মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশ : ২৬ জুলাই ২০২৪ ১৫:৩৫ পিএম
শান্ত হয়ে আসছে পরিস্থিতি। কারফিউর সময় কমতে শুরু করেছে। আশা করা যায় শিগগিরই কারফিউমুক্ত হয়ে যাবে দেশ। ইন্টারনেট সুবিধা এখন সীমিত আকারে, তাও দ্রুতই স্বাভাবিক হয়ে যাবে- এমন প্রত্যাশা সবার। নৃশংসতা বন্ধের পর এসব পদক্ষেপ জনমনে স্বস্তি ফিরে এলেও বড় একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এবং তা হলো, ইন্টারনেট মাধ্যমে জনগণকে গুজব-মিথ্যাচার গিলিয়ে দিয়ে যারা দেশকে অস্থিতিশীলতায় ঠেলে দিয়েছিল, তাদের কী হবে।
সরকার এই মুহূর্তে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের ধরতে শুরু করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা ব্যবহার করে সরকার ইচ্ছা করলে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবে। এই অপরাধীরা হয়তো সরাসরি অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত এমন অভিযোগেই তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। কিন্তু এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পেছনে যে শক্তি কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? স্বীকার করতে হবে, আজকাল ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এ ধরনের কাজে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে। আর এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কাজে শুধু পরামর্শকই নয়, অর্থের জোগানদারও থাকে। তাদের কি খুঁজে বের করা হবে?
দুষ্কৃতকারীরা ইন্টারনেট সুবিধা বিঘ্নিত না করলে সরকার কী ভূমিকা গ্রহণ করত, তা অনুমানসাপেক্ষ। আন্দোলনের নামে যে মুহূর্তে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ শুরু হলো তার পূর্বমুহূর্তে যদি ফেসবুক বন্ধ হয়ে যেত তাহলে হয়তো এতটা ধ্বংসের মুখে পড়ত না বাংলাদেশ। এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার ছিল অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরিতে নিয়োজিতরা। গুজব ও উত্তেজনা ছড়াতে তাদের এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠতে দেখা গেছে, যা সত্যিকার অর্থেই মানুষকে আতঙ্কিত করেছিল। এই গুজবগুলো যে কতটা মানুষকে প্রভাবিত করেছে, তা প্রকাশ করার মতো নয়। একটি উদাহরণ দিতে পারি। রাস্তায় যখন বিজিবির টহল শুরু হয়েছে, তখন এক মহিলা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এসব কী শুনছি ভাই? জিজ্ঞেস করলাম কী শুনছেন? তিনি বললেন, আপনার বাসায় আসার আগে তিনরাস্তার মোড়ে জটলা থেকে বলা হচ্ছিলÑ শেখ হাসিনা স্পেনে চলে যাচ্ছেন। আর যাওয়ার সুবিধার্থে বিমানবন্দর পর্যন্ত সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। তাকে বললাম, সেনাবাহিনী এলো কোথা থেকে? আর শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাবেন কেন, টেলিভিশনে একটু আগেও দেখা গেল তিনি একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করছেন। সরল-সহজ মহিলার প্রশ্ন- ওরা এসব বলছে কেন তাইলে?
ওই মহিলা বুঝতে পেরেছিলেন, তিনি গুজবই শুনেছেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা মুখে মুখে গুজব ছড়ানোর যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, তা কি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব?
সেটা বন্ধ করতে প্রয়োজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন এসব প্রচার না হয়। আর প্রচার যদি হতেই থাকে, তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই তাকে প্রতিহত করাই হতে পারে বড় মাধ্যম। একটি পথ হচ্ছে, ব্যবস্থাপনাগত আরেকটি হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর জবাব দেওয়া। প্রাসঙ্গিক হচ্ছে, তাৎক্ষণিক জবাব দান। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা চোখে পড়েছে। জবাব ছিল সাধারণ মানুষের এবং সংখ্যায়ও খুবই কম। গুজবের নিচে চাপা পড়ে গেছে। খুব মনে হচ্ছিল বছর দুই থেকে শোনা কথা। সংবাদমাধ্যমেও প্রচার হয়েছিল, শাসক দলের ২ লাখ কর্মীকে নাকি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু কোথায় তারা?
মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতিন কমান্ড কিংবা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড নামের অনেক পেজ দেখতাম কোটা আন্দোলনের আগে। যখন আন্দোলন শুরু হয়েছে ওই দুই লাখ কর্মীর মতো তারাও উধাও হয়ে গেছে। ছাত্রলীগ প্রথম অবস্থায় কোটা আন্দোলনকারীদের দাবিকে যৌক্তিক বলার পর তারা মাঠে নেমেছে। তাদের কাজের এক তরফা সমালোচনা চলতে থাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এমনকি মিডিয়াও তাদেরই আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে। কিন্তু এসব বিষয়ে ২ লাখ কর্মীর কোনো সমর্থন দেখা যায়নি। বলছি না পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা তাদের কাজ। কিন্তু পরিস্থিতি উত্তপ্ত করা থেকে নিবৃত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের যুক্তি প্রদর্শনের কাজটি তো করা যেত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাদের কাউকে দেখা যায়নি।
আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলোর ভূমিকা কী ছিল তা সবাই জানেন। এই কদিন দেশে আওয়ামী লীগ নামে সংগঠন বলতে কিছু ছিল কিনা বোঝা যায়নি। বলছি না তারা সংঘাতের জবাব সংঘাত দিয়ে করুক। তাদের উপস্থিতি সংঘাতকে কমিয়ে আনতে পারত। এই দুর্যোগ অন্তত একটা বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনগুলো সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে নেই। একটি সংগঠনের কাজ কি শুধু স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বক্তৃতা করা কিংবা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা? দুর্যোগ মোকাবিলায় তারা কী ভূমিকা পালন করেছে, এই মুহূর্তে সিনিয়র নেতাদের এ বিষয়ে মূল্যায়ন করা জরুরি বলে মনে করি। আওয়ামী লীগ যদি নামমাত্র কোনো দল হয়ে পড়ে তাহলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের ভাগ্য যে নির্মম হয়ে পড়বে, তা হয়তো বলার অপেক্ষা রাখে না।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সম্প্রতি তার দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাধারণত বৈঠকের পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। এবার তা করেননি। তবে অনুমান করি দুর্যোগকালে তার নেতাকর্মীদের কাজের মূল্যায়ন হয়ে থাকতে পারে। হয়তো এ বিষয়ে তিনি পরবর্তী ব্যবস্থাও গ্রহণ করবেন।
দুই লাখ ডিজিটাল কর্মীর অস্তিত্ব নেই। বহু আগে থেকেই এমন কর্মীদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে।
এবার অন্তত স্পষ্ট হয়ে গেছে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে এমন ডিজিটাল কর্মীর প্রয়োজনীয়তা কতটা। সংগঠন হয়তো কর্মীদের মূল্যায়ন করবে, কিন্তু একই সঙ্গে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে কর্মীদের। শক্তিশালী ডিজিটাল কর্মী বাহিনী গড়ে তোলাও এই মুহূর্তে জরুরি। যেকোনো আন্দোলন পরবর্তীকালের করণীয় ঠিক করে দেয়। যারা আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেন, তারা এগিয়ে যান। যারা আন্দোলনকে নিছক আন্দোলন বলেই মনে করেন তাদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়। এখন শাসক দল কোনদিকে যায়, সেটাই দেখার বিষয়।
লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক