সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৪ ১১:৫৪ এএম
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সম্প্রচারক এবং প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মধ্যে সম্পর্কের বিশ্লেষক-লেখক রিচার্ড টমাস মাবে যথার্থ বলেছেন, ‘গাছ না থাকা মানে আমাদের শিকড় ছাড়া থাকার মতো’। আর আমেরিকান পেশাদার কুস্তিগির বরিস নেলসন বলেছেন, ‘যারা গাছ বজায় রাখতে পারবে না, তারা শিগগিরই এমন একটি পৃথিবীতে বাস করবে, যা মানুষকে ধরে রাখতে পারবে না।’ আমাদের বিদ্যমান বাস্তবতায় তাদের এই মন্তব্যগুলো কতটা প্রাসঙ্গিক এর আর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন পড়ে না। ৩ জুন ‘জাবিতে এক দিনে কাটা পড়ল দুই শতাধিক গাছ’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত সংবাদটি পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর কতটা ভয়াবহ অভিঘাত এর ব্যাখ্যাও নিষ্প্রয়োজন। ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ-এ নিকট অতীতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯৮৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃক্ষের পরিমাণ ও জলাশয়ের হার কমেছে ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যদিকে নির্মাণ করা অবকাঠামোর হার বেড়েছে ১৬৯ দশমিক ৩ শতাংশ। আমরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরোধী নই। কিন্তু পরিবেশ-প্রতিবেশে আঘাত লাগে এমন কোনো কিছুই মেনে নিতে পারি না।
আমরা দেখছি, জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃক্ষনিধন ও জলাশয় ভরাট আর প্রতিবেশঘাতী বহুতল ভবন নির্মাণবিষয়ক খবরের
অগ্নিকুণ্ডলীর অকুস্থল তথা ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির কোলজুড়ে থাকা জাহাঙ্গীরনগরে
এ রকম পৌনঃপুনিক ঘটনা সময়ের দর্পণে সেই বাস্তবতাই প্রতিফলিত হয়ে চলেছে। নিকট অতীতে
সংবাদমাধ্যমেই প্রকাশ, জাহাঙ্গীরনগরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অধিকতর উন্নয়ন
প্রকল্পের আওতায় ১২টি স্থাপনার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে সিংহভাগ ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে
এবং এসব ভবন নির্মাণকালে সহস্রাধিক বৃক্ষনিধন করা হয়েছে, যার প্রতিবেশগত মূল্য নির্ধারণ
করা দুরূহ। অবশিষ্ট ভবনগুলো নির্মাণের জন্য বৃক্ষনিধনের যে চিত্র প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ
উঠে এসেছে, তা আমাদের বিস্মিত যুগপৎ ক্ষুব্ধ না করে পারে না। গত ৩০ মে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে
চলছে ঈদ ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি। এই সুযোগে বিকল্প জায়গা থাকা সত্ত্বেও বৃক্ষনিধন করে
প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংস করে চারুকলা অনুষদ এবং কলা ও মানবিকী অনুষদের সম্প্রসারিত ভবন
নির্মাণকাজ শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্দেশ্য যাতে কোনো প্রতিবাদ সংঘটিত
হতে না পারে। আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, সবুজের সমারোহে বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়টির
অবস্থান, সেখানে এত জায়গা থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের সবুজ ও জলাশয়ের প্রতি এত আক্রোশ
কেন? ফরাসি বংশোদ্ভূত সমাজসেবী এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে
বসবাসকারী ব্যাংকিং শিল্পের পথ প্রদর্শক হিসেবে খ্যাত স্টেফান জিরাল্ড বলেছিলেন, ‘আমি
যদি ভাবি যে কালই মারা যাব, তবু ভবিষ্যতের জরুরি প্রয়োজনে আমার আজই একটি বৃক্ষরোপণ
করা উচিত।’ জগৎখ্যাত আরও অনেক মনীষীই মানব ও ভূমণ্ডলের অত্যন্ত জরুরি অনুষঙ্গ হিসেবে
বৃক্ষকে চিহ্নিত করেছেন। দেশে সামাজিক ও সংরক্ষিত বনায়নে বলবান বৃক্ষখেকোদের থাবা তো
পড়েছেই, এখন দেখা যাচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অপরিণামদর্শী
কর্মকাণ্ডের ক্রমবিস্তৃতি ঘটে চলেছে। সচেতন মানুষমাত্রেই অজানা নয়, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত
কারণে পরিবেশ-প্রতিবেশসহ জীববৈচিত্র্য ও মানবকুলের জন্য বিপদাশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। এমতাবস্থায়
প্রকৃতির ওপর অভিঘাত আরও কতটা বিপদশঙ্কুল হয়ে উঠতে পারে, তা-ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের
তরফে শঙ্কার ভবিষ্যদ্বাণী শোনা যাচ্ছে।
এই সম্পাদকীয়
স্তম্ভেই আমরা অতীতে বলেছি, যে উন্নয়ন মানবজীবনে কঠিন কষাঘাত ফেলে এমন উন্নয়ন এবং উন্নয়নসংশ্লিষ্ট
দায়িত্বশীলদের দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন না করার অবকাশ থাকে না। আমরা জানি, দেশের
মূল আয়তনের অন্তত ২৫ ভাগ বনভূমি থাকতে হয়। কিন্তু দেশে তা আছে মাত্র ১৪ শতাংশের মতো!
যেভাবে বৃক্ষ সংহার চলছে তাতে শঙ্কিত না হয়ে উপায় থাকে না। দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে
প্রাকৃতিকভাবেই বনভূমি ও বৃক্ষের সম্ভার থাকলেও তা ধরে রাখা যাচ্ছে না এবং এসব ক্ষেত্রে
হন্তারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলগুলো। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোর
কর্তৃপক্ষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডে যদি এভাবে বৃক্ষ সংহার হয় তাহলে অন্য সামাজিক
ও সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পরিস্থিতি কী হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। নিকট অতীতে জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের জনৈক পরিচালক সহযোগী একটি দৈনিকের প্রতিবেদকের কাছে
প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় তো কোনো বনভূমি নয়। ভবন নির্মাণের
জন্য কিছু জায়গার বৃক্ষ কাটতেই হচ্ছে।’ আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ একজন দায়িত্বশীলের
এমন মন্তব্যে শুধু বিস্মিত নয়, তার পরিবেশ-প্রতিবেশ জ্ঞান নিয়েও প্রশ্ন তুলতে চাই।
আমাদের স্পষ্ট
দাবি, জাহাঙ্গীরনগরে সবুজ ও জলাশয়ের প্রতি এত আক্রোশ কেন, এর জবাবদিহি করতেই হবে। মানুষ
ও প্রকৃতির সুরক্ষায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। যাদের দায়িত্বজ্ঞান নেই, তারা দায়িত্বশীল
পদে কীভাবে বসেন আমরা এ প্রশ্নও রাখতে চাই। পরিবেশবাদীরা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মাত্রাতিরিক্ত
হারে বৃক্ষনিধনকেও অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। বাস্তুতন্ত্রের এ ধরনের ক্ষতির
প্রভাব নিশ্চয়ই সুদূরপ্রসারী। ইতঃপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছিল, জাহাঙ্গীরনগরে বৃক্ষরোপণ
কর্মসূচি শুধু খাতাকলমের হিসাবেই সীমাবদ্ধ। সেখানে যে পরিমাণ উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে
পরিকল্পিত উপায়ে অবকাঠামো অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বৃক্ষনিধন না করেও করা সম্ভব।
আমরা জানি, জাহাঙ্গীরনগরে ২০১৯ সালে বৃক্ষব্যবস্থাপনা নামে একটি কমিটি গঠন করা হয়।
কিন্তু সংবাদমাধ্যমেই জানা গিয়েছিল, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বৃক্ষব্যবস্থাপনা এবং
পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেনি কিংবা কমিটির কাছে কোনো পরামর্শও চায়নি!
আমরা জানি না, লোকদেখানো বা প্যাডসর্বস্ব এমন কমিটিরই বা কী প্রয়োজন?
আমাদের আরও দাবি,
উন্নয়ন প্রকল্প হতে হবে পরিবেশবান্ধব। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায়
যখন অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে তখনও জাহাঙ্গীরনগরে উন্নয়নের নামে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন
অব্যাহত রয়েছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নৈসর্গিক অপরূপ রূপে গড়ে ওঠা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়নের নামে যেভাবে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন চলছে, তা কর্তৃপক্ষের
অপরিণামদর্শিতা বৈ কিছু নয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক ও অবকাঠামোগত অবস্থান সম্পূর্ণ
ভিন্ন এবং বৈচিত্র্যময় হলেও তা আজ বহুমুখী অভিঘাতে পরিবেশ ও প্রকৃতিকে করে তুলছে চরম
বিপদাপন্ন। আমরা আশা করি, বিলম্বে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বৃক্ষ রক্ষা, রোপণ
ও পরিচর্যার ব্যাপারে সংবিৎ ফিরবে। স্যার জগদীশ বসু যথার্থই বলে গেছেন, ‘গাছ কাটা আপনার
নখ কাটার মতো নয়, তবে তা শ্বাস কাটানোর মতো।’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ
কি এর মর্মার্থ অনুধাবণ করতে সক্ষম?