সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩৩ এএম
দীর্ঘদিন ধরে বাজারের অস্থিতিশীলতা ফিরে ফিরে সংবাদমাধ্যমে আসছে।
ভোগ্যপণ্য নিয়ে অসাধুদের কারসাজির শেষ নেই। এর মধ্যে চালবাজদের চাল নিয়ে চালবাজি চলছে
ভিন্ন কৌশলে। ৩ আগস্ট প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুযোগ পেলেই
চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হাতেগোনা কয়েকটি
কোম্পানি ছাড়া কেউ চালের বস্তার গায়ে নাম লেখে না। আবার যে প্রতিষ্ঠানগুলো লেখে তারাও
সব সময় তা করে না এবং লিখলেও অনেক সময় তা থাকে অস্পষ্ট। অথচ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা
রয়েছে চালের বস্তায় দাম লেখার। আড়তদাররা এও জানিয়েছেন, সবগুলো মিলার বস্তার গায়ে নাম
না লেখার কারণে তারা ভোগান্তিতে পড়েন। এজন্য প্রায়ই তাদেরকে ক্রেতাদের প্রশ্নের মুখে
পড়তে হয়। তাদের আরও ভাষ্য, গায়ে দাম উল্লেখ না থাকায় যে যার মতো করে বাড়িয়ে দেন চালের
দাম।
সাম্প্রতিক সহিংসতায় সৃষ্ট বিদ্যমান পরিস্থিতিতে পরিবহন সংকট দেখিয়ে
চালের বস্তাপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন মিলাররা। আড়তদারদের মজুদ থাকা
চালের দামও বেড়ে গেছে এই অজুহাতে। আমরা জানি, গত ফেব্রুয়ারি মাসে চালের বস্তার গায়ে
দামসহ অন্যান্য তথ্য লেখার নির্দেশনা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। প্রজ্ঞাপনে
স্পষ্টতই বলা হয়েছে, চালের বস্তায় ধানের জাত ও মিল রেখে দাম লিখতে হবে। সেইসঙ্গে উৎপাদনের
তারিখ ও কোম্পানির নাম-ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে। এমনকি উল্লেখ করতে হবে, ওজনের তথ্যও।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে বরাবরই অমিল রয়েছে। অভিযোগ আছে, উৎপাদনের তারিখও
সব সময় পিছিয়ে দেখানো হয়। চাল নিয়ে মিলগেট থেকে শুরু করে আড়তদার এমনকি কোনো কোনো খুচরা
ব্যবসায়ীর চালবাজির প্রবণতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান।
আমরা দেখছি, অনেকক্ষেত্রেই সরবরাহ ব্যবস্থায় নানাবিধ বিঘ্ন দেখিয়ে
এবং যেকোনো সংকটকে পুঁজি করে নিত্যপণ্যের দাম অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামাফিক বাড়িয়ে দেন
এবং বিশেষ করে চালের ক্ষেত্রে এমনটি তুলনামূলক বেশি ঘটে থাকে। খুচরা ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের
সঙ্গে আড়তদার-মজুদদার কিংবা মিলারদের বক্তব্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। আমরা জানি, বিভিন্ন
অজুহাতে মিলার পর্যায়ে চালের দাম বাড়ানোর বিষয়টি বহুল আলোচিত এবং এবারও চলমান সংকটে
এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
চালের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়েন নিম্ন আয়ের মানুষেরা।
আমরা দেখেছি, কিছুদিন আগে যখন পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক ছিল তখনও হঠাৎ চালের দাম কোনো
কারণ ছাড়াই হঠাৎ বেড়ে গেল। বাজার বিশ্লেষকরা এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মিলার এবং
আড়তদারদের মধ্যে যোগসাজশের বিষয়টি খুঁজে পেয়েছেন।
সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ এমনিতেই পরিবারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
দরিদ্র পরিবারের অনেকে ঋণ করে ব্যয় মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এ অবস্থায় হঠাৎ যদি চালসহ
নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়, তাহলে সীমিত আয়ের ও দরিদ্র পরিবারে কী দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়
তা সহজেই অনুমেয়। নিকট অতীতে এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বলেছিলাম, চাল নিয়ে চালবাজি
থামাতে হলে নজর দিতে হবে উৎসে।
চাল আমাদের প্রধান খাদ্যপণ্য। আমাদের সমাজে ‘মোটা ভাত, মোটা কাপড়’Ñ
এই প্রবাদটি বহুল প্রচলিত। কিন্তু আমরা দেখছি, মোটা ভাত কিংবা মোটা কাপড়Ñ এই দুইই মোট
জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশের পক্ষে জোগাড় করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের স্মরণে আছে,
বিগত সরকারের বাণিজ্য, খাদ্য, কৃষি ও পরিকল্পনামন্ত্রীসহ দায়িত্বশীল অনেকেই বাজারের
সিন্ডিকেটের কারসাজির কথা অকপটে স্বীকার করেছেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট নিয়ে
তাদের বক্তব্য যেন ওই স্বেচ্ছাচারী-লুটেরাদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের মতো মনে হয়েছে।
এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা এও বলেছিলাম, সিন্ডিকেটের হাত আইনের হাতের চেয়ে কোনোভাবেই
শক্তিশালী হতে পারে না। আমরা এই প্রশ্নও বহুবার উত্থাপন করেছি, সিন্ডিকেটের শেকড় কি
এতই গভীরে প্রথিত যে, এর মূল উৎপাটন করা যায় না?
কেন মিলাররা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মানছেন না, কেন তারা বস্তার
গায়ে দামসহ আনুষঙ্গিক সব তথ্যের উল্লেখ থাকার কথা থাকলেও তা করছেন না এজন্য তাদের কাছে
সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা আশা করি, চলমান সংকটকে
পুঁজি করে, যারা চালের দাম ফের আরেক দফা বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ
ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। চালসহ নিত্যপণ্যের দামে স্বস্তি ফেরানোর দায় অবশ্যই সরকারের।