প্রেক্ষাপট
রাসেল আদিত্য
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১১:০৭ এএম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৪ ১২:৪৪ পিএম
আমি এক অসহায়
বাবা। নির্দিষ্ট কাউকে নয়, বরং যিনি এ খোলা চিঠি পড়ছেন, তাকেই লিখছি। কোমলমতি এক শিশুকে
বাঁচাতে এ চিঠি। গত ১২ জুন থেকে আমার মেয়ে মরিয়াম আফনান রাহা ইসলাম নিখোঁজ। ১৭ আগস্ট
ওর ১২ বছর পূর্ণ হবে। সব জায়গায় খুঁজেও না পেয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি
করি। এরপর ১৪ জুন মধ্যরাতের পরে আমার নম্বরে একটি কল আসে। কলকারী জানতে চান, মরিয়ম
আফনান রাহা আপনার কী হয়? বলি, আমার মেয়ে। কোথায় সে? উনি বলেন, ‘আপনার মেয়ে আমাদের কাছে।
মেয়ে অনেক সৌভাগ্যবতী ও সাহসী। কল্পনাও করতে পারবেন না, আপনার মেয়ে কত বড় বিপদের হাত
থেকে বেঁচে গেছে। সে আন্তর্জাতিক নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের কবল থেকে সাহসিকতা ও
বুদ্ধির জোরে বেঁচে গেছে।’ আমি কলকারীর পরিচয় জানতে চাই। তিনি বলেন, ‘আমি আসাম বনগাইগাঁও
রেলওয়ে পুলিশের এএসআই বলছি। চারজন রুটিন ডিউটিতে ছিলাম। প্ল্যাটফর্মে একটি ট্রেন এসে
ভিড়তেই একটি মেয়ে দৌড়ে কাছে এসে বলে, আমাকে বাঁচান, ওরা আমাকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে এসেছে।
এখন কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে।’ এএসআই আরও বলেন, ‘আমরা সঙ্গে সঙ্গে বগিতে তল্লাশি চালাই।
দুটি ছেলেকে পালাতে দেখি। আরও একটি মেয়েকে উদ্ধার করেছি।’

এএসআইয়ের কথা
শুনে আমি রীতিমতো তাজ্জব। তাকে বলি, আমার মেয়ে আপনাদের কাছে আমানত। দয়া করে ওকে কারও
কাছে দেবেন না। তিনি বলেন, ‘আমাদের বড় কর্মকর্তা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন।’ তারপর
তিনি মেয়ের সঙ্গে আমায় কথা বলিয়ে দেন।
আমার তিন সন্তানের
মধ্যে সে সবার ছোট। ওকে চার বছরের রেখে ওদের মা চলে গেছেন। গত সাতটি বছর ধরে আমিই ওদের
মা ও বাবা। চার দিন আমার মেয়ে থানায় ছিল। সেই পুলিশ কর্মকর্তা রোজ ওকে আমার সঙ্গে কথা
বলিয়ে দিয়েছেন। মেয়েকে উদ্ধারে সহায়তা চেয়ে আমি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার
বরাবর আবেদন করি। জেলা প্রশাসক মহোদয় ত্বরিত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যা আমাকে আশাবাদী
করে। আমি এটুকুই জানতাম, আমার মেয়ে রাহা গুয়াহাটির কোনো একটি সেফহোমে রয়েছে। কিন্তু
সেই হোমের নামঠিকানা আমার জানা ছিল না। আমি নিজেই ১৭ জুন গুগলের মাধ্যমে নম্বর পেয়ে
যোগাযোগ করি গুয়াহাটি বাংলাদেশ উপহাইকমিশনে। বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ
বাবু বিভিন্ন ডকুমেন্টস চাইলে আমি তা পাঠাই। তিনি আমাকে নিশ্চিত করেন, ‘রাহা আপনার
মেয়ে এটা আমরা নিশ্চিত হয়েছি। আমরা চেষ্টা করছি। আপনি অপেক্ষা করুন।’ অপেক্ষা আজও করছি।
গত ২৮ জুন আমি তার কাছে হোমের নাম ঠিকানা জানতে চাই। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দেননি,
অজানা কারণে আমার কলও আর রিসিভ করেননি।
মেয়ের ভাবনায়
আমি স্ট্রোকে আক্রান্ত হই। টানা ১৪ দিন বিছানায়। লন্ডনের কলম একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা
প্রফেসর নজরুল ইসলাম আমার মেয়ের বিষয়টি জেনে আসামের সোশ্যাল ওয়ার্কার মনীষা, একজন আইনজীবী,
দুজন মানবাধিকার সংগঠককে রাহাকে খুঁজে বের করতে অনুরোধ করেন। অবশেষে দীর্ঘ ৩৫ দিন পর
ওনারা গুয়াহাটির ২৬টি হোম খুঁজে রাহাকে খুঁজে পান। তাদের সৌজন্যে ১৭ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপে
ভিডিওকলে কথা হয় মেয়ের সঙ্গে। হোমের পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ভদ্রমহিলা আমাকে হিন্দিতে
বলেন, ‘ওর (রাহা) মেন্টাল হেলথ খুবই খারাপ। যত দ্রুত সম্ভব ওকে নিয়ে যান।’
এ লেখা যখন লিখছি
তখন আমার নিষ্পাপ রাহার বন্দিত্বের ৪৬তম দিন পার হচ্ছে। কেউ কি বলবেন, ছোট্ট মেয়েটির
কী অপরাধ? পাচারকারী চক্রের কবল থেকে নিজের বুদ্ধি ও সাহসিকতায় মুক্ত হওয়া কি রাহার
অপরাধ? নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মহোদয়ের আন্তরিক চেষ্টাতেই গত ২৫ জুন আমার কাছে আসা
০৫.৪১.৬৭০০.৫০২.০১.০০২.২৩-১২ স্মারক নম্বরের চিঠি প্রমাণ করে রাহার আটক থাকার বিষয়টি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবাই অবগত। কিন্তু গুয়াহাটির বাংলাদেশের উপহাইকমিশনে
কর্মকর্তাদের আচরণ দুঃখজনক। বিষয়টি অবগত থাকার পরও মনভোলানো কথায় তারা আমাকে অপেক্ষায়
রেখেছেন, বাস্তবে এখনও কিছুই করেননি। আমার ক্ষুদ্রজ্ঞান তো বটেই, রাহাকে গুয়াহাটির
সেফহোম থেকে খুঁজে বের করা গুয়াহাটি হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট বিশ্বজ্যোতি পুরকায়স্থসহ
সেফহোম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরাও আমাকে জানিয়েছেন, ‘আপনার দেশের হাইকমিশন
চাইলে রাহাকে মুক্ত করতে কয়েক ঘণ্টা সময়ই যথেষ্ট।’ তবু বাস্তবতা হলো, আজ মাসাধিককাল
পরেও আমার নিরপরাধ ছোট্ট মেয়েটি ভিনদেশে বন্দি।
আমি জানি, একটি
ফোনকলের দূরত্বে আমার মেয়ের ফিরে আসা। মেয়েটি ওখানে ভালো নেই। রাহাকে ফিরিয়ে এনে আমাদের
একটু ভালোলাগা দান করার মতো আছেন কেউ? আমি ও আমার পরিবার আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।