প্রত্যাশা
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৪ ১১:৫২ এএম
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
মান্যবর আসিফ
নজরুল আপনি একজন জ্ঞানী অধ্যাপক, লেখক ও সুবক্তা। আপনার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যে আকৃষ্ট
হয়ে আজকের এ খোলা চিঠি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বয়স্ক প্রাক্তন ছাত্র। ১৯৬২
সালের ১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুববিরোধী মিছিল থেকে শুরু করে ১৯৬৪ সালের সমাবর্তন সভার আন্দোলন
পর্যন্ত সব কিছু প্রত্যক্ষ করেছি। অতিসম্প্রতি আমার স্ত্রীকে হারিয়েছি। তিনি জান্নাতবাসী
হয়েছেন (২৮ মে, ২০২৪)। এ মানসিক অবস্থার মধ্যে সম্প্রতি যে ভয়াবহ ঘটনাপ্রবাহ দেখলাম
তা সহ্য করা কঠিন ছিল। ইতিহাসে পড়েছি, এক ব্যক্তির ক্ষমতার লোভ লাখো প্রাণ হরণ করে,
অনেক সম্পদ ধ্বংস করে। জীবনসায়াহ্নে এসে তো সেই দৃশ্য দেখতে হলো। ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি
করতাম। প্রশিক্ষণের সময় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আমাদের শিক্ষা দেওয়া হতো গুলি
করতে হলে হাঁটুর নিচে করতে হবে। এবারে দেখলাম বহুতল বাড়ির চার তলায় বাবার কোলে শিশু
গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেল। এতে মনে হলো গুলি চালানোর এক মহোৎসব উদ্যাপিত হয়েছে। অনেক
কাহিনী পড়তে গিয়ে চোখ ঝাপসে গেছে আবার অনেক সময় আর পড়তে পারিনি। আবু সাঈদের হত্যাকে
মনে হয়েছে এটা বোধ হয় হত্যা নয়, কল্পকাহিনী। কিন্তু বাস্তবে দেশের ইতিহাসে চরম নারকীয়
হত্যাকাণ্ড ঘটে গেল।
সম্মানিত উপদেষ্টা
ও অধ্যাপক পরম আল্লাহ আপনাকে এক মহান দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রশিক্ষণের
সময় জেনেছিলাম, ১ হাজার অপরাধী ছাড়া পাক কিন্তু একজন নিরপরাধ ব্যক্তি যেন শাস্তি না
পায়। আরও শিখেছিলাম, অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব অভিযোগকারীর। এখন এসব কথা ফিকে হয়ে গেছে।
সম্ভবত সিআরপিসির ১৬৭ ধারায় আইন প্রয়োগকারীর হাতে রিমান্ডে নেওয়ার নামে অভিযুক্তকে
তুলে দেওয়ার বিধান রয়েছে। সিআরপিসি ব্রিটিশ আমলে তৈরি, যখন তারা ছিল আমাদের প্রভু আর
এ দেশের নাগরিকরা ছিল ভৃত্য। সে বিধানই অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলা হচ্ছে। আর রিমান্ডের
নামে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর যে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয় তা কল্পনাও করা যায় না।
এমনকি সিনিয়র, সুশিক্ষিত এবং জনগণের প্রিয় রাজনীতিবিদকেও রেহাই দেওয়া হয় না।
মানুষ আশরাফুল
মাখলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব। সেই মানুষের ওপর মানুষ যে অত্যাচার করে অন্য কোনো প্রাণীর
এ রকম আচরণ দেখা যায় না। অতএব আমার অনুরোধ, আপনি এ বিধানটি তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তকারী সংস্থা ব্যাপক তদন্ত করে তথ্য সংগ্রহ করবে। তাকে
অমানুষিক নির্যাতন করার অধিকার দেওয়া যায় না। আর রিমান্ডে নিয়ে কী তথ্য বের করবেন তার
কাছ থেকে? সাম্প্রতিক বেশ কিছু স্থাপনা ধ্বংসের ব্যাপারে বিরোধী দলের অনেক রাজনীতিককে
অভিযুক্ত করা হলো এবং সাত থেকে ১০ দিন পর্যন্ত রিমান্ড মঞ্জুর করলেন আদালত। শুনেছি
একজন অভিযুক্তকে নিয়ে ফুটবল খেলা হয়েছে। অর্থাৎ তাকে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করা
হয়েছে। আপনারা খণ্ডকালীন সময়ের জন্য এসেছেন। হয়তো দেখা যাবে যে একদল আঁতেল বক্তব্য
দেবেন এসব পরিবর্তন নির্বাচিত সরকার এসে করবে। আমরা গত ৫২ বছরে বিভিন্ন নির্বাচিত সরকার
