সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৬ জুন ২০২৪ ১৪:৫৩ পিএম
অর্থনৈতিক গতিশীলতা কিংবা সমৃদ্ধির জন্য যে বহুমুখী উদ্যোগ-প্রচেষ্টা প্রয়োজন তাতে সরকারের তরফে ঘাটতি রয়েছে-এমনটি বলার অবকাশ নেই। তবে পাশাপাশি এও সত্য, এ খাতে কিছু বিশৃঙ্খলা-অনিয়মের ফলে অর্থনীতিতে এর বিরূপ অভিঘাত লেগেছে। আমাদের উন্নয়ন সহযোগী কিংবা দাতা সংস্থাগুলোর মধ্যে আইএমএফ অন্যতম একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা। আইএমএফের ঋণের তৃতীয় কিস্তির অনুমোদন নিয়ে দুর্ভাবনার যে মেঘ জমেছিল, তা কেটে গেছে ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে সংস্থাটির নির্বাহী পর্ষদের সভায় তৃতীয় কিস্তির ১ দশমিক ১১ বিলিয়ন বা ১১১ কোটি ডলার অনুমোদন করার মধ্য দিয়ে। ২৫ জুন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ এ-সম্পর্কিত প্রতিবেদনে যে তথ্য উঠে এসেছে তা দেশের অর্থনীতির জন্য স্বস্তির। এর আগের দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর প্রতিবেদনেই বলা হয়েছিল, রিজার্ভের শর্ত পূরণ না হওয়ায় আইএমএফের ঋণের তৃতীয় কিস্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
আমরা জানি, আইএমএফের ৪ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রথম কিস্তির ৪৭৬ দশমিক ২৭ মিলিয়ন বাংলাদেশকে দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আর দ্বিতীয় কিস্তির প্রায় ৬৮১ মিলিয়ন ডলার আসে গত বছরের ডিসেম্বরে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ সর্বোচ্চ উঠেছিল ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে, যা প্রায় ৪৮ বিলিয়নের সমান। আর এখন এই রিজার্ভ নেমে এসেছে ২৪ বিলিয়নের ঘরে। তবে আইএমএফের হিসাবে খরচযোগ্য রিজার্ভ আরও কম। তাদের মতে, তা রয়েছে ১৩ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার। রিজার্ভে ভাটা পড়ার কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ সুস্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান। চলমান বৈশ্বিক সংকট, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট ইত্যাদি বিষয় আমাদের রিজার্ভের ক্ষেত্রে যেমন কিছু অভিঘাত ফেলেছে, তেমনি মূল্যস্ফীতি উস্কে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বৈরী ভূমিকা পালন করছে। আমরা মনে করি, সঠিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণেই কেবল সার্বিক পরিচ্ছন্ন চিত্র উঠে আসতে পারে। রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান সংকটের নিরসনকল্পে দূরদর্শী বহুমুখী পদক্ষেপের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপের প্রসঙ্গটি আমরা অস্বীকার করি না। আমরা মনে করি, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকারের যেমন এদিকে মনোযোগ আরও নিবিড় করা দরকার, তেমনি আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোরও সেই প্রেক্ষাপটেই আলোচনা-পর্যালোচনা প্রয়োজন।
রিজার্ভের নতুন লক্ষ্যমাত্রা কম হলেও তা পূরণ করা বিদ্যমান বাস্তবতায় ততটা সহজ নয়। কারণ, যেসব উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে ও ব্যয় হয়, সেসব ক্ষেত্রে ভারসাম্যের ঘাটতি রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা ইতোপূর্বে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অনস্বীকার্য যে, এমন পরিস্থিতিতে রিজার্ভ ধরে রাখা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। আইএমএফের অন্যান্য শর্ত পূরণে অগ্রগতি বিদ্যমান, এও নিখাদ বাস্তবতা। আমরা ধারণা করি, রিজার্ভের কাঙ্ক্ষিত ঘাটতি সত্ত্বেও অন্যান্য শর্ত পূরণে অগ্রগতি থাকায় আইএমএফের ঋণের তৃতীয় কিস্তি নিয়ে অনিশ্চয়তার মেঘ কেটেছে।
উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিগত দেড় দশকে দেশের অভাবনীয় সাফল্য দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিন্তু আর্থিক খাতের যেসব উপসর্গ আমাদের রিজার্ভ-প্রবৃদ্ধিসহ নানা ক্ষেত্রে যে বিরূপছায়া পড়েছে এবং বিশৃঙ্খলা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তা শুধু আইএমএফের শর্তের নিরিখেই নয়, আমাদের সামগ্রিক প্রয়োজনীয়তার স্বার্থেই এর নিরসন অত্যন্ত জরুরি। আমরা মনে করি, উন্নয়ন-অগ্রগতিসহ কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে সব প্রচেষ্টাই ব্যাহত হতে পারে, যদি অর্থনীতির সংশ্লিষ্ট সব খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হয়। আমরা আশা করব, খেলাপি ঋণ আদায়, অর্থ পাচার রোধসহ সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর দিকগুলো নিরসনকল্পে সরকারকে কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। আমরা দেখছি, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন-অগ্রগতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি নামক ভয়াবহ ব্যাধি এখনও বড় উপসর্গ হিসেবে জিইয়ে আছে। এসব কিছুর বিরুদ্ধে সরকারের শূন্যসহিষ্ণুতার অঙ্গীকার সত্ত্বেও কীভাবে অনাচার-কদাচারের ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে, তা দূর অতীত না-হয় বাদই দিলাম, সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে ক্রমে যে চিত্র উঠে আসছে, তা কোনোভাবেই প্রীতিকর কিংবা স্বস্তির নয়।
আমরা এও দেখছি, ব্যক্তি পর্যায়ে তো বটেই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের উন্নয়ন চিন্তার বৈরী পরিস্থিতি সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিনিয়তই উঠে আসছে। আমরা মনে করি, টানা চার মেয়াদে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ব্যাপক সাফল্যের খতিয়ানে এই বিষয়গুলো ক্ষত সৃষ্টি করেছে। আমরা আরও মনে করি, এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আগেই সরকারকে তাদের অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে একেবারে অনমনীয় অবস্থান নেওয়ার বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তার নিয়ম-সূত্রের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নীতিনির্ধারকরা দেশ নিয়ে নেতিবাচক সংবাদে হীন রাজনৈতিক স্বার্থে উৎফুল্ল বোধ করেন। আইএমএফের ঋণের তৃতীয় কিস্তি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যখন অনিশ্চয়তার বিষয়টি উঠে আসে, তখনও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাববোধ থেকেই এই বিষয়গুলো অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে সামনে আসছে, যা সামগ্রিকভাবে বহিরাঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ম্লান করে। আমরা যেমন সরকারের দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেই; তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক মহলের নীতিনির্ধারকদেরও জাতীয় স্বার্থের ব্যাপারে শুভবোধের আহ্বান জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার তো বটেই প্রশাসনের স্তরে স্তরে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে যদি দেশপ্রেম বোধের আলো বিচ্ছুরিত হয়, তাহলে অনেক অসুন্দরই সুন্দরে রূপান্তরিত হবে এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথ মসৃণ হবে।
কারও চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দ কিংবা নির্দেশের নিরিখেই নয়, জাতীয় যেকোনো ইস্যুতে সবার ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় স্বার্থে যদি ঐকমত্য পুষ্ট হয় এবং অনিয়ম-অনাচার-দুরাচার-কদাচারের বিরুদ্ধে সমস্বরে সবাই সোচ্চার হন, তাহলে ২০৪১ সালের মধ্যে যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা অধরা থাকার কথা নয়। আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করে জাতীয় স্বার্থেই শৃঙ্খলাবোধ অগ্রগণ্য রাখতে হবে। আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায় সর্বাগ্রে সরকারের হলেও অন্যান্য স্তরের দায়িত্বশীল সবারই এ ব্যাপারে কমবেশি দায়দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের কোনো স্বপ্নই চূড়ান্ত অর্থে বাস্তবায়িত হওয়া কঠিন, যদি না অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বিস্তৃত না হয়। আমরা আশা করব, দায়িত্বশীল প্রত্যেকেই দেশপ্রেম বোধে উজ্জীবিত হয়ে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক যারা হয়ে আছেন কিংবা বিষফোঁড়াসম, তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন এবং এটি তাদের নৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে সরকারের উচিত তাদের প্রতি কোনো রকম অনুকম্পা প্রদর্শন না করা। আর্থিক খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জোর দিতে হবে রাজনৈতিক-সামাজিক অঙ্গীকার পূরণে অর্থাৎ বৈষম্যের ছায়া সরিয়ে সাম্যের আলো ছড়ানোর লক্ষ্যে। আমাদের বিশ্বাস, সুশাসন নিশ্চিত হলে অপচ্ছায়া এমনিতেই দূর হবে।