প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর
ড. ফরিদুল আলম
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৪ ১৫:১৮ পিএম
প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরের মাত্র ১৬ দিনের মাথায় এশিয়ার
আরেকটি বড় শক্তি, বলা যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ চীন সফরের মধ্য দিয়ে
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা চতুর্থ মেয়াদের সরকার পরিচালনায় এক নতুন অধ্যায়ের
সূচনা হলো। এত দিন পর্যন্ত বাংলাদেশ পশ্চিমা ঘেঁষা বলে যে ধারণা ছিল, এ সবকিছু ভুল
প্রমাণিত করে প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে সত্যিকার অর্থে বৈদেশিক সম্পর্কের
ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় স্বার্থরক্ষায় সরকারের অঙ্গীকারের বিষয়টি প্রাধান্য পেল। এর
বাইরে যেকোনো ধরনের প্রভাবের ঊর্ধ্বে গিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে গেলে একটি রাষ্ট্রের
যে ধরনের সাহস, সামর্থ্য এবং সক্ষমতা দরকার, দেড় দশকের অধিককাল ধরে রাষ্ট্র
পরিচালনায় বাংলাদেশ তা অর্জন করতে পেরেছে বলেই মনে হয়। সেজন্যই আজ পশ্চিমা
নিষেধাজ্ঞা এবং বহুমাত্রিক হুমকি মোকাবিলা করে বাংলাদেশ পশ্চিমা বলয়ের বাইরেও
তাদের অপছন্দের চীন এবং রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষায় এক অনন্য উচ্চতায়
পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশ ভারতের মতোই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের
জাতীয় স্বার্থের প্রাধান্য এবং অন্বেষণ আমাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির
ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
৮ থেকে ১০ জুলাই তিন দিনের চীন সফর শেষ করে দেশে ফিরেছেন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সফর মূল্যায়ন করতে গেলে কেবল ২১টি সমঝোতা স্মারক এবং সাতটি
ঘোষণার মধ্য দিয়ে একে ব্যাখ্যা করা কঠিন, বরং ব্যাপক বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ২০২৬
সাল নাগাদ বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উত্তরণের পর এলডিসি রাষ্ট্র হিসেবে
প্রাপ্য অনেক সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হবে, কিন্তু এ উত্তরণ ধরে রাখতে না পারলে সরকার-প্রতিশ্রুত
২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত এবং স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত হওয়াও সম্ভব নয়। এর অংশ
হিসেবে বাংলাদেশ এখন বৃহত্তর পরিসরে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক মজবুত করতে চেষ্টা
করে যাচ্ছে। আর তাই চীন এবং ভারত থেকে ব্যাপক বিনিয়োগ ছাড়াও অন্য দেশগুলোয় আমাদের
রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি। ইতোমধ্যে আমরা জানি,
চীন বাংলাদেশে অন্যতম বিনিয়োগকারী দেশ।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ
থেকে চীন এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য এক সম্মেলন আয়োজন করা হয়। ওই সম্মেলনে বাংলাদেশকে বিনিয়োগের
জন্য বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও অধিকহারে
বিনিয়োগের আহ্বান জানান। এ ছাড়া বাংলাদেশের অনেক বড় বড় প্রকল্পও সম্পাদিত হয়েছে
চীনের অর্থনৈতিক এবং কারিগরি সহায়তায়। গত দেড় দশক সময়ে অর্থাৎ বর্তমান
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে চীন আমাদের প্রায় দেড় ডজন বড় প্রকল্পের সঙ্গে
অংশীদারির ভিত্তিতে কাজ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড
ট্রান্সপোর্ট, কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প। সরকার ইতোমধ্যে দেশে ১০০
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে চীনের তরফ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে
বিনিয়োগ ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী তার সফরে বিনিয়োগ সম্মেলনে এ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও আইটি
ভিলেজগুলোয় চীনের বিনিয়োগ কামনা করেন।
আমরা জানি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে যেখানে উন্নত
দেশগুলোও ধুঁকছে, সে জায়গায় চীনের যথেষ্ট উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে, যা তারা নিরাপদ
বিনিয়োগে আগ্রহী। প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মধ্য দিয়ে চীনের কাছে আরও বিনিয়োগের আহ্বান
জানানো হয়েছে, সেই সঙ্গে এও অবহিত করা হয়েছে, বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ
সরকারের পক্ষ থেকে ৮০০ একর জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে। চীন বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির
বাস্তবতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এককেন্দ্রিক বিশ্বের স্থলে নিজেদের শক্ত
প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিণত করেছে। আর তাই দেশটি এখন ঝুঁকে পড়েছে সেসব সম্ভাবনাময়
দেশের দিকে, যারা তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে
নেওয়ার পক্ষে। সে জায়গা থেকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপক কৌশলগত সম্পর্কের
সূচনা হয় ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১৯
এবং সর্বশেষ ৮-১০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের মধ্য দিয়ে এ সম্পর্ক একটি
নিবিড় কৌশলগত সম্পর্কে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে
যা চাহিদা ছিল, বলা চলে এর ষোল আনা পূর্ণ হয়েছে এবারের সফরে। দুই দেশের ব্যবসায়ী
পর্যায়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্পর্কিত ১৬টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর ছাড়াও জ্বালানি,
ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, চীনে তাজা আম রপ্তানি সংক্রান্ত উদ্ভিদস্বাস্থ্য
সম্পর্কিত প্রটোকল, অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতি সহায়তা, চীনের অর্থায়নে ষষ্ঠ এবং নবম
বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু এবং ব্যাংকিং খাতের উন্নয়নের মতো জায়গায় চীনের সম্মতি
পাওয়া গেছে।
সফরের শেষ দিন সকালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে
দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ১ বিলিয়ন চীনা মুদ্রা
সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একই দিন বিকালে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি
অনুষ্ঠিত হয় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে। ওই বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি বাংলাদেশকে চারটি প্যাকেজে
আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে ঘোষণা দেন। প্যাকেজগুলো হলো : অনুদান, সুদমুক্ত ঋণ, কম সুদে ঋণ এবং বাণিজ্যিক ঋণ। এ সার্বিক বিষয়ে নজরদারি এবং এগুলো কার্যকরের জন্য চীনের পক্ষ থেকে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে শিগগির বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শুরুর বিষয়েও আশ্বস্ত করা হয়। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘটতির বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট শির মনোযোগ আকর্ষণ করলে তিনি আরও বেশি পরিমাণে বাংলাদেশি পণ্য আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে আশ্বস্ত করেন। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানেও চীনের ভূমিকা আরও জোরালো করার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট শির পক্ষ থেকে।
চীনের আজকের উত্থান আমরা যদি বিশ্লেষণ করতে চাই, তাহলে দেখব এটি মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। ১৯৪৯ সালে বিপ্লবের পর মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে কৃষিতে ব্যক্তিগত ভূমিপ্রথা বাতিল করে কমিউন বা সামষ্টিক বন্দোবস্ত প্রথা প্রবর্তনের পর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের যে সূচনা হয় এরপর দ্বিতীয় ধাপে দে জিও পিংয়ের আমলে সোভিয়েত ধারার অর্থনীতি প্রবর্তিত হয়, যার মধ্য দিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যক্তিমালিকানা প্রথা প্রবর্তন এবং ব্যাপক বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর ফলে ১৯৮০ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১০ দশমিক ২ শতাংশে। সবশেষে প্রেসিডেন্ট শি ইতঃপূর্বে দে জিয়াও পিংয়ের হাত ধরে আনা পরিবর্তন আরও প্রসারিত করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন ধারার সূচনা করেন। ২০১৩ সালে প্রাচীন সিল্ক রুটের আদলে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রবর্তন করেন, যেখানে ৬৫টি দেশ যুক্ত হয়, আর এর মধ্য দিয়ে এশিয়া, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং লাতিন আমেরিকার মতো অঞ্চলের সঙ্গে চীনের ব্যাপক অংশীদারিমূলক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশও এ প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যে আধিপত্য অর্জনের চেষ্টা সেটা ব্যাহত হচ্ছে। চীন চায় তার নিজের স্বার্থে এ অঞ্চলে বাণিজ্যের পরিবেশ তাদের অনুকূলে নিতে, আর বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যাপক বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান এবং প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন।
২০০৯ সালের পর থেকে এটি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চতুর্থ আনুষ্ঠানিক চীন সফর। ইতঃপূর্বের সফরগুলো ছিল
২০১০, ২০১৪ ও ২০১৯ সালে। এ সময়ে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক বোঝাপড়ার
বাইরেও যে নিবিড় কৌশলগত সম্পর্কের সূচনা হয়েছে তা বাংলাদেশকে একতরফাভাবে চীনের ওপর
নির্ভরশীলতা হ্রাস করে বাংলাদেশ নিয়ে চীনের স্বার্থও সংযুক্ত করেছে। ভৌগোলিক
অবস্থা, জনসংখ্যা, প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনাÑসবকিছু এক করলে এ মুহূর্তে
বাংলাদেশ চীনের জন্য সবচেয়ে নির্ভরশীল গন্তব্য। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়
সম্পর্ক উন্নত করতে গিয়ে সবচেয়ে নিকট এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী ভারতের স্বার্থ
যাতে ক্ষুণ্ন না হয় তা-ও বাংলাদেশের বিবেচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের
উন্নয়নের স্বার্থে কেবল ভারতনির্ভরতা অতিক্রম করে চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক
রক্ষায় ভারতের দিক থেকেও সম্মতি রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ভারতের সঙ্গেও আমাদের
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যেমন আরও মজবুত করবে, আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এটি একটি
বড় উপলক্ষ হিসেবে কাজ করবেÑএ উপলব্ধি ভারতেরও রয়েছে।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত ও চীন সফরের মধ্য দিয়ে আমরা বিশ্বরাজনীতিরও একটি সার্বিক দিক অনুধাবন করতে পারছি। বৈশ্বিক রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ ঘটতে যাচ্ছে এবং সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্য হ্রাস করে চীন, রাশিয়া ও ভারতের মতো দেশগুলো এগিয়ে আসছে এবং সেখানে বাংলাদেশের মতো দেশের অন্তর্ভুক্তি আমাদের গুরুত্ব বিশ্বের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরছে। একচেটিয়া আধিপত্যের জায়গা থেকে অংশীদারিভিত্তিক উন্নয়নের যে সূচনা হয়েছে, বাংলাদেশ সেখানে সরবে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে; যা ভবিষ্যতে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের প্রচেষ্টা আরও বেগবান করবে।