দেখেছি। নির্বাচনের আগে অত্যন্ত সুন্দর ওয়াদা করা হয়। নির্বাচনের পর তা হিমাগারে পাঠানো
হয়।
বাংলাদেশের
রাজনীতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, রাজনৈতিক দলগুলো রাজকীয় সিন্ড্রোমে আক্রান্ত। অর্থাৎ
যিনি দলীয় প্রধান হন তিনি আর পদটি ছাড়েন না। খুব বেশি হলে তার উত্তরাধিকারীকে দিয়ে
যান। ফলে এখানে স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে রাজনৈতিক দলীয় প্রধানদের আমরা স্বৈরাচার হিসেবে
দেখেছি কম অথবা বেশি।
এবার ইতিহাসে অন্যতম স্বৈরাচারকে দেখলাম, যার স্থান এ তালিকার প্রথম দিকে থাকবে।
সংবিধান তো একটা অজুহাত, নিজেদের সুবিধার্থে রাজনীতিকরা এর নাম নেন। সামরিক আইন জারি
হলে সংবিধানের কোন ধারায় প্রধান বিচারপতি সামরিক শাসকের শপথ গ্রহণ করান? এবারের অন্তর্বর্তী
সরকার ছাত্র-জনতার বিপ্লবের ফসল অর্থাৎ জনগণের সরকার। জনগণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। জনগণের
জন্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। অতএব আপনাদের একদিকে পবিত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য
যে, জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থায় জনগণকে নির্যাতন থেকে রেহাই দেওয়ার জন্য যেসব ব্যবস্থা
নেওয়া প্রয়োজন তা আপনারা নেবেন।
যারা শহীদ হয়েছেন
তারা আপনাদেরই সেই দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আমরা লক্ষ করছি, রাজনীতিবিদরা নির্বাচন নির্বাচন
করে অস্থির রয়েছেন। শহীদদের বাবা-মার চোখের জল শুকায়নি। বুকের জ্বালা থামেনি। অবশ্য
এ অঞ্চলের মানুষ নির্বাচনপাগল। ১৯৭১-এ যখন গণহত্যা চলছিল, দেশের সবকিছু পুড়িয়ে দেওয়া
হচ্ছিল তখন পাকিস্তানি বাহিনী উপনির্বাচনের আয়োজন করেছিল এবং সে ক্ষেত্রেও প্রার্থীর
সংখ্যা কম হয়নি। নির্বাচন করে তারা আমাদের কোন স্বর্গে নিয়ে যাবেন জানি না। তারা আসুন
এবং মানুষের কল্যাণ করবেন এ আশা করি। এই যে মহান বিপ্লব সাধিত হলো এ থেকে কিছু শিক্ষা
তারা নেবেন কি না জানি না। আপনি তো আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এবং বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের
সঙ্গে আপনার যোগাযোগের বিস্তর সুযোগও রয়েছে, দায়িত্বও রয়েছে।
মুনসেফ কথাটা
ইনসাফ থেকে এসেছে অর্থাৎ ইনসাফ করা তাদের দায়িত্ব। নিজের ঢোল নিজে একটু পেটাতে চাই।
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থানার ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালে ২৬ মার্চ, ১৯৭১-এর সকালে সংবাদ শোনার
পর জনসভা করে সেখানে ঘোষণা দিয়েছিলাম, আজ থেকে পাকিস্তানের কর্মকর্তা নই। এ কথাটি মুক্তিযুদ্ধ
জ্ঞানকোষে লেখা হয়েছে। এ ছাড়া মুজিবনগর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিবের
দায়িত্ব পালন করেছি। বলতে চাই, এখন যেভাবে রাজনীতিবিদদের জামিন না দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো
হচ্ছে, পাকিস্তান আমলে এ অবস্থা থাকলে শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হতে পারতেন কি না সে ব্যাপারে
সন্দেহ প্রকাশ করার অবকাশ রয়েছে। তিনি বিকালে সভা করেছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন, পরদিন
আদালত জামিন দিয়েছেন আবার পরবর্তী দিন বিকালে সভা করেছেন।
মান্যবর উপদেষ্টা, আগেই বলেছি; আপনি অত্যন্ত জ্ঞানী ব্যক্তি। আপনাকে কিছু বোঝানোর ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি একজন অতি সাধারণ নাগরিক। অত্যন্ত মনের ব্যথায় এ পত্রটি আপনাকে লিখলাম। আশা করি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনার ও আপনাদের সাফল্য কামনা করি।