আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ০৭ মে ২০২৩ ০৮:৪৫ এএম
আপডেট : ০৭ মে ২০২৩ ০৮:৪৬ এএম
ফাইল ফটো
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঢেলে সাজানো হচ্ছে পুলিশ প্রশাসন। তৈরি হচ্ছে পুলিশ সুপার (এসপি) ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের উপযুক্ত তালিকা (ফিটলিস্ট)।
যাদের ওপর ‘আস্থা’ রাখা যায়, এমন কর্মকর্তাদের ইউনিটগুলোতে পদায়নের লক্ষ্যে পুলিশে বড় ধরনের পদোন্নতি ও রদবদলের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর আগে পদায়ন হওয়া অনেক কর্মকর্তাকে পরিপক্ব (ম্যাচিউরিটি) সময়ের আগেই রদবদল করা হচ্ছে।
আগামী সপ্তাহে অন্তত ৪ রেঞ্জ ডিআইজি, ৩ মহানগর কমিশনার ও ১৫ জনের বেশি এসপি রদবদলের আদেশ জারির বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। পুলিশ পলিসিগ্রুপ প্রণীত নীতিমালার আলোকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ প্রশাসন নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ বাড়তি প্রায় ১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বিগত বাজেটের বরাদ্দকৃত অর্থ শতভাগ ব্যয়ের অনুমতির পাশাপাশি এই অর্থ অস্ত্র-গোলাবারুদ কেনা, বিভিন্ন সরঞ্জাম, আধুনিক সফটওয়্যার ও গাড়ি কেনায় ব্যয় করা হবে।
পুলিশের কয়েক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে বড় ধরনের পদোন্নতিরও পরিকল্পনা রয়েছে পুলিশে। বিষয়টিকে বলা যায় ‘নির্বাচনী পদোন্নতি’। পদ না থাকাসহ নানা জটিলতায় পদোন্নতি পাচ্ছেন না অনেক যোগ্য কর্মকর্তা। এতে তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগেই কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে কর্মজীবন শুরু করা একজন ক্যাডার কর্মকর্তার চাকরি জীবনের ১০ বছরের মধ্যেই পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার কথা। প্রয়োজনীয় পদসংখ্যা না থাকায় অনেকে দেড় যুগেও এসপি পদমর্যাদা পান না। নির্বাচনের আগেই সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টি ও শূন্যপদে পর্যাপ্ত পদোন্নতির লক্ষ্যে কাজ করছে পুলিশ।
পুলিশ সদর দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘নির্বাচনী ছকে হাঁটছে পুলিশ প্রশাসন। নির্বাচনের সময় পুলিশ প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে থাকে। নির্বাচন কমিশনের অধীনে যাওয়ার পর যাতে কোনো বিতর্ক না ওঠে সে লক্ষ্যে আগে থেকেই কাজ করছে পুলিশ। তা ছাড়া নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার, হানাহানি, দাঙ্গা-হাঙ্গামাসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা থাকে। বিষয়টি মাথায় রেখে আগে থেকেই প্রস্তুতি চলছে। ওসি বা এসপি পদে দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার পক্ষে হঠাৎ একটি এলাকায় গিয়ে জাতীয় নির্বাচনের মতো পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আগে থেকে এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধের ধরন জানা থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অনেক সহজ হয়। তাই পুলিশ সদর দপ্তর চৌকস ও দক্ষ কর্মকর্তাদের ইউনিটগুলোর দায়িত্বশীল পদে পদায়নের বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের অপর এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনের সময় রেঞ্জ ডিআইজি, মেট্রোপলিটন কমিশনার, জেলার এসপি, মেট্রোপলিটন জোনের উপকমিশনার (ডিসি), থানার ওসি, ফাঁড়ি ও তদন্তকেন্দ্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বড় ভূমিকা থাকে। দেশে বর্তমানে ৮ রেঞ্জ, ৮ মেট্রোপলিটন, ৬৪ জেলা, ২৩৯ সার্কেল, ৬৬৪ থানা, ৫৪৯ ফাঁড়ি ও ২১৫টি তদন্তকেন্দ্র রয়েছে। নির্বাচনের মৌসুমে এসব ইউনিট দায়িত্বশীলদের ভূমিকা অনেক গুরুত্ব বহন করে। তাই কারা এসব ইউনিটে দায়িত্ব পালন করবেন, আগে থেকে তার ফিটলিস্ট তৈরি করা হচ্ছে।
একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬ মাস আগে থেকেই পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে বড় ধরনের রদবদল শুরু হয়েছে। আগামী সপ্তাহখানেকের মধ্যে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনাসহ কমপক্ষে ৪ রেঞ্জ ডিআইজি, গাজীপুরসহ ৪ মেট্রোপলিটন কমিশনার ও ১৫ জেলা পুলিশ সুপারকে বদলির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা রেঞ্জের অন্তত তিনটি, খুলনা রেঞ্জের দুটি ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের অন্তত পাঁচটিসহ বেশ কয়েকটি জেলায় নিয়োগ পাওয়া এসপিদের বদলির ম্যাচিউরিটি টাইমের আগে অর্থাৎ দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে বদলি করার প্রস্তুতি চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের ডিসেম্বরে অথবা আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলে পুলিশ প্রশাসন ইসির অধীনে কাজ করবে। তফসিল ঘোষিত হওয়ার আগে পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে মাঠ প্রশাসনসহ পুলিশের উচ্চপদস্থ বিভিন্ন পদে ব্যাপক রদবদলের কাজ সেরে নিচ্ছে পুলিশ। পাশাপাশি সার্কেল এএসপি, ওসি, ফাঁড়ির ইনচার্জ ও তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জদের বিষয়ে পুলিশ ইন্টারনাল ওভারসাইট (পিআইও) বা পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা ইউনিটের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বিশেষ করে ওসিদের ক্ষেত্রে পদায়ন নীতিমালা অনুসরণ করে অধিকতরও যোগ্য ও চৌকস পরিদর্শকদের থানায় ওসি পদে পদায়ন শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, বেশ কয়েক এসপি ইতোমধ্যে নিজ আওতাধীন এলাকায় সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তারা এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ওইসব জেলায় কনস্টেবল নিয়োগে অনিয়ম বা ঘুষ-দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি। ১০১ টাকা ফি দিয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে অধিকতর যোগ্য প্রার্থীরা কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়েছেন। আওতাধীন এলাকার থানাগুলোতে গণমুখী পুলিশিং ও জনসেবার মান বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ফলে তাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বেশ কিছুদিন আগে পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত বিদ্যমান বিভিন্ন ইউনিটের কিছু পদ বিলুপ্ত করে ঊর্ধ্বতন ধাপে সমসংখ্যক ক্যাডার পদ সৃষ্টির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। সুপার নিউমারারির মাধ্যমে ২৪ ব্যাচের পুলিশ কর্মকর্তারা অতিরিক্ত ডিআইজি এবং ২৮, ২৯, ৩০ ও ৩১ ব্যাচের কর্মকর্তারা পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি চাচ্ছেন।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘অধিকতর যোগ্যরা ভালো জায়গায় পদোন্নতি পাবেন। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পদোন্নতি ও রদবদলের যে তালিকা আসে তা পর্যালোচনা করে পোস্টিং দেওয়া হয়।’
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ থাকবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে। ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা দায়িত্ব পালন করব। অতীতের মতো আগামীতেও পুলিশ পেশাদারিত্বের সঙ্গে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. মনজুর রহমান বলেন, ‘পুলিশকে নতুন করে নির্দেশনা বা ঢেলে সাজানোর কিছু নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা দেখা দিলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সব সময় দেওয়াই থাকে। পুলিশ পিআরবিসহ নিজস্ব আইন অনুযায়ী কাজ করে।’
এদিকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে পুলিশ বিগত অর্থবছরে বরাদ্দ হওয়ার অর্থ শতভাগ ব্যয়ের অনুমতির পাশাপাশি অতিরিক্ত ১ হাজার ২২৫ কোটি ৯৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চিঠির বিষয়বস্তুতে পুলিশ বলেছে- দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং জানমালের নিরাপত্তা বিধানের জন্য জ্বালানি, গোয়েন্দা, অপারেশন ও নিরাপত্তাসামগ্রী ক্রয়ের লক্ষ্যে পুলিশের অনুকূলে এই অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নির্বাচন ও নির্বাচন-পূর্ববর্তী আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশ বাহিনীতে দাঙ্গা দমনসামগ্রী ও অপারেশনাল সামগ্রী সংযুক্ত না হলে আগামীতে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া দুরূহ হবে। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হবে।