× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অনিয়মে বড় ক্ষতি পায়রা বন্দরে

এম আর মাসফি

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ০৮:৪০ এএম

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৫:০২ পিএম

পায়রা বন্দরের ফটক। সংগৃহীত ফটো

পায়রা বন্দরের ফটক। সংগৃহীত ফটো

‘পায়রা বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে অনিয়ম করা হয়েছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২৮৬ কোটি টাকা। যেমন টাগবোটের খবর না থাকলেও বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। 

এ ছাড়া প্রকল্পটিতে ১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা খরচেও পাওয়া গেছে বিস্তর অনিয়ম। তাই ১৩টি অডিট আপত্তি তুলেছে পরিবহন অডিট অধিদপ্তর। সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। সেই সঙ্গে সংস্থাটি অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দিয়েছে। তা ছাড়া চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে ১ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকার কাজ করা হয়েছে। 

এই অনিয়ম কি শুধু অডিটের মাধ্যমেই শেষ হবে নাকি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবেÑ জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘যদি কারও গাফিলতির কারণে এই অনিয়মগুলো হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি ঢাকার বাইরে আছি, অফিসে এসে দেখে বিস্তারিত বলতে পারব।’ 

এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোস্তফা কামাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এসব বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। আপনি পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন। আর অডিট আপত্তির অনেক সময় কোনো ভিত্তিও থাকে না। কাগজপত্র সবকিছু না দেখেও অনেক সময় আপত্তি দিয়ে দেয়। তারা যতটুকু কাগজপত্র দেখে ততটুকু মন্তব্য করে। আবার যখন কাগজপত্র দেয় তখন নিষ্পত্তিও হয়। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে কি না সেটা আমি বলতে পারব না। এজন্য পায়রা পোর্টের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন। আর অডিট আপত্তি কোনো অনিয়ম না।’

এ বিষয়ে প্রকল্পটির পরিচালক ক্যাপ্টেন এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে প্রকল্প পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

সরকারের আর্থিক ক্ষতি 

আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকল্পটিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনার (ডিপিপি) নিয়ম এবং সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা (পিপিআর) না মানায় সরকারের ২৮৬ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অগ্রিম বিল পরিশোধের সময় আয়কর ও ভ্যাট কাটা হয়নি। অন্যান্য বিল পরিশোধে কম ভ্যাট কাটা হয়েছে। ফলে সরকারের ২৬ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে বিলম্ব জরিমানা ব্যতীত বিল পরিশোধ করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯০ লাখ ২০ হাজার টাকা। পিপিআর-২০০৮ এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ঠিকাদার বীমা না করায় প্রিমিয়ামের ভ্যাট বাবদ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা।

এ ছাড়া ডিপিপিতে সংস্থানকৃত অর্থের চেয়ে অধিক মূল্যে চুক্তি করে বিল পরিশোধ করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২০ কোটি ৪৮ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। প্রকৃত আয়তন অপেক্ষা অতিরিক্ত আয়তনে ইম্প্রুভ সাবগ্রেডের পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত করে বিল পরিশোধ করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৫ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। চুক্তিকৃত পরিমাণ অপেক্ষা অধিক বিল পরিশোধ করায় সরকারের ১ কোটি ১১ হাজার টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআইডব্লিউটিএ) সঙ্গে সমন্বয় না করে প্রয়োজনীয় নিরূপণ ব্যতীত বার্থিং-আনবার্থিংয়ের জন্য ইয়ার্ড ও জেটি নির্মাণের পূর্বেই সংযোগ নদীর ড্রেজিং সম্পন্ন করে বিল পরিশোধ করায় সংস্থার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ২২৭ কোটি ৫৯ লাখ ৯১ হাজার টাকা। পিপিআর-২০০৮-এর নির্দেশনা লঙ্ঘন করে গাড়ির ব্র্যান্ড উল্লেখ করে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে প্রকৃত সরবরাহকারী ব্যতীত পূর্ত কাজের ঠিকাদারের মাধ্যমে গাড়ি কেনায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অধিগ্রহণকৃত ভূমিতে অবস্থিত ঘরবাড়ি, গাছপালা ও অন্যান্য স্থাপনা নিলামে বিক্রি না করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১৭ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা। নিলামে বিক্রি না করে বিনামূল্যে ঘরবাড়ি, গাছপালা এবং অন্যান্য স্থাপনা অপসারণ করায় ভ্যাট ও আয়কর বাবদ সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।

খরচে অনিয়য়ে ১৮৪০ কোটি টাকা 

প্রকল্পটিতে ১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকার বিভিন্ন খরচে অনিয়ম করা হয়েছে। এর মধ্যে পিপিআর-২০০৮ এবং চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে কার্য সম্পাদন করে অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে ১ হাজার ৫৮৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির পরিবর্তে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে অদক্ষ ঠিকাদারের মাধ্যমে কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে অনিয়মিত ব্যয় করা হয়েছে ২২৬ কোটি ৩৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা, যা ডিপিপির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একটি টাগবোট কেনায় ১৮ মাসের মধ্যে সরবরাহের চুক্তি করে ১২ মাস সময় বাড়ানোর পরও অননুমোদিতভাবে ৩৬ মাস অতিবাহিত হলেও টাগবোট পাওয়া যায়নি। তবে বোট না পেলেও ৩০ কোটি ৮৯ লাখ ৪৮ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

আইএমইডি তাদের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলেছে, প্রকল্পের শুরু হতে জুন ২০২২ পর্যন্ত সময়ের ওপর পরিবহন অডিট অধিদপ্তর থেকে ১৩টি অডিট আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে। আপত্তিগুলোর অধিকাংশই গুরুতর আর্থিক অনিয়মের পর্যায়ভুক্ত। অডিট আপত্তি সংশ্লিষ্ট আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়মের কারণ উদঘাটন করে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় সভার মাধ্যমে অডিট নিষ্পত্তির দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

সময় বাড়াতে আইএমইডির সুপারিশ 

আইএমইডির প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, পায়রা বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা সুবিধাদির উন্নয়ন ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্পটি জুলাই ২০১৫ থেকে জুন ২০২৩ মেয়াদে বাস্তবায়ন হচ্ছে। ইতোমধ্যেই প্রকল্পটি দুবার সংশোধন হয়েছে। প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে যায় ৩ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা এবং দুই বছর সময় বাড়িয়ে জুন ২০২০ মেয়াদে বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। 

তবে নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় ফের ১ হাজার ২৪ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। জুন ২০২২ মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় ফের এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ শেষ না হলে আরও এক বছর অর্থাৎ জুন ২০২৪ পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। 

জানা গেছে, মে ২০২৩ পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৮২ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৮৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

সময় বাড়ানোর বিষয়ে আইএমইডি প্রকল্পটি পরিদর্শন করে কয়েকটি সুপারিশ যথাযথ পালন সাপেক্ষে জুন ২০২৪ পর্যন্ত এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।

সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী ৬ হাজার ৫৬২ দশমিক ২৭ একর ভূমি অধিগ্রহণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে অধিগ্রহণকৃত ও প্রস্তাবিত মোট জমির পরিমাণ ৬ হাজার ৩৬৭ দশমিক ০৬ একর। ১৯টি এলএ কেসের বিপরীতে দখলপ্রাপ্ত জমির পরিমাণ ৫ হাজার ৩৯০ দশমিক ৪৪ একর এবং ৯৭৬ দশমিক ২৯ একর ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম চলমান আছে। প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক ও স্থানীয়দের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে।

সুপারিশে আরও বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রকল্পের ১৪টি প্যাকেজের আওতায় সর্বমোট ৩ হাজার ২০০টির মধ্যে ২ হাজার ৯১২টি বাড়ি নির্মাণ সম্পন্ন অথবা চলমান রয়েছে। নির্মিত ২ হাজার ২৩১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোয় ইতোমধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট বাড়ি নির্মাণের জটিলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং দ্রুত নির্মাণ শেষে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের মধ্যে বরাদ্দ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ পায়রা বন্দরের ন্যূনতম অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে সীমিত আকারে বন্দরের কার্যক্রম চালুকরণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ বন্দর গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ। ভূমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আনুমানিক ৩ হাজার ৫০০ পরিবারের পুনর্বাসন ও ৪ হাজার ২০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। জাতীয় মহাসড়ক এন-৮-এর সঙ্গে পায়রা বন্দরের যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ এবং আউটার বার ও নদীপথে চিহ্নিত বারগুলোর প্রয়োজনীয় ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নৌপথে মালামাল ও কন্টেইনার পরিবহন নিশ্চিত করা।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা