দেশচিন্তা
অজয় দাশগুপ্ত
প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৪ ০৯:৫১ এএম
অজয় দাশগুপ্ত
সাম্প্রতিক সময়ের
বাংলাদেশ আমার কাছে অচেনা হলেও অপরিচিত কিছু ছিল না। যৌবনের শুরু থেকে আমরা যে দেশ
দেখে এসেছি এ ছিল তারই কার্বন কপি। কিন্তু বিগত ১৫ বছরে এতটা অপরিচিত স্বদেশ দেখিনি।
মাঝেমধ্যে হামলা-সন্ত্রাস-আন্দোলন হলেও তা ছিল সীমিত। এমনকি মতিঝিলের বুক কাঁপানো ঘটনাও
মিটে যেতে সময় লাগেনি। এবার যা দেখলাম তা অবিশ্বাস্য। ভূতুড়ে গল্পের মতো মনে হলেও সত্যি।
সবাই জানেন কী হয়েছিল কিন্তু এখনও কেউ জানেন না কী কারণে কারা এটা এত দূর পর্যন্ত নিয়ে
যেতে পেরেছিল। তার আগে বলতে চাই, সরকারি দল কি আমাদের আগে বলা কথাগুলো কখনও শুনেছিল?
শুনলেও কি মনে রেখেছিল তারা? মনে তো রাখেইনি বরং এগুলোকে বিরোধিতা ভেবে আমাদের দুশমন
ভাবতেই পছন্দ করত তাদের লোকজন। সবাই জানেন এবার দেশে যখন আন্দোলন, সন্ত্রাস, মারামারি,
ভাঙচুর চলছিল তখন বিদেশের বাঙালিও বসে ছিল না। তারা দেশের মানুষের চাইতে আরও জোশ, আরও
উৎসাহ-আবেগে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। দেশে দেশে বাদপ্রতিবাদে উত্তাল মিনি বাংলাদেশগুলো কি আমরা
চাইলেই অস্বীকার করতে পারব?
অথচ আশ্চর্যের
ঘটনা কী জানেন? মহাপ্রতাপশালী নামে পরিচিত আওয়ামী লীগারদের টিকিও দেখা যায়নি। আজ সময়
হয়েছে কিছু সত্য বলার। সিডনি আসার পর থেকে এ পর্যন্ত যত বিরোধিতা আর হিংসার শিকার হয়েছি
তার সিংহভাগই করেছেন আওয়ামী লীগাররা। দৈনিক সংবাদের একটি লেখার জন্য আমাকে অচ্ছুৎ করার
মতো অন্যায্য হাস্যকর দাবি তোলা যেমন কতিপয় আওয়ামী লীগারের কাজ ছিল, তেমন কিছু দিন
আগে জাতীয় টেলিভিশনের একটি টকশো নিয়েও আক্রমণ করেছিলেন ক’জন আওয়ামীপন্থি। অথচ কোনো আলোচনাতেই আমি কখনও অযৌক্তিক
নিন্দা বা সমালোচনা করতাম না। কথা বলতাম দল ও দলের শাসনের খারাপ দিক নিয়ে। চাইতাম সময়
থাকতে তারা যেন সাবধান হয়। এসব ছোট্ট ঘটনা আজকের দিনে অপ্রাসঙ্গিক। তবু বললাম এ কারণে,
যারা কঠিন দলান্ধ তাদের কাউকে মাঠে দেখিনি। উল্টো তারা নাকি আশা করেছিলেন লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবী
নামে পরিচিতজনেরা মাঠে নামবেন।
যারা প্লট পেয়েছে,
পদক পেয়েছে, পদ চেয়ে নিয়েছে তারা না, থাকবে অন্যরা! এ আওয়ামী লীগ কতটা পপুলার আর কতটা
অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছে তার প্রমাণ আবার তারা হাতে হাতে পেয়েছে। আসলে আমাদের দেশের মতো
দেশগুলোয় দীর্ঘ সময় ধরে শাসনে থাকা সরকার ও দল ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারায় এটাই সত্য।
বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতাদের চাইতে বিদ্যাবুদ্ধি ও প্রজ্ঞায় আগুয়ান বামেরা ওপার বাংলায়
নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। কারণ তাদের দীর্ঘ সময়ের শাসন ও এককেন্দ্রিকতা। এ সত্য জানা বা
দেখার পরও দেশের বড় দলটি সেখান থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। গোড়াতেই বলি, দেশের মানুষের
হাতে মানুষ হত্যা আমরা সমর্থন করতে পারি না। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা যে আন্দোলন নিয়ে
মাঠে নেমেছিল তার সঙ্গে দল বা রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। গোড়ার দিকে ঘটনা তার নিয়মেই
এগিয়ে চলেছিল। হঠাৎ যে বক্তব্য বিকৃতির কারণে এমন রাজাকার স্লোগান উঠেছিল, তার প্রতি
যত্নবান হওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি সরকারি দল। ছাত্রছাত্রীদের মনমননের খবর না রাখলে
যা হয়। না জেনে না বুঝে নিজের দলের ছাত্র সংগঠনকে বিপদে ফেলা নেতার হুমকি ছিলÑছাত্রলীগই
যথেষ্ট। যথেষ্ট কি না তার উত্তর তো ঘটনাতেই মিলে গেছে। মনে হয়, মাথা তুলে দাঁড়াতে পারাটা
কঠিন হবে তাদের। ছাত্রলীগের গৌরব-ঐতিহ্য আর সম্মানের এমন ক্ষতি এর আগে কখনও হয়নি।
সাধারণ মানুষ
পরে এটা বুঝতে পেরেছে যে আন্দোলন হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছিল। তাই যদি না হবে আমাদের দেশের
অর্জন ও সম্পদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা হতে পারত না । সবাই এটা বোঝেন কোটার সঙ্গে
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বিটিভি, মেট্রোরেল বা ডেটা সেন্টারের কোনো সম্পর্ক নেই। সেগুলোয়
যারা হামলা করেছিল তারা সাধারণ ছাত্র নয়। যারা করেছিল বা করতে পারে তাদের স্বরূপ আগেও
দেখা গেছে। তার পরও সরকার এদের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলো কেন? দুর্মুখেরা বলেন, স্পষ্টতই
বোঝা গেছে প্রধানমন্ত্রী ইজ ওয়ান ম্যান আর্মি। অন্তত তার দলে তিনি তাই। সে কারণে আর
কারও চেহারায় বিমর্ষভাব দেখা না গেলেও তিনি অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। যিনি নির্মাণ করেন তিনি
জানেন সৃষ্টি বিনষ্ট হওয়ার কষ্ট কী। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে দেশের ভাবমূর্তি। দেশ
ও দল যে এক নয়, এ কথাটা বারবার বলার পরও যারা তা ভুলে গিয়েছিলেন তারা দল নিয়ে কী করবেন
জানি না তবে দেশের সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। যে কথাটি বহুবার বলেছি,
বিভক্ত ঐক্যহীন জাতি কোনো দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। এটা আবারও প্রমাণিত হলো।
দেশের ইতিহাস
আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কূটতর্ক বা বিভক্তি, তার নিরসন গায়ের জোরে শক্তি প্রয়োগে করা
গেলে ‘আমি কে তুমি কেÑরাজাকার রাজাকার’ এ কথা শুনতে হতো না। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন
মুক্তিযুদ্ধের এত অপমানও দেখতে হতো না। এবার এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছে যে মুক্তিযুদ্ধের
কথা বলাটাও যেন অপরাধ। হয়তো এ পরিবেশ দীর্ঘ হবে না। কিন্তু ড্যামেজ তো হয়েই গেছে। ভাবমূর্তি
হচ্ছে কাচের মতো। একবার ভেঙে গেলে যতই জোড়া দেন না কেন আপনার চেহারা হবে কর্তিত বা
আধোভাঙা। এ আয়না নির্মাণ হয়েছিল, এখন বির্নিমাণ জরুরি। জরুরি আত্মজিজ্ঞাসাও।
কোন কথায় কোন কাজে উস্কানি থাকে তার আলোচনা না করে একটা কথা বলতে চাই। ছেলেবেলায় আমরা পড়েছিলাম ‘স্বীয় জিহ্বাকে শাসনে রাখিবে’। আমার মনে হয় দেশের নেতাদের বিশেষত সরকারি দলের নেতাদের অনেকেরই এ কথাটি বারবার পাঠ করা উচিত। হতাহতদের সম্মান আর তাদের শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে শান্তির বাতাবরণ তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষকে কথা বলতে দেওয়া অধিকার।