বিক্রমপুরের চৈত্রসংক্রান্তি
জয়ন্ত সাহা
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৩ ২১:২১ পিএম
আপডেট : ১৩ এপ্রিল ২০২৩ ২১:৫৭ পিএম
ধরণি যখন হিংসা-বিদ্বেষ আর হানাহানিতে ছেয়ে যায়, তখন কৈলাস থেকে নেমে আসেন মহাদেব শিব। আসুরিক প্রবৃত্তিতে উন্মত্ত ধরণিপুত্ররা তখন শিবকে প্রতিহত করতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেন। তাদের মধ্যে শুরু হয় তীব্র যুদ্ধ। তবে সেই যুদ্ধে জয়ী হন মহাদেব। সবশেষে ধরণিপুত্ররা মহাদেব চরণে ক্ষমাপ্রার্থনা করে নবজীবনের বর প্রার্থনা করেন। মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে তাদের আশীর্বাদ করেন।
চৈত্রসংক্রান্তিতে মহাদেবের কাছে বর প্রার্থনার সেই ধর্মীয় রীতিটি সাড়ম্বরে পালন করেছেন মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার আবদুল্লাহপুর গ্রামের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে এই আয়োজন করেন তারা। সিঁদুরের সঙ্গে নারকেল তেল মিশিয়ে তৈরি করা হয় বিশেষ লাল রঙ। সেই রঙে সাজানো হয় লালকাছের দলটিকে। এই দলে সদস্য ১০ জন। তাদের মাথা ও গলায় কাগজের ফুল, হাতে তলোয়ার, কোমরে প্যাঁচানো থাকে এক টুকরো লালসালু। শিবের হাতে ডমরু, ত্রিশূল। লালকাছের দলটি শিবের নেতৃত্বে তলোয়ার হাতে এগিয়ে চলে লোকনাথ মন্দিরের দিকে। অশুভ শক্তির বিনাশে মহাদেব ধারণ করেন অগ্নিমূর্তি। গীত-বাদ্য সহযোগে প্রতীকী নৃত্যে লালকাছের দলটি পরিবেশন করে অসুর বধের পর্ব। এই নাচের নাম লালকাছ নৃত্য। এমন নামকরণের কারণ জানা যায়নি।
লালকাছ নৃত্য শুরুর প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ। প্রথমে ধলেশ্বরী নদীতে পাটস্নানের পর পূজার সব উপকরণ শুদ্ধ করে নেন লালকাছের সন্ন্যাসীরা। বাড়ি ফিরে তারা শিব পূজা করেন। পরদিন শিব-পার্বতীর বেশে সাজানো হয় দুজনকে। সারা পাড়া ঘুরে ভক্তের মনোবাসনা পূরণের আশ্বাস দিয়ে তারা ঘরে ফেরেন। পাড়া বেড়ানোর সময় শিব ঘরে ঘরে খাদ্যদ্রব্য ছুঁয়ে দেন (বিভিন্ন রোগের পথ্য হিসেবে এসব খাবার গ্রহণ করবেন ভক্তরা)। এরপর শুরু হয় লালকাছের আয়োজন।
লোকসংস্কৃতি গবেষক ইমরান উজ-জামান লালকাছের ঐতিহ্য নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ’একসময় নদীবেষ্টিত এই অঞ্চল শাসন করত সন্ন্যাসবাড়ি। তিন নদীর মোহনায় ছিল এ অঞ্চলের অবস্থান। মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের আক্রমণের ভয় ছিল সারাক্ষণ। তা ছাড়া স্থানীয় আধিপত্যবাদীদের উৎপাত ছিল। এ কারণে চৈত্রসংক্রান্তিতে যে চড়ক পূজা হতো, তাকে উপলক্ষ করে যুদ্ধ মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা জানান দেওয়াই ছিল লালকাছের উদ্দেশ্য।’
গ্রামবাংলার এই সংস্কৃতিকে ‘অপরিমেয়’ মনে করেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘আবহমানকাল ধরে বাংলার যে ঐতিহ্য তা রক্ষা ও বিকাশে শিল্পকলা একাডেমি সব সময় তৎপর। পাশাপাশি অপরিমেয় এসব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের চর্চা যেন বন্ধ না হয়, সেদিকে আমরা নজর রাখছি।’