রবীন্দ্রজয়ন্তী
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৩ ১২:২৪ পিএম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৩ ১২:২৫ পিএম
১৯১৩ সালে নোবেল সাহিত্য পুরষ্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফটো সংগৃহীত
পঞ্চাশ পূর্ণ করে একান্নতে পদার্পণের বছরে, ১৯১২ সালে শান্তিনিকেতনে সতীর্থরা প্রথম সর্বজনীনভাবে, সাড়ম্বরে উদযাপন করেছিলেন রবীন্দ্রজয়ন্তী। তবে জীবদ্দশায় বিশ্বকবির শেষ জয়ন্তী পালিত হয়েছিল ১৯৪১ সালে- তাঁর জীবনের শুরুর দিককার মতো অনাড়ম্বরভাবে।
শান্তিনিকেতনের ‘উদয়নে’ অবস্থানরত কবি এই জন্মদিন উপলক্ষে লিখেছিলেন জীবনচর্চার গভীর প্রাপ্তির নির্যাস। তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার এ জন্মদিন মাঝে আমি হারা/আমি চাহি বন্ধুজন যারা/তাহাদের হাতের পরশে/মর্ত্যের অন্তিম প্রীতিরসে/নিয়ে যাব জীবনের চরম প্রসাদ/নিয়ে যাব মানুষের শেষ আশীর্বাদ।’
তারপর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিরোধান ঘটেছে বটে, কিন্তু জয়ন্তীযাত্রা শেষ হয়নি। প্রতিদিনই নব আনন্দে নব প্রত্যয়ে বাঙালির জীবনে আবির্ভাব ঘটে চলেছে তাঁর। প্রতিবছরই উদিত হচ্ছে তাঁর জন্মের শুভক্ষণ। আজ সোমবার, ২৫ বৈশাখ, সেই চির-নূতনেরে স্বাগত জানানোর দিন-আজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬২তম জন্মবার্ষিকী।
বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে এই বিস্ময় প্রতিভার হাত ধরে। বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্মের প্রেরণাদায়ী ভূমিকা।
১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখের এই দিনে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে সারদাসুন্দরী দেবী ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। লেখালেখি শুরু করেন মাত্র আট বছর বয়সেই। বিচিত্র তাঁর লেখার বিষয়। সংখ্যায়ও বিপুল। অতুলনীয় সৃজনপ্রতিভায় কাব্য, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, ভ্রমণ, চিঠিপত্র, শিশুসাহিত্যসহ সামগ্রিক বাংলা সাহিত্যকে স্বর্ণময় উজ্জ্বলতা দিয়েছেন তিনি। কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সংগীতচর্চাই নয়, পাশাপাশি শিক্ষাবিস্তার, সাংগঠনিক কর্ম ও সমাজকল্যাণমূলক কাজেও দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রয়েছে তাঁর।
‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। তাঁর লেখা সংগীত কেবল আমাদের বাংলাদেশের নয়, ভারতেরও জাতীয় সংগীত। সংকটে ও সংগ্রামে, শোকে ও উৎসবে বাঙালি বারবার ফিরে যায় রবীন্দ্রনাথের কাছেই।
জন্মের দেড় শতাধিক বছর এবং মৃত্যুর আট দশক পরও রবীন্দ্রনাথ এখনও প্রাসঙ্গিক। এ ব্যাপারে প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘বাঙালীর এই কবি এমন এক সময় জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন রাষ্ট্র ছিল পরাধীন, চিন্তা ছিল প্রথাগত ও অনগ্রসর, বাংলাভাষা ছিল অপরিণত। ...রবীন্দ্রনাথ একাধারে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বমানে উন্নীত করার পাশাপাশি জাতির চিন্তা জগতে আধুনিকতার উন্মেষ ঘটিয়েছেন। বাঙালীর মানস গঠনে পালন করেছেন অগ্রদূতের ভূমিকা। সত্য, সুন্দর, ন্যায় ও কল্যাণের পথে অভিসারী হয়ে ওঠার প্রেরণা যোগানোর মধ্যদিয়ে বাঙালী মননকে বিশ্বমানে উন্নীত করে জাতিকে আবদ্ধ করে গেছেন চিরকৃতজ্ঞতায়। দেড়শত বছর পেরিয়েও কবি আমাদের মাঝে তাই চিরজাগরূক হয়ে আছেন।’
কর্মসূচি
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আজ সোমবার কালজয়ী এই ব্যক্তিত্বকে স্মরণ করা হবে। বিশ্বকবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এবার রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠান হবে রবীন্দ্রস্মৃতিবিজড়িত নওগাঁর পতিসরে। জন্মবার্ষিকী উদ্যাপনে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘সমাজ সংস্কার ও রবীন্দ্রনাথ’। কবিগুরুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জের শাহ্জাদপুর এবং খুলনার দক্ষিণডিহি ও পিঠাভোগে স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করা হবে। এ উপলক্ষে রবীন্দ্রমেলা, রবীন্দ্রবিষয়ক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তিন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কবির চিত্রশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। বাংলা একাডেমিও আলোচনা অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে।
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট আয়োজন করেছে দুই দিনের ‘রবীন্দ্র-উৎসব’। আজ সোম ও আগামীকাল মঙ্গলবার ছায়ানট মিলনায়তনে প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। দুই দিনের ‘জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত উৎসব’ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা। আগামী শুক্র ও শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে এ উৎসব হবে। এ উপলক্ষে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল হলে আবৃত্তি সংগঠন শ্রুতিঘর আয়োজন করেছে আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘যে গান বলতে ইচ্ছে করে : উচ্চারণে গীতবিতান’।