সংসদে সংশোধিত শ্রম বিল পাস
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০২৩ ১৯:০০ পিএম
আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৩ ২১:৩১ পিএম
জাতীয় সংসদ। ফাইল ছবি
ঢাকা ও গাজীপুরে পোশাকশ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলনের মধ্যে জাতীয় সংসদে শ্রম আইন সংশোধনের বিল পাস হয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে কয়েকজন সংসদ সদস্য শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
সংশোধিত বিল অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের মোট সংখ্যা তিন হাজার পর্যন্ত হলে ট্রেড ইউনিয়ন করতে ২০ শতাংশ শ্রমিকের সম্মতি লাগবে। মোট শ্রমিকের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি হলে শতকরা ১৫ শতাংশের সম্মতি থাকতে হবে। এই বিধানসহ শ্রম আইনের বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংশোধনী এনে ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল-২০২৩’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ নভেম্বর) বিলের ওপর আনা জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে প্রেরণ ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তি শেষে বিলটি পাস হয়।
বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কমপক্ষে ২০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষরযুক্ত আবেদন লাগে। এখন সেটিকে ভাগ করে দেওয়া হলো। এর আগে বিল পাসের আলোচনায় অংশ নেন সংসদে বিরোধী দলের সদস্য ফখরুল ইমাম, রওশন আরা মান্নান, হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, রুস্তম আলী ফরাজী, কাজী ফিরোজ রশীদ ও স্বতন্ত্র সদস্য রেজাউল করিম বাবলু।
আলোচনায় অংশ নিয়ে পোশাকশ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবি জানান কয়েকজন সংসদ সদস্য। জাতীয় পার্টির শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ’যে শিল্পে কাজ করে একজন শ্রমিক ৩০ দিন খেতে পারেন না, বাচ্চার স্কুলের বেতন দিতে পারেন না, ২০ দিনের মাথায় বেতন শেষ হয়ে যায়, সেই শিল্পের বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ’শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর ঝুঁকি নিতে হবে। পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে মূল্য বাড়াতে হবে। শ্রমিক স্বস্তিতে না থাকলে দেশ স্বস্তিতে থাকবে না। একটা খাতের উন্নয়ন হচ্ছে মানে হলো সে খাতের শ্রমিকদেরও উন্নয়ন করতে হবে। আমরা গার্মেন্টস মালিকদের চকচকে বাড়ি দেখি, কারখানাও চকচকে দেখছি। গার্মেন্টস শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের উন্নতি দেখছি না। সকালে যখন হাঁটি তখন দেখি হাজার হাজার মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সবাই লিকলিকে। কারও স্বাস্থ্য ভালো না। খেতে পারে না ঠিকমতো।’
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ’পোশাকশ্রমিকরা অনেক দুর্ঘটনার শিকার হন। কিন্তু মালিকপক্ষ সেভাবে যত্নশীল নয়। বাচ্চাদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার নেই। হাসপাতাল নেই। বেতন–ভাতা কম। অনেক সমস্যায় জর্জরিত শ্রমিকরা। এ দিকটা খেয়াল করা দরকার। মালিকরা টাকার পাহাড় গড়বে আর শ্রমিকরা প্রয়োজনমতো অর্থ পাবেন না, তা মানবিক নয়।’
রওশন আরা মান্নান বলেন, ’কিছু গার্মেন্টস মালিকের অনেক টাকা। তারা বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করেছেন। শ্রমিকদের অনেক কষ্ট।’
ফখরুল ইমাম বলেন, ’আজকে গার্মেন্টস শিল্প খুব মুশকিলে আছে। সারা দিন কাজ করে নিজের খরচটুকু উপার্জন করা না গেলে সেই কাজটার সার্থকতা থাকে না। সেটা জোর করে কাজ করার শামিল হয়। এদিকে সরকার ও গার্মেন্টস মালিকদের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।’
২০০৬ সালে দেশে প্রথম শ্রম আইন হয়। এরপর আইনটি একাধিকবার সংশোধন করা হয়। আইনটি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কিছু পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগ ছিল। সরকার চলতি মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এই আইন আবার সংশোধন করল। বিলে বলা হয়েছে, একই মালিকের অধীন একাধিক প্রতিষ্ঠান যদি একই শিল্প পরিচালনার উদ্দেশ্যে একে অপরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও সম্পর্কযুক্ত হয়, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান যেখানেই স্থাপিত হোক না কেন, তা একটি প্রতিষ্ঠান বলেই গণ্য হবে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানপুঞ্জে ট্রেড ইউনিয়ন করার ক্ষেত্রেও সংশোধনী আনা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানপুঞ্জ বলতে কোনো নির্ধারিত এলাকায় একই ধরনের কোনো নির্ধারিত শিল্পে নিয়োজিত এবং অনধিক ২০ জন শ্রমিক নিযুক্ত আছেন—এ ধরনের সব প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়।
বিদ্যমান আইনে বলা আছে, প্রতিষ্ঠানপুঞ্জে ট্রেড ইউনিয়ন করতে হলে সেখানকার মোট শ্রমিকের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ এর সদস্য হতে হবে। নতুন পাস করা আইনে বলা হয়েছে, এক্ষেত্রে ২০ শতাংশ শ্রমিক সদস্য হলে ট্রেড ইউনিয়নের অনুমোদন মিলবে। বিলে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি আট দিন বাড়িয়ে ১২০ দিন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো মালিক তার প্রতিষ্ঠানে সজ্ঞানে কোনো নারীকে তার সন্তান প্রসবের অব্যবহিত পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে কোনো কাজ করাতে পারবেন না বা কোনো নারী ওই সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন না।
একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদের বিধানাবলি হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষেত্রে যেভাবে প্রযোজ্য হয়, শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রেও সেভাবে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে সরাসরি আপিল বিভাগে। এদিকে আজ সামরিক আমলে জারিকৃত ‘দ্য বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক প্র্যাক্টিশনার্স অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৩’ রহিত করে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা শিক্ষা বিল, ২০২৩’ পাস হয়েছে। একই দিন ‘লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বিল, ২০২৩’ পাস হয়েছে।