী হত্যার ঘটনায় উভয় দেশেই ব্যাপক সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার কথাও বলা হয়েছিল তখন। সে লক্ষ্যে তখন বিএসএফকে রাবারের গুলি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সে সময়ে কিছুদিন সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ থাকলেও তা আবার ফিরে এসেছে। সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক প্রায়ই বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যার ঘটনা ঘটছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সীমান্তে যদিও গরু চোরাচালানেই বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে, তারপরও অযাচিতভাবে আমাদের সীমান্তের ভেতরে প্রবেশ করে নিরীহ কৃষকের ওপর গুলি চালানোর ঘটনাও ঘটছে। হতাহতদের লাশও নিয়ে যাচ্ছে বিএসএফ জোয়ানরা। অনেক ক্ষেত্রে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমেও লাশ সহজে ফেরত পাওয়া যায় না। সীমান্ত চোরাচালান থামাতে উভয় দেশই আন্তরিক। কিন্তু চোরাচালান থামানোর নামে বিনা বিচারে কেন বারবার হত্যাকাণ্ড ঘটানো হবে? বিশ্বের কোথাও ভারত সীমান্তের মতো নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয় না।
বিএসএফকে মনে রাখতে হবে চোরাচালানি আর সীমান্তের সাধারণ মানুষকে এই পাল্লায় মাপা যায় না। সীমান্তে অনেক ঘটন-অঘটন হলেও দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জোরদার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করা হয় না। তাই আমাদের কৃষক, জেলে আর রাখাল প্রতিনিয়ত ভারতের সীমান্তরক্ষীদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছেন। সীমান্ত হত্যাকাণ্ড নিয়ে উভয় দেশের উচ্চপর্যায়ে অনেকবার বৈঠক হলেও তাতে কোনো ফলপ্রসূ হয়নি। প্রতিবার ভারতের তরফে আশ্বাস মিলেছে, কিন্তু অবস্থা যে পাল্টায়নি তা পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক তথ্য মতে, ২০০৯ সালে ৬৬ জন, ২০১০ সালে ৫৫ জন, ২০১১ সালে ২৪ জন, ২০১২ সালে ২৪ জন, ২০১৩ সালে ১৮ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৪৬ জন, ২০১৬ সালে ৩১ জন, ২০১৭ সালে ২৪ জন, ২০১৮ সালে ১৪ জন, ২০১৯ সালে ৪৩ জন, ২০২০ সালে ৫১ জন, ২০২১ সালে ২৩ জন, ২০২২ সালে ৩০ জন, ২০২৩ সালে ১৭ জনকে বিএসএফ গুলি চালিয়ে হত্যা করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সীমান্তে আমাদের জোয়ানদের পিঠ না দেখানোর জন্য বলেছেন। আমরা শান্তি চাই, আমরা চাই উভয় দেশই দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সীমান্তে হত্যার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে। আমরা চোরাচালানের বিপক্ষে। আমরা চাই, চোরাকারবারিদের গুলি চালিয়ে হত্যা না করে তাদের প্রচলিত আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। অপরাধী তার অপরাধের সাজা ভোগ করবে। কিন্তু নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে না। এ বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে হবে। রাষ্ট্রের নীরবতা এক্ষেত্রে কাম্য নয়। সীমান্তে হত্যা শূন্যে নেমে এলেই উভয় দেশের পারস্পরিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর পাঠক
মুন্সীগঞ্জ