আর কে চৌধুরী
প্রকাশ : ২০ জুলাই ২০২৪ ১৫:০৪ পিএম
আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪ ১৫:০৪ পিএম
আমাদের নদ-নদীগুলো মিঠাপানির প্রধান উৎস। মিঠাপানি প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ। নানা কারণে এ সম্পদ এখন বিপন্ন। ক্রমে প্রকট হচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির জন্য হাহাকারের আঁচ লাগছে রাজধানীতেও। প্রতিনিয়ত নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলায় বাড়ছে দূষণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উজানে প্রবাহিত হচ্ছে লবণাক্ত পানি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণেও নেই দৃশ্যমান উদ্যোগ। সবকিছু মিলিয়ে বিশুদ্ধ পানি প্রাপ্তিই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীর স্যুয়ারেজের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে চারপাশের জলাধারে। চারপাশের ভালো পানিতে পয়োবর্জ্য ফেলে দূষিত করে পানি আনা হচ্ছে পদ্মা-মেঘনা থেকে। এতে বাড়ছে উৎপাদন খরচ। বাড়তি খরচ চাপছে ভোক্তার কাঁধে। অথচ ঢাকার পাশের শীতলক্ষ্যার পানি ছিল একসময় বিশ্বের অন্যতম বিশুদ্ধ পানির আধার। শীতলক্ষ্যা দূষিত করা হয়েছে। সে পানি এতটাই দূষিত যে, নর্দমার পানিও তার কাছে হার মানে। একসময় ধলেশ্বরীর পানি এতটাই স্বচ্ছ ছিল যে, এ নদীতে মাছের উপস্থিতি স্পষ্ট দেখা যেত। আর এখন ধলেশ্বরীর যে স্থানে চামড়াশিল্প নগরীর বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, এর আশপাশের পানির রঙ বদলে গেছে। সাভার চামড়াশিল্প নগরীতে সিইটিপির ধারণক্ষমতার অনেক বেশি বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এ শিল্পনগরীর তরল বর্জ্য সিইটিপিতে গেলেও অন্যান্য বর্জ্য পরিশোধন ছাড়াই সরাসরি ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরীতে। ট্যানারির অপরিশোধিত তরল বর্জ্য নদীতে ফেলার কারণে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ দূষিত পানি ব্যবহারে সতর্ক হলেও নদীর দূষণ স্থির থাকে না; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দূষণ আমাদের খাদ্যচক্রেও প্রবেশ করছে।
চামড়াশিল্প নগরীর বর্জ্যের কারণে যাতে ধলেশ্বরী বা এর আশপাশের পরিবেশ কোনো ধরনের হুমকির মুখে না পড়ে এটা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজধানীতে প্রতিদিন পানির চাহিদা ২৪৫ থেকে ২৫০ কোটি লিটার। পানির জোগানদার ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহের সক্ষমতা ২৭৫ কোটি লিটার। পানির এ জোগান দেওয়া হয় দুই ভাবে। পাঁচটি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে চাহিদার ৩৪ শতাংশ পরিশোধন করে এবং বাকি ৬৬ শতাংশ পূরণ করা হয় ভূগর্ভ থেকে উঠিয়ে। অতিমাত্রায় ভূগর্ভ থেকে পানি ওঠানোর ফলে আর্সেনিকের মাত্রা বাড়ছে। নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর।
প্লাস্টিক ও পলিথিনের বর্জ্য শুধু বাংলাদেশের নদী-জলাশয়গুলোর জন্যই বিপজ্জনক তা নয়, বিশ্বের সাগর-নদী-জলাশয়গুলোর জন্যও বিপজ্জনক। এমনটি প্রাণবৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত অংশে যে পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য রয়েছে, তা ফ্রান্সের মোট আয়তনের প্রায় ৩ গুণ। এমন সংকটে আমাদের নদ-নদীগুলোও। দেশের বিভিন্ন স্থানে নদ-নদী, খাল-বিল অবৈধভাবে দখল হয়ে যাওয়ায় পানিপ্রবাহের গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে; নদ-নদী সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে। এতে বর্ষাকালে স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি অনেক স্থানে বৃষ্টির পানি জমে ফসল ও বাড়িঘর তলিয়ে যায়। নদ-নদী, খাল-বিল, প্রাকৃতিক জলাশয় আমাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। নদ-নদী, জলাশয় সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয় দখলমুক্ত করতে কঠোর ও নির্মোহ অবস্থান ভিন্ন গত্যন্তর নেই।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক