প্রধানমন্ত্রীর তিন দেশ সফর
রাশেদ মেহেদী
প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৩ ১২:০৫ পিএম
আপডেট : ১৩ মে ২০২৩ ১২:৪৯ পিএম
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একই যাত্রায় জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফরের অর্জন ও কূটনৈতিক সাফল্যের নানা দিক নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। যার ভিন্ন একটি দিক হচ্ছে, এবারের এ সফর এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জাপান থেকে শুরু হলেও তা ছিল পশ্চিমমুখী।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এশিয়ায় জাপান পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ। তাই পশ্চিমমুখী এ সফর যেমন জাপান হয়ে এগিয়েছে, তেমনি সফর শুরুর আগে ঘোষণা করা হয়েছে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা। আর এ যাত্রা শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে যুক্তরাজ্য সফরের মধ্য দিয়ে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠকের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি (আইপিএস) বিষয়ক আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত এ ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিতে বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে খুবই স্বাভাবিক যে, এই স্ট্র্যাটেজি-বিষয়ক আলোচনায় বাংলাদেশের কার্যকর অংশগ্রহণকে ভারত ইতিবাচকভাবেই নেবে। কিন্তু বাংলাদেশের অপর বৃহৎ অর্থনৈতিক মিত্র চীন এই ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির বিপরীতে পৃথকভাবে বেল অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) গড়ে তুলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্রাটেজি-বিষয়ক আলোচনা এবং যৌথ বিবৃতিতেও তা গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপনের বিষয়টি চীনের জন্য একটি চিন্তার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। যদিও এটিও লক্ষণীয়-- চীন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্ভবত চীন বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ করছে।
সফরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে স্নায়ুযুদ্ধ
প্রসঙ্গত, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে দুই দশক ধরে ভারত ও চীনের প্রভাববলয় স্থাপন করা নিয়ে এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের অন্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর স্পষ্টতই এ স্নায়ুযুদ্ধ নানা প্রভাব ফেলছে। নিকট অতীতে শ্রীলঙ্কা ও নেপালে ক্ষমতার পালাবদলে ভারত ও চীনের ভূমিকার মধ্য দিয়ে এ স্নায়ুযুদ্ধের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশও এ প্রভাববলয়ের বাইরে নেই। ২০০০ সাল থেকে বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যে চীনের উত্থানের পর প্রথম এক দশক বিভিন্ন দেশে কেবল বাণিজ্য সম্প্রসারণেই গুরুত্ব দিয়েছে দেশটি। কিন্তু দ্বিতীয় দশকে এসে চীন নীরবে হলেও এক ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু করে। গত বছর ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীনের সেই নীরব প্রচেষ্টা সরব ও প্রকাশ্য হয়। চীন খোলাখুলি রাশিয়ার ভূমিকাকে সমর্থন করেছে।
সাম্প্রতিককালের অন্যতম কূটনৈতিক ঘটনা হলো, বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তীব্র প্রতিযোগিতার সূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আইপিএস এবং চীনের বিআরআই গঠনের উদ্যোগ। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে নানা কারণে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও আগের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যার ফলে কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে মিত্রদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইপিএস এবং চীনের বিআরআই গঠনের বিষয়টিও নতুন মাত্রা পেয়েছে। আইপিএস নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান, আলোচনা এবং আগ্রহের বিষয়টি চীন ও ভারত উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছেও। কারণ ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে এ অঞ্চলে। আইপিএসের বিষয়ে ইতিবাচক দৃষ্টি পোষণকারী তিনটি রাষ্ট্র সফরের পরিপ্রেক্ষিতে চীনের অবস্থান কিংবা এ সফর সম্পর্কে চীনের মূল্যায়ন তাই এখন কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও ব্যাপক আগ্রহের বিষয়।
‘বাংলাদেশ প্রাধান্য দিচ্ছে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে’
এ বিষয়ে অভিমত দিতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ যে ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখা ঘোষণা করেছে, সেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার বৈঠকের পর প্রকশিত যৌথ বিবৃতিতেও আইপিএস নিয়ে আলোচনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। এ বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই চীন গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করবে। যদিও এখন পর্যন্ত চীনের প্রকাশ্য কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কিন্তু এটিই স্বাভাবিক যে, চীন আইপিএসকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের যেকোনো রাষ্ট্রের অবস্থানকেই যথেষ্ট গুরুত্ব দেবে। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান তো আইপিএসের পক্ষেই। তা ছাড়া ভারত কোয়াডের অন্তর্ভুক্ত দেশ। অতএব বাংলাদেশ আইপিএস নিয়ে যে আলোচনা করেছে, তাতে ভারতের খুশি হওয়ারই কথা।’
‘চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আইপিএস নিয়ে বাংলাদেশ যে অবস্থান তুলে ধরেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে চীনের অখুশি হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। অতএব বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাব পড়ারও আশঙ্কা নেই। তার কারণ বাংলাদেশ এ মুহূর্তে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর দিচ্ছে এবং সে বিষয়টিই বাংলাদেশের ইন্দো-প্যাসিফিক রূপরেখায় স্থান পেয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন খুবই ভালো। চীনের বিআরআইয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশের ভিন্ন মাত্রায় যুক্ততা আছে। তাই চীনের দিক থেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কিছু দেখা যাচ্ছে না।’
ড. দেলোয়ার বলেন, ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে পরীক্ষিত বন্ধু ভারত। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা ভারতের দিক থেকেও ইতিবাচক। অতএব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে আরও কিছু ইতিবাচক অনুষঙ্গই যুক্ত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের মধ্য দিয়ে।’