প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৩ ১২:৪৭ পিএম
কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া জলবায়ুবিষয়ক বাংলাদেশি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ।
টানা ১৭ দিনের তাপদাহে পুড়েছে দেশ। এ অবস্থায় জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষিতে ক্ষয়ক্ষতির অবস্থা তৈরি হয়েছে। দেশের এমন ক্লান্তিকর পরিস্থিতিতে আবহাওয়া বিষয়ক অগ্রিম তথ্য-উপাত্ত দিয়ে গণমাধ্যমসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছেন কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া জলবায়ুবিষয়ক বাংলাদেশি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ।
সম্প্রতি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির গ্রাজুয়েট ছাত্র সংসদের ২০২৩-২৪ সেশনের জন্য পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। গত ২০২১-২২ সেশনেও তিনি একই দায়িত্ব পালন করেন।
মোস্তফা কামাল পলাশ সম্প্রতি বাংলাদেশের আবহাওয়া ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক আহমাদ আরিফ।
প্রবা: বাংলাদেশের আবহাওয়ার অনেকগুলো দিক নিয়ে আপনার দেওয়া তথ্য মিলে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আপনি এতো আগাম তথ্য কীভাবে সংগ্রহ ও প্রদান করছেন?
মোস্তফা কামাল পলাশ: আমার অর্জিত আবহাওয়া ও জলবায়ু বিজ্ঞান বিষয়ের জ্ঞান ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল, আবহাওয়া ও জলাবায়ু সম্পর্কিত বিভিন্ন সূচক, কৃত্রিম ভূ-উপগ্রহ ও রাডার থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রস্তুত করে থাকি।
প্রবা: আবহাওয়ার বিষয়টি কী শুধুই প্রাকৃতিক? মানুষের এ বিষয়ে কিছুই করার নেই?
মোস্তফা কামাল পলাশ: আবহাওয়া সম্পর্কিত ঘটানা যেমন বন্যা, খরা, বজ্রপাত ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার মতো প্রয়োজনীয় জ্ঞান বা সামর্থ মানুষ এখনও অর্জন করতে পারেনি; কিন্তু এই ঘটনাগুলোর পূর্বাভাস করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে উপরোক্ত ঘটনাগুলো ঘটার পূর্ব থেকে প্রস্তুতি নিয়ে জান ও মালের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রবা: কৃষি আবহাওয়া কৃষকদের কেন কাজে আসছে না। এক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী?
মোস্তফা কামাল পলাশ: কৃষি আবহাওয়া কৃষকদের কেন কাজে আসছে না তার কারণ মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের কাছে আবহাওয়া পূর্বাভাস যথেষ্ট সময় পূর্বে পৌঁছানো হয় না। এক্ষেত্রে প্রধান-প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেশে ভারি বৃষ্টিপাত শুরুর ১ থেকে ২ দিন পূর্বে পূর্বাভাস জারি করা হয়। ভারি বৃষ্টি শুরুর মাত্র ১ দিন পূর্বে কৃষকদের কাছে পুর্বাভাস পৌঁছালেও সেই পূর্বাভাস পেয়ে কৃষক মাঠের শস্য ঘরে তুলতে পারে না। দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের আবহাওয়া পূর্বাভাস ২০২৩ সালেও এসে ব্রিটিশ আমলের প্রচার পদ্ধতি অনুসরণ করে। গণমানুষের বোধগম্য হওয়ার মতো কোনো প্রচারণা পদ্ধতি ব্যবহার করে না। আর একটি সীমাবদ্ধতা হলো- বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস গুরুত্ব দিয়ে প্রচারের চেয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা প্রচারে বেশি আগ্রহী।
প্রবা: কৃষকরা দীর্ঘমেয়াদী অর্থাৎ এক বছর, ছয় মাস বা দেড় বছর পরের আবহাওয়া সংবাদ কেন পাচ্ছে না। এসব পেলে মৌসুম ও সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী ফসল ফলানো ও ক্ষয়ক্ষতি থেকে উতরে উঠা সম্ভব হতো না?
মোস্তফা কামাল পলাশ: বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরে আবহাওয়া বিজ্ঞানের উপর বিশেষায়িত ডিগ্রিধারী ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। যার কারণে দীর্ঘ কিংবা মধ্যমেয়াদী আবহাওয়া পূর্বাভাসের তথ্য তারা সঠিকভাবে প্রচারে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হতে পারে না। সর্বোপরি, আবহাওয়া বিজ্ঞানের প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে-সাথে নিজেদের কারিগরি দক্ষতার উন্নয়নের করতে বেশিভাগ সময়ে পিছিয়ে পড়ে।
প্রবা: দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ মাছধরা পেশায় (জেলে) সম্পৃক্ত। সঠিক ও দীর্ঘমেয়াদী তথ্যের অভাবে প্রতিবছর বহুসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। সাগরে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে উত্তরণে আবহাওয়া অধিদপ্তরের কী কী কার্যক্রম নেয়া প্রয়োজন?
মোস্তফা কামাল পলাশ: বর্তমানে আবহাওয়া পূর্বাভাস মডেল হতে সর্বোচ্চ ১৬ দিনে আবহাওয়া পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ৭ দিন পূর্বের পূর্বাভাস সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। ৩ দিন পূর্বের পূর্বাভাস প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নির্ভুল হয়ে থাকে। ফলে ২০২৩ সালে সাগরে নৌকাডুবি হয়ে জেলেদের প্রাণ হারানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
প্রবা: ভারত, অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাস্ট্রের কৃষি আবহাওয়া খুবই শক্তিশালী। এতে কৃষকরা ভালো লাভবান হচ্ছে আমরা কেন পিছিয়ে আছি?
মোস্তফা কামাল পলাশ: আমি শত-শতবার বলেছি গত ১০ বছর ধরে আজকে আবারও বলছি; দেশব্যাপী ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষি চালু করতে পারলে মাত্র ৫ বছরের মধ্যে দেশের কৃষক পরিবারের মধ্যে দারিদ্রতার পরিমাণ কমপক্ষে ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। কৃষকদের ফসল বোনার জন্য অনুকূল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছাতে হবে। ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস পৌঁছাতে হবে কৃষকদের কাছে, যাতে করে সম্ভাব্য ভারি বৃষ্টির ১ থেকে ৩ দিন পূর্বে থেকে কৃষকরা জমিতে কৃত্রিম সেচ না দেয়। এতে করে কৃষকদের জ্বালানি খরচ কমে যাবে। সরকারের জ্বালানিতে ভূর্তুকীর পরিমাণ কমে যাবে। ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস পৌঁছাতে হবে কৃষকদের কাছে, তাহলে জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকবে। ফলে কৃষকের সার প্রয়োগের পরে বৃষ্টির পানিতে সার ভেসে যাওয়া হতে রক্ষা পাবে।
প্রবা: আমাদের আবহাওয়া স্টেশনগুলো কি সক্ষমতার দিক দিয়ে খুবই পেছনে?
মোস্তফা কামাল পলাশ: আমাদের অনেক আবহাওয়া স্টেশন অটোমেটিক না। ফলে প্রতি ৩০ মিনিট কিংবা প্রতি ঘণ্টায় কোনো স্থানের তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বায়ুর গতিবেগ সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায় না। এই তথ্যগুলো ছাড়া আবহাওয়া সম্পর্কিত মডেলগুলো সঠিক আবহাওয়া পূর্বাভাস দিতে পারবে না।
প্রবা: আবহাওয়ার তথ্য প্রান্তিক মানুষের কাছে নিয়ে যেতে অধিদপ্তরের কি করা প্রয়োজন?
মোস্তফা কামাল পলাশ: গ্রামের কৃষক, কামার, কুমার, মুদি দোকানদারদের বুঝার মতো ভাষায় আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রচার করতে হবে গণমাধ্যমে। বিশেষ করে টেলিভিশনে।যেমন করে রাত ৮টা কিংবা ১০টার সংবাদ প্রচার করার হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে।
প্রবা: প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ বজ্রপাতে মারা যায় এ নিয়ে অধিদপ্তরের কোনো কাজ কী করার আছে?
মোস্তফা কামাল পলাশ: বাংলাদেশের বিভিন্ন অধিদপ্তর কর্তৃক বজ্রপাত প্রতিরোধে তালগাছ লাগানোর মতো আজগুবি, হাস্যকর প্রকল্প বাদ দিয়ে মোবাইলে মেসেজ ভিত্তিক জরুরি সতর্ক ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বজ্রপাত সৃষ্টি করে কোন স্থানে এমন মেঘ সৃষ্টি হতে দেখলে দ্রুত সেই স্থানের মানুষদের মোবাইলে জরুরি সংকেত পাঠিয়ে সতর্ক করতে হবে।
প্রবা: বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি ব্যাপারে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর দীর্ঘমেয়াদী তথ্য কেন দিতে পারে না?
মোস্তফা কামাল পলাশ: বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি ব্যাপারে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর দীর্ঘমেয়াদী তথ্য কেন দিতে পারে না কারণ ওই ধরনের পূর্বাভাস দেওয়ার মতো আবহাওয়া বিজ্ঞানের উপর প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারি ও কারিগরিভাবে দক্ষ মানবসম্পদ নাই। যে মানবসম্পদ ও কারিগরি সক্ষমতা আছে তা ব্যবহার করে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার মতো যে যোগ্য নেতৃত্ব দরকার, তারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরে।