জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০১:১৯ এএম
আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১০:৫৮ এএম
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফোকাস বাংলা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাত পরিহারে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আজ আপনাদের সকলের কাছে, বিশ্ব নেতাদের কাছে আমার আবেদন, যুদ্ধ, স্যাংশন ও সংঘাতের পথ পরিহার করুন এবং আমাদের জনগণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থায়ী শান্তি, মানবজাতির কল্যাণ এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করুন।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৮তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বনেতাদের প্রতি এই আহ্বান জানান। বাংলাদেশ সময় শুক্রবার (২২ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত লিখিত ভাষণ দেন তিনি। পূর্ণাঙ্গ ভাষণ থেকে নির্বাচিত অংশ পড়ে শোনান।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে গুরুত্ব পেয়েছে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রোহিঙ্গা সংকট, জনগণের উন্নয়নে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সমৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাব, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও জাতিসংঘের অভিষ্ট ২০৩০ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং নিপীড়িত ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠী।
রোহিঙ্গা সংকট ইস্যু
জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গত মাসে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচূত হওয়ার ছয় বছর পূর্ণ হয়েছে। সম্পূর্ণ মানবিক কারণে আমরা অস্থায়ীভাবে তাদের আশ্রয় দিয়েছি।
পরিস্থিতি এখন আমাদের জন্য সত্যিই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। প্রত্যাবাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক হতাশার জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতি সম্ভাব্য মৌলবাদকে ইন্ধন দিতে পারে। এই অবস্থা চলমান থাকলে এটি আমাদের আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তিনি বলেন, বাস্তুচূত রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায় এবং সেখানে তারা শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে আগ্রহী। আসুন, আমরা এই নিঃস্ব মানুষের জন্য তাদের নিজের দেশে ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করি।
মানবাধিকার প্রসঙ্গ
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেন, আজ এই অধিবেশনে আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করতে চাই যে, বাংলাদেশ সংবিধানের আলোকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে যাবে।
শান্তিরক্ষা কার্যক্রম
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে পূর্ণ সমর্থন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, শান্তি বিনির্মাণ কমিশনে নেতৃত্ব প্রদানের মাধ্যমে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় কাজ করে যাচ্ছি। জাতিসংঘের প্রতিরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়নে জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ কমিশনের কার্যক্রমকে আমরা পুরোপুরি সমর্থন করি।
সামাজিক নিরাপত্তা
নিজ দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসহায় নারী, বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এবং সমাজের অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারিত করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সুবিধা পাচ্ছে। এ বছর আমরা সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছি।
দারিদ্র্য হ্রাসে সরকারের সাফল্য
করোনা মহামামারি, মানবসৃষ্ট সংকট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তার সরকার ২০০৬ সালের দারিদ্র্যের হার ৪১ দশমিক ৫ থেকে ২০২২ সালে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে বলে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের অবহিত করেন।
এসডিজি ও ২০৩০ উন্নয়ন কর্মসূচি
সহাস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জনে সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনে অবিচলিত অগ্রগতি সাধন করেছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। কিছু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা বিশ্বাস করি, এসডিজি সম্মেলনের ঘোষণা ২০৩০ উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ার আহ্বান
বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আর্থিক অবকাঠামো লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে যেমন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তেমনি এটি সংকটের সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক চাহিদা মেটাতেও সক্ষম নয়। বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ এমন একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক অবকাঠামো আমাদের জরুরিভাবে প্রয়োজন, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশেষ ছাড়ে, কম খরচে, কম সুদে এবং ন্যূনতম শর্তে অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করবে।
৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি প্রণোদনা প্যাকেজ প্রস্তাবনার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা এই প্রস্তাবনার দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি করছি।
এ প্রসঙ্গে, আগামি বছর সামিট অব দ্য ফিউচার’ আহ্বান করার উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
নারী ও শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে জাতিসংঘকে জানিয়েছেন, ২০১০ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করছে তার সরকার। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি, বৃত্তি এবং এককালীন অনুদান পাচ্ছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তার সরকারের বিভিন্ন কর্মক্রম তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কক্সবাজারে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাস্তুচ্যূত মানুষের জন্য বিশ্বের সবচেয় বড় আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। সেখানে ৪ হাজার ৪০৯টি উদ্বাস্তু পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ ১৩৯টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ বাস্তবায়ন করছি। আমরা ধীরে ধীরে একটি জলবায়ুর ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে জলবায়ু সহনশীল দেশে পরিণত হওয়ার জন্য কাজ করছি।
তবে আমরা প্রধান কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলোকে উচ্চাভিলাষী এনডিসিএস গ্রহণ ও বাস্তবায়নের আহ্বান জানাই। উন্নত দেশগুলোকে অবশ্যই ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।
আশ্রয় প্রকল্প
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের জন্য ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’ তার সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগ বলে বর্ণনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জাতিসংঘে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৮ লাখ ৪০ হাজার পরিবারের ৫০ লাখ মানুষ বিনামূল্যে ঘর পেয়েছে।
কৃষ্ণ সাগর দিয়ে শস্য রপ্তানির ইস্যু
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন যে ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ (কৃষ্ণ সাগর দিয়ে শস্য রপ্তানি উদ্যোগ) অকার্যকর হয় পড়েছে। এ ব্যবস্থার দ্রুত পুনরুদ্ধারের জন্য আমি সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানাচ্ছি। আমি জরুরি অবস্থা মোকাবিলার জন্য আঞ্চলিক ‘খাদ্য ব্যাংক’ চালু করার প্রস্তাব করছি।
স্মার্ট বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারের স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে গৃহীত উদ্যোগ সম্পর্কে বিশ্বনেতাদের অবহিত করেন। তিনি বলেন, আমার সরকার বিপুল বিনিয়োগ করেছে এবং এর মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশকে এমন একটি উচ্চ আয়ের, দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত দেশে পরিণত করতে চাই যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং নিত্য নতুন উদ্ভাবনের পথ উন্মুক্ত করবে।
কমিউনিটি ক্লিনিক
বাংলাদেশে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পেরেছে বলে ভাষণে উল্লেখ করেছেন শেখ হাসিনা। এই মডেল অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ অনুকরণ করতে পারে।
বিবিএনজে প্রসঙ্গ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জাতিসংঘের সাগর সম্পর্কিত আইন অনুযায়ী দেশগুলোর জাতীয় অধিকারভূক্ত এলাকার বাইরে সামুদ্রিক জৈব বৈচিত্র্যের সংরক্ষণ এবং টেকসই ব্যবহারের জন্য বিবিএনজে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। বাংলাদেশ সম্প্রতি তার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক’ প্রকাশ করেছে, যেখানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অন্তর্ভুক্তিমূলক, টেকসই এবং সহযোগিতার মাধ্যমে সমুদ্রপথ এবং সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ ইস্যু
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার সরকার চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করেছে। আমরা কখনই সন্ত্রাসবাদ কার্যক্রম সংঘটনে বা অন্যের ক্ষতি সাধনে আমাদের ভূমি ব্যবহৃত হতে দেই না। তিনি বলেন, সাম্প্রতিককালে পবিত্র কুরআন শরীফ পোড়ানোর মতো জঘন্য অপরাধ আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
ফিলিস্তিনিদের পাশে বাংলাদেশ
শেখ হাসিনা বলেন, ফিলিস্তিনের ওপর বিপর্যয় নিয়ে আসা ‘নাকবা’র ৭৫ বছর পূর্ণ হলো এ বছর। ফিলিস্তিনি জনগণের বৈধ অধিকার অর্জনের পথ এখনও আশার মুখ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফিলিস্তিনের জনগনের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পাশে থাকবে।
পচাত্তরের হত্যাকাণ্ড
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরেন জাতিসংঘে। ভাষণে তিনি বলেন, আমি নিজে নিপীড়িত এবং যুদ্ধ ও হত্যার নৃশংসতার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যুদ্ধ, হত্যা, অভ্যুত্থান ও সংঘাতের ভয়াবহতার কারণে মানুষ যে বেদনা ও যন্ত্রণা সহ্য করে তা অনুভব করতে পারি